শিশুদের জন্য পাঁচটি সুযোগ যা আমাদের এখন অবশ্যই লুফে নিতে হবে

আমরা প্রতিটি শিশুর জন্য কোভিড পরবর্তী সময়ে আরও ভালো একটি বিশ্বের স্বপ্ন দেখতে পারি– এটা আমি কেন বিশ্বাস করি সে বিষয়ে একটি খোলা চিঠি

Henrietta Fore, UNICEF Executive Director
UNICEF

কোভিড-১৯ হচ্ছে আমাদের জীবদ্দশায় দেখা প্রথম সত্যিকারের বৈশ্বিক সংকট। আমরা যে যেখানেই বসবাস করি না কেন, মহামারিটি প্রতিটি ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, শিশুদের সবচেয়ে বেশি। লাখ লাখ মানুষ কেবল দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করার কারণে বা তাদের জাতি, ধর্ম বা বর্ণের কারণে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা পাচ্ছে না। কোভিড-১৯ এই বৈষম্যের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং মহামারিটির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব আগামী বছরগুলোতে ফিরে ফিরে আসবে।

তবে এই চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে আতঙ্কিত বা বিহ্বল হয়ে পড়ার সময় এটা নয়। আমরা যখন ইউনিসেফের ৭৫তম বার্ষিকী শুরু করছি, তখন এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরেকটি ঐতিহাসিক সংকটের মাঝে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বিশ্বে শিশুরা যে পরিমাণ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল তা দেখে সহজেই দিশেহারা হওয়ার মতো অবস্থা ছিল। তবে আমরা পুনরায় সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমরা বিশ্বজুড়ে নতুন স্বাস্থ্য ও কল্যাণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। আমরা গুটি বসন্ত (স্মলপক্স) এবং হিংস্র পোলিওকে পরাজিত করেছি। আমরা জাতিসংঘ গড়ে তুলেছি।

ইতিহাস আরও একবার আমাদের ডাকছে। পূর্ববর্তী বড় বড় বৈশ্বিক সংকটে, বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে মহামারি পর্যন্ত - চুক্তি ও সমঝোতা বিষয়ক আলোচনার জন্য নেতারা একত্রিত হয়েছিলেন। শান্তি পুনরুদ্ধার, পুনস্থাপন ও পুনর্নির্মাণের নতুন উপায় গড়ে তোলা এবং সহযোগিতার বিষয়ে তারা সময়ে সময়ে সম্মত হয়েছেন।

আমাদের শিশুদের সুরক্ষার জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার পেছনে বিশ্বকে একত্রিত করা প্রয়োজন; যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং আরও স্থিতিস্থাপক ব্যবস্থা ও সেবা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রজন্মের একটি প্রতিশ্রুতি থাকবে। বাজেট স্বল্পতা ও অর্থনৈতিক মন্দায় যাতে শিশুদের কোনো ক্ষতি না হয় তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও থাকবে।

বিশ্বের শিশুরা যে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে সে বিষয়ে আমাদের স্বচ্ছ দৃষ্টি রাখার পাশাপাশি আমরা আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আত্মবিশ্বাসী হওয়ার মাধ্যমে অতীতের ওপর ভিত্তি করে অংশীদারিত্ব ও সংহতিকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

এর মানে এই নয় যে, বিষয়গুলো আগে যেমন ছিল সে অবস্থায় ফিরে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশুর ক্ষেত্রে শুরু করার জন্য ‘স্বাভাবিক’ অবস্থা কখনোই যথেষ্ট ছিল না।

কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের শিশুদের জন্য যে পাঁচটি সুযোগ নিয়ে এসেছে সেগুলো এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর কণ্ঠে যেমনটা উঠে এসেছে - তার ওপর ভিত্তি করে শিশুদের জন্য কীভাবে আমরা আরও ভালো একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারি সে বিষয়ে পাঁচটি শিক্ষা এখানে রয়েছে।

Embedded video follows
UNICEF

 

Ridhi, 20, Thailand

"ক্রমবর্ধমান টিকাদান বিরোধী কথাবার্তা আমাদের প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকিতে ফেলছে, যা আজকের দিনে ও এই যুগে পুরোপুরি নির্মূল করা উচিত। কারোরই এমন কোনো রোগে ভোগা উচিত নয়, যা টিকা নিরাপদে প্রতিরোধ করতে পারে। কারোরই নয়।"

রিধি, ২০, থাইল্যান্ড

 

টিকার কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য আমাদের অবশ্যই বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে

 

ইতিহাস ও বিজ্ঞান আমাদের বলে যে, এই ভাইরাসের সমাপ্তি ঘটাতে এবং আমাদের জীবন ও জীবিকা ফিরে পেতে টিকাই সর্বোত্তম আশা।

তা সত্ত্বেও, রিধি যেমন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সত্যিকারের ঝুঁকি রয়ে গেছে যে এবং তা হলো - যাদের প্রয়োজন তাদের সবার কাছে কোভিড-১৯ টিকা পৌঁছাবে না।

টিকা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। ২৭টি দেশের প্রায় ২০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের প্রতি চারজনে প্রায় একজন কোভিড-১৯ টিকা নিতে অস্বীকৃতি জানাবে। আমেরিকানদের ওপর করা অনুরূপ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আসা অস্পষ্ট ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তা টিকার ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারে।

ইতোমধ্যে, টিকা সংক্রান্ত ভুল তথ্য একটি বড় ও ক্রমবর্ধমান ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। মহামারির সময়ে টিকাদান বিরোধী প্রচারকরা তাদের অনলাইন অনুসারী কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। আভাজের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার শীর্ষ ১০টি ওয়েবসাইট গবেষকরা চিহ্নিত করেছেন এবং ফেসবুকে প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্য বিষয়ক সাইটগুলোর তথ্য যে পরিমাণ দেখা হয় তার প্রায় চারগুণ বেশি দেখা হয় এই ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সাইটগুলো।

সংক্ষেপে, আমরা আস্থার লড়াইয়ে ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়ছি। আর বিশ্বাস ছাড়া, যেকোনো কোভিড-১৯ টিকাই অকেজো হয়ে যাবে। তবে বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ টিকাদান শুরু হওয়ায় এখন আমাদের সামনে জীবন রক্ষাকারী টিকা নিয়ে সত্যিকারভাবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছার সুযোগ এসেছে। সুড়ঙ্গের শেষে যে আলো দেখা যাচ্ছে তা সবার জন্যই প্রজ্জ্বলিত হওয়া দরকার।
 

যা করা প্রয়োজন:

এখন যেহেতু বিশ্বে একাধিক কোভিড-১৯ টিকা তৈরি হয়েছে, তাই দরিদ্রতম ও সবচেয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীসহ সবার কাছে টিকা পৌঁছানোর মাধ্যমে এই গ্রহ থেকে সাম্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ভাইরাসটি নির্মূল করার জন্য দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের দিকে আমরা আমাদের দৃষ্টি দিতে পারি।

সেই দিনের জন্য প্রস্তুতির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সবাই যাতে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে কোভিড-১৯ টিকা পায়, তা নিশ্চিত করতে 'কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি' নামে যে বৈশ্বিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ইউনিসেফ সেই উদ্যোগের 'অ্যাডভান্সড মার্কেট কমিটমেন্ট এনগেজমেন্ট গ্রুপ'-এর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার। এখন যখন টিকা পাওয়া যাচ্ছে তখন কোনো দেশ, কোনো পরিবার ও কোনো শিশুকে যাতে লাইনের পেছনে ঠেলে দেওয়া না হয় সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। কোভিড-১৯ টিকা ক্রয় ও সরবরাহ প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়ে এবং চাহিদা অনুযায়ী টিকা সরবরাহের সুবিধার্তে, এমনকি সবচেয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতেও, আমাদের বিদ্যমান অবকাঠামোকে ব্যবহার করে আমরা এটি করবো। কোভিড-১৯ টিকা যাতে সব দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

যেকোনো টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিশ্বাস। আর এ কারণে সব টিকার দাম ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জনসমর্থন তৈরি করতে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে ইউনিসেফ বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্রচারণা চালাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে এবং তাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিপজ্জনক ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া ঠেকাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। গত অক্টোবরে ফেসবুক টিকাদানকে নিরুৎসাহিত করে এমন বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার জন্য একটি বৈশ্বিক নীতিমালা ঘোষণা করে। এরপর দ্রুত ইউটিউব টিকাদান বিরোধী কনটেন্টের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং এর অংশ হিসেবে এমন ভিডিওগুলো অপসারণ করে যেগুলোতে কোভিড-১৯ এর টিকাদান নিয়ে ভুল তথ্য প্রচার হচ্ছিলো। তবে আরও কিছু করা যায়। সত্যকে বিকৃত করে এমন কনটেন্ট চিহ্নিত ও অপসারণ করতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে।

কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে টিকা নিয়ে দ্বিধা অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের জন্য শীর্ষ ১০ হুমকির অন্যতম হচ্ছে টিকা নিয়ে দ্বিধা এবং বিশ্বাস ছাড়া টিকা একজন চিকিৎসকের ক্যাবিনেটে থাকা ওষুধের শিশি ছাড়া আর কিছুই না।

< উপরে ফিরে যেতে


Kamogelo, 18, South Africa

“আমি মনে করি স্কুলগুলোর জন্য তাদের শিক্ষার্থীদের কথা শোনার এবং তাদের অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা উন্নত করার উপায় খুঁজে বের করার এটাই সম্ভবত উপযুক্ত সময়। এমনকি মহামারিটি চলে গেলেও শিক্ষাগ্রহণকে সবার জন্য উন্মুক্ত ও নমনীয় করার ক্ষেত্রে  দূরশিক্ষণ একটি মূল্যবান হাতিয়ার হতে পারে।”

কামোজেলো, ১৮, দক্ষিণ আফ্রিকা

 

ডিজিটাল বিভাজন দূর করা গেলে তা সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার পথ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে

 

কামোজেলোর ভাবনা সঠিক। ২০২০ সালের শুরুর দিকে স্কুল বন্ধ রাখার চূড়ান্ত সময়ে, বিশ্বের স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৩০ শতাংশ দূরবর্তী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে অর্ধেকের কিছু বেশি পরিবারে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

এই শিশুরা সেই একই দলভুক্ত যাদের মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রাপ্তির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১০ বছর বয়সী শিশুদের ৫০ শতাংশেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পরও একটি সাধারণ গল্প পড়তে ও বুঝতে পারে না, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সংকটকে প্রতিফলিত করে। আর এই ডিজিটাল বিভাজন আমরা ঘোচাতে না পারলে দ্রুত বেড়ে ওঠা তরুণ জনগোষ্ঠীর এই দলটি পেছনেই পড়ে থাকবে।

কোভিড-১৯ এই  জরুরি প্রয়োজন আরও বাড়িয়েছে। কোভিড-১৯ এর মাঝে এবং এর পরে প্রতিটি শিশু ও স্কুলকে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত করতে এবং তাদের ভেতরে থাকা সম্ভাবনা অনুধাবনের জন্য যথাযথ দক্ষতা গড়ে তোলায় তাদের সহায়তা করতে নতুন, ডিজিটাল উপকরণ প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা দারুণ এক সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে, যা ‘একটি প্রজন্মে একবারই’ আসে।
 

যা করা প্রয়োজন:

প্রথম এবং সর্বাগ্রে সরকারগুলোকে বিদ্যালয় পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং নিরাপদে পুনরায় বিদ্যালয় চালু করার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তবে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের এই বিরতি আমরা কীভাবে শিক্ষা প্রদান করি সে বিষয়ে পুনরায় চিন্তা করার সময়ও দিয়েছে।

ইউনিসেফের ‘রিইমাজিন এডুকেশন’ উদ্যোগটি ডিজিটাল শিক্ষা, ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন, ডিভাইস, সাশ্রয়ী উপাত্ত এবং তরুণদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতার বিকাশে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অংশীদার এবং সরকারগুলোর সঙ্গে মিলে একত্রে আমরা ২০২১ সালের শেষ নাগাদ ৫০ কোটি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫০ কোটি শিশুর কাছে এই সেবা পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। এর মধ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে শিক্ষা বিষয়ক বেতার সম্প্রচারে সহায়তা করা এবং মোবাইল ক্ষুদ্র বার্তা, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং পডকাস্টসহ শিশুরা যেখানে থাকবে সেখানেই তাদের কাছে শিক্ষার উপকরণ পৌঁছে দেওয়াসহ সবকিছুই রয়েছে।

ডিজিটাল উপকরণগুলো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। ইউনিসেফের ‘গ্লোবাল ডিজিটাল লার্নিং টুলকিট’টি সবচেয়ে দুর্গম স্থানে বসবাসরত এবং এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ভিত্তিগত, স্থানান্তরযোগ্য, পেশাগত ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বিস্তৃত করছে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ‘লার্নিং পাসপোর্টে’ মাইক্রোসফটের সঙ্গে কাজ করছি। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যা খান একাডেমির সঙ্গে ভিত্তিগত, ডিজিটাল এবং স্টেম-সম্পর্কিত দক্ষতার বিষয়ে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে; শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য একটি ডিজিটাল কর্মসূচি সরবরাহ করে, যা শিক্ষা ও কাজের সুযোগ গ্রহণের জন্য সংযুক্ত হতে তাদের আশ্রয়দাতা কমিউনিটির ভাষা শেখায় এবং বিশ্বব্যাপী ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করতে এবং তাদের পড়তে ও গুণতে শেখানোর জন্য ‘এজ অব লার্নিং ফাউন্ডেশনের’ সঙ্গে কাজ করে অনলাইন ও অফলাইনে স্কুল পাঠ্যক্রম সরবরাহ করে, এমনকি সংকটকালেও।

তবে শেখার উপকরণগুলো ব্যবহারের জন্য এগুলোকে অবশ্যই সংযোগেরআওতায় রাখতে হবে। সংযোগ বাড়ানোর জন্য আমরা জিআইজিএ উদ্যোগের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছি, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি শিশু, প্রতিটি সম্প্রদায় এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

এর অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের মধ্যে ৩৫টি দেশে সংযোগের আওতায় আসা স্কুলগুলো চিহ্নিত করতে আমরা সম্প্রতি এরিকসনের সঙ্গে একটি বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব চালু করেছি। প্রতিটি শিশুকে ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।

কামোজেলো যেমন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে ডিজিটাল সমাধানের মাধ্যমে আমরা শিশুদের পুরো একটি প্রজন্মের শিক্ষা গ্রহণ ও দক্ষতার বিকাশে বিপ্লব ঘটাতে পারি।

< উপরে ফিরে যেতে


Tulika, 18, India

“মানসিক স্বাস্থ্য বড় কোনো বিষয়ই নয় – এমনটা ভেবে কেন আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা করি? কেন আমরা কষ্টে থাকা একজনকে বলি যে ‘আপনি কেবল বেশি বেশি চিন্তা করছেন’? কেন আমরা মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাগল (হিসেবে) মনে করি?...এই বদ্ধমূল ধারণাগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখার এবং মানসিক স্বাস্থ্য যে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ তা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে।”

তুলিকা, ১৮, ভারত

 

কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী তরুণদের ‘মানসিক স্বাস্থ্যে’র বিষয়টি সামনে এনেছে

তুলিক্কাই ঠিক: মানসিক স্বাস্থ্য একটি বড় ব্যাপার, এট শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। শৈশব ও কৈশোরে এটি বিশেষভাবে সত্য, যখন আমরা আমাদের পুরো জীবনের জন্য মানসিক বিকাশ ও শেখার সক্ষমতার, আমাদের আবেগময় জ্ঞান এবং চাপের মুখে আমাদের টিকে থাকার ভিত্তি তৈরি করি।

আবার, শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী যে কতটা ঝুঁকিতে আছে এই মহামারি ঠিক সেটাই তুলে ধরেছে।

সর্বত্রই কোভিড-১৯ শিশুদের জীবন ওলট-পালট করে দিয়েছে, স্কুলে যাওয়া ও ঘরের বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করার মতো আনন্দময় ও পরিচিত ছকবাঁধা জীবনকে ব্যাহত করেছে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে লকডাউন তাদের সামাজিক এবং সমবয়সীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, যা জীবনের এই সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর পরিবারে সহিংসতা, অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হয়ে ট্রমাগ্রস্ত শিশুদের ক্ষেত্রে লকডাউন অনেককে বন্ধ দরজার পেছনে আটকে দিয়েছে, যেখানে তাদের নির্যাতনকারীদের সঙ্গেই থাকতে হচ্ছে এবং স্বাভাবিক সময়ে তারা স্কুল এবং তাদের বর্ধিত পরিবার ও কমিউনিটির কাছ থেকে সাহায্য পেলেও এক্ষেত্রে কোনো ধরনের সাহায্যও পাচ্ছে না। কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী ৯৩ শতাংশ দেশে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত বা বন্ধ করেছে।

এই প্রভাবগুলো ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে যাওয়ায় ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়াচ্ছে। আমার আগের চিঠিতে আমি ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত ব্যাধির বৃদ্ধি সম্পর্কে লিখেছিলাম, যে বয়সটি একজন তরুণের বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সমস্ত মানসিক ব্যাধিগুলোর অর্ধেকই ১৫ বছর বয়সের আগে দেখা দেয় এবং ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই এটি দেখা দেয় মানুষের যৌবনের শুরুর দিকে। প্রতিবছর আত্মহত্যায় মারা যাওয়া ৮ লাখ মানুষের বেশিরভাগই তরুণ এবং ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্ম-ক্ষতি।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আত্মসম্মান ও বৈষম্যের কারণে অনেক বেশি সংখ্যক শিশু ও তরুণ নিপীড়ন ও  মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় সাহায্য খোঁজে না। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য খাতে প্রায় সর্বত্রই কম ব্যয় করা হয় এবং এক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই আরও বেশি কিছু করতে হবে। স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্য বাজেটের ১ শতাংশেরও কম মানসিক স্বাস্থ্যের পেছনে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তবে শিশু এবং তরুণরা তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য যে পরিমাণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তা বিবেচনায় নিলে এই মহামারি প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কথা বলার এবং শেখার একটি দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে।

 

যা করা প্রয়োজন:

তুলিক্কার মতো তরুণরা সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছেন এবং তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো আমাদের শোনা দরকার।

কিছু দেশের সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ, জর্জিয়া ও ভারতে ফ্রি ফোন হেল্পলাইনগুলো শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা এবং সহায়তা দিচ্ছে। কোভিড-১৯ লকডাউনের প্রথম ১১ দিনে নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা চেয়ে ভারতের চাইল্ডলাইনে ৯২ হাজারেরও বেশি কল আসে, যা আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।

বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি কাজাখস্তানে, যেখানে কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ, চাপ ও অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ইউনিসেফ ২০২০ সালের এপ্রিলে কিশোর-কিশোরীদের জন্য ব্যক্তিগত অনলাইন কাউন্সেলিং সার্ভিসের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে। মাত্র তিন মাসে পাঁচ হাজারেরও বেশি স্কুল মনস্তত্ববিদ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দেশের অন্যান্য কর্মসূচিগুলো সহপাঠী বা সমবয়সীদের সমর্থন গ্রুপ এবং বাবা-মায়েদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক সংযোগের জন্য কার্যক্রম তুলে ধরে, যা কাউন্সেলিং ও সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি বোঝার এবং পরিচর্যার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতির থেকে দূরে রাখে।

একইভাবে, বিশ্বজুড়ে সংগঠনগুলো তরুণদের সঙ্গে প্রমাণিত কার্যক্রম হস্তক্ষেপ এবং প্রচারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়তা চাওয়ার বিষয়টিকে স্বাভাবিক করার জন্য কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, টাইম টু চেঞ্জ কথোপকথন শুরু করতে, সম্মানহানির মতো বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে এবং তরুণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্যের শিক্ষক, স্কুল প্রশাসক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বৈষম্যের অবসান ঘটাচ্ছে।

আমাদের আরও কিছু করা দরকার: এই বিষয়ে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন দেশগুলোর তা করা দরকার। এর পাশাপাশি কমিউনিটি ও স্কুলগুলোতে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তা নাটকীয়ভাবে সম্প্রসারণ করা এবং ঝুঁকির মুখে থাকা পরিবারের শিশুরা যাতে বাড়িতে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুরক্ষা পায় তা নিশ্চিত করার জন্য শিশু পালনে বাবা-মায়েদের জন্য প্রকল্প গড়ে তোলা দরকার।

< উপরে ফিরে যেতে


Clover, 20, Australia

আমরা ক্ষমতাহীন – এই বিশ্বাসকে আমাদের অবশ্যই দূর করতে হবে এবং অনুধাবন করতে হবে যে আমরা অসীম শক্তিশালী।

ক্লোভার, ২০, অস্ট্রেলিয়া

 

কোভিড-১৯ বৈষম্য করে না, তবে আমাদের সমাজগুলো করে

 

করোনভাইরাস মহামারি বিশ্বের প্রায় প্রত্যেককে প্রভাবিত করেছে, তবে এটি আমাদের সবাইকে সমানভাবে প্রভাবিত করছে না। অনেক বেশি সংখ্যক দেশে আপনার জাতিসত্তা, আপনার গায়ের বর্ণ বা আপনার সম্পদের কারণে আপনাকে পরিণাম ভোগ করতে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, আফ্রিকান আমেরিকানরা জনসংখ্যার ১৩ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের প্রায় চার ভাগের একভাগ কোভিড-১৯ জনিত কারণে মারা গেছে, আর শেতাঙ্গদের তুলনায় তাদের মারা যাওয়ার হার প্রায় চারগুণ।

বিশ্বজুড়ে যারা সম্মুখ সারিতে বা অগ্রভাগে কাজ করছেন, যারা অপরিহার্য শ্রমিক, যারা জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এবং যারা দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত তারা সবাই ঝুঁকিতে আছেন। তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি কারণ তারা অনেক বেশি ঝুঁকিতে আছে এবং তাদের যত্ন ও চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আর এ বিষয়টি আমাদের সবার জন্যই ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধনী বা গরীব যাই হোক না কেন, আপনার প্রতিবেশী অসুস্থ হলে আপনিও অসুস্থ হতে পারেন। প্রত্যেকের জন্য এই সংকটের সমাপ্তি না ঘটালে তা কারোর জন্যই সমাপ্ত হবে না।

আর দারিদ্র্য নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী, আর্থিক দিক দিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোতে বসবাসকারী শিশুদের সংখ্যা ২০২০ সালের শেষে আনুমানিক ১৪ কোটি ২০ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে দারিদ্র্যের প্রভাবগুলো স্বাস্থ্যের বাইরেও রয়েছে। দরিদ্রতম শিশুরা কেবলমাত্র ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে কম সক্ষম নয়, তারা দূরশিক্ষণ এবং হাত ধোয়ার উপকরণ ও সেবাসমূহ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও সবচেয়ে কম সক্ষম। মানবিক সংকটময় এই পরিস্থিতিতে বসবাসকারী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলি এখনও অনেক বেশি মাত্রায় রয়ে গেছে।

দারিদ্র্যে বসবাসকারী বড়দের মতো শিশুরাও যে কেবল দ্বিগুণ ঝুঁকিতে আছে তা নয়, সারাজীবনের জন্য এর অপরিবর্তনীয় পরিণতিতে ভোগার ক্ষেত্রে তারা আরও বেশি সংবেদনশীল। খুব কম ক্ষেত্রেই শিশুরা গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পুষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা বা ভালো মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সুযোগ পায়, যা তাদের বেঁচে থাকার, সাফল্য ও সমৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম করে তোলে। পদক্ষেপ না নিলে খারাপ পরিণতি আজীবন স্থায়ী হতে পারে।

 

যা করা প্রয়োজন:

ক্লোভার সুস্পষ্টভাবে যেমনটা বলছেন, শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী শক্তিহীন নয়। প্রতিটি শিশুই যাতে সমাজে অবদান রাখার সুযোগ পায় এবং লিঙ্গ, বর্ণ, জাতি বা ধর্ম নির্বিশেষে কোনো শিশু যাতে পিছিয়ে না পড়ে তা আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। অসমতা ও বৈষম্য মোকাবিলায় আমাদের নতুন প্রতিশ্রুতি দরকার। মহাসচিব গুতেরেস এ বছর যেমনটা বলেছেন, কেবল সুরক্ষা নীতিমালায় নতুনত্ব আনা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকেন্দ্রীক কর্মসূচি ও নীতিমালার মাধ্যমে আমাদের অবশ্যই গভীরে প্রোথিত লিঙ্গ, বর্ণ বা জাতিগত বৈষম্য মোকাবিলা করতে হবে।

অনেক বেশি সংখ্যক শিশু মৌলিক সেবাসমূহ গ্রহণের সুযোগ পায় না, যা অগ্রহণযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, কোভিড-১৯ ও অন্যান্য রোগের বিস্তার ঠেকানোর ক্ষেত্রে পরিষ্কার পানি ও সাবান হচ্ছে একেবারে মৌলিক উপকরণ। শিশুদের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচাতে ইকুয়েডর এবং অন্যান্য দেশের বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিদ্যালয়গুলোতে প্যাডাল দিয়ে চালানো যায় – এমন বহনযোগ্য হাত ধোয়ার স্থাপনার মতো উদ্ভাবনী ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার মতো সামাজিক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা পরিবারগুলোকে শুধু স্বল্প মেয়াদে টিকে থাকতে সহায়তাই করে না, একইসঙ্গে আরও  বিস্তৃত পরিসরে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রসদ যোগায় – শিশুদের স্কুলে ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো, পুষ্টিকর খাবার কেনা এবং শিশুশ্রম কমাতে সহায়ক হয়। কোভিড-১৯ মোকাবিলা ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইউনিসেফ এখন বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোতে সহায়তা প্রদানে ১১৫টি দেশের সরকারের সঙ্গে কাজ করছে।

অতীতের সংকট থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, এমনকি অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও সামাজিক খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বেশ ভালো ধরনের বিনিয়োগের ঘটনা রয়েছে। সরকারগুলো যেহেতু তাদের জনগণকে কোভিড-১৯ এর ধাক্কা থেকে সুরক্ষা দিতে কাজ করছে, এক্ষেত্রে তাদের সব ধরনের সামাজিক খাতে বিনিয়োগ যাতে না কমে সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে এবং সেবা প্রদান অব্যাহত রাখতে তারা যাতে তাদের সম্পদগুলো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

< উপরে ফিরে যেতে


Vanessa, 24, Uganda

“আমাদের জন্য অনেক কিছু বদলে গেছে, কেননা আমরা আর বাইরে যেতে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাতে পারি না, তবে এর অর্থ এই নয় যে, জলবায়ু আন্দোলন থেমে গেছে ... আমরা নিরব থাকতে পারি না। জলবায়ু সংকট এখনও অব্যাহত রয়েছে। এটা শেষ হয়ে যায়নি। এটি বদলে যায়নি।"

ভেনেসা, ২৪, উগান্ডা

 

জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে আরেকটি বৈশ্বিক সংকট যা অপেক্ষা করবে না

 

কোভিড-১৯ আমাদের শিখিয়েছে যে, বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর জন্য বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একটি শিশুর চেয়ে বেশি কেউ ভোগেন না। শিশুরা যে বাতাসে শ্বাস নেয়, যে পানি তারা পান করে এবং যে খাবার তারা খায় সেগুলোতে পরিবর্তন এলে তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। আমরা জানি যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা পানি ও খাদ্য সংকট এবং পানিবাহিত রোগ শিশুদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে। আর বর্তমান ধারায়, মাত্র ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতি চার শিশুর মধ্যে একজন এমন এলাকায় বসবাস করবে যেখানে পানির সংস্থান থাকবে খুবই সীমিত। প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে, আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য যে পৃথিবী রেখে যাব তার স্বাস্থ্যের জন্য আমরাই দায়বদ্ধ।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতা কেবল বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলবে। ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন থেকে সম্মিলিতভাবে যে ক্ষতি হবে তার আর্থিক মূল্য ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা পুরো বিশ্বের জিডিপি ৩ শতাংশ কমিয়ে দেবে এবং দরিদ্রতম অঞ্চলগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা যদি এখনই পদক্ষেপ না নেই, তবে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে জলবায়ু সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সশস্ত্র সংঘাতের ফলে অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে, যার প্রভাব উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

 

যা করা প্রয়োজন:

আমাদের আবশ্যই কোভিড-১৯ মোকাবিলা ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কার্যক্রমকে দৃঢ় ও জরুরি পদক্ষেপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করবে এবং আমাদের পরিবেশকে সুরক্ষা দেবে।

আমাদের সরকারি প্রণোদনা কর্মসূচি দরকার যা স্থানীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি স্বল্প-কার্বন নিঃসরণ পদ্ধতির এবং একটি সমন্বিত বৈশ্বিক পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেয়। সমাধানগুলো এরই মধ্যে আমাদের জানা: পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সেবাকে জলবায়ু এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলা; সবুজ ও নিরাপদ বিদ্যালয়ের মাধ্যমে দৃঢ় শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা; জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম স্বাস্থ্য সেবা গড়ে তোলা; বায়ু, মাটি এবং পানি দূষণ কমানো; পরিবর্তনের দূত এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমাদের অংশীদার হিসেবে তরুণদের সম্পৃক্ত করা; জলবায়ু সম্পর্কিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার জন্য জলবায়ুজনিত পরিবর্তনে দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম খাদ্য ব্যবস্থা ও খাবার তৈরি করা। এই ধরনের সমাধানগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো না হলে কোভিড-১৯ থেকে উত্তোরণ আরও কঠিন হবে।

এই সমাধানগুলোর অনেকগুলোর ধারাবাহিক প্রভাব রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য সুবিধা বয়ে আনবে।

এমন একটি বিশ্বে যেখানে ১৭টি দেশ প্রতিবছর তাদের পানি সরবরাহের ৮০ শতাংশেরও বেশি প্রত্যাহার করে নেয়, সেখানে পানির সুরক্ষাসহ শিশুদের জন্য আমাদের নতুন এক বিশ্বের স্বপ্ন দেখতে হবে। আমাদের অভিন্ন জলসম্পদ নিয়ে আরও ভালো সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় প্রভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে এবং আরও টেকসই নগর, জীবন ও জীবিকা এবং শিশুদের জন্য একটি পরিষ্কার ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

একই সময়ে পরিষ্কার পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা বঞ্চিত বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশকে পরিষ্কার পানি সরবরাহ করা হলে তা কোভিড-১৯ এর মতো সংক্রামক রোগের বিস্তার ঠেকাতে পারে, যার ফলে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগ করে ৪ ডলারের উপকার পাওয়া সম্ভব। একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের প্রতিটি পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ক্লিনিকে যাতে পরিষ্কার পানি ও সাবান থাকে তা নিশ্চিত করতে না পারার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই।

সামগ্রিকভাবে, আমরা ভেনেসার মতো তরুণদের নেতৃত্ব অনুসরণ করতে পারি যারা কেবল পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছে না, এ বিষয়ে কিছু করছেও। উদাহরণস্বরূপ, নাইজেরিয়ার ইউনিসেফ কোভিড-১৯ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জের বিজয়ী টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সৌর প্যানেল ব্যবহার করে অনিরাপদ এবং অপর্যাপ্ত পানি দিয়ে কমিউনিটির জন্য একটি সমাধান বের করেছিলেন।

এই ধরনের সমাধানগুলো যে কেবলমাত্র কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবগুলোকে চিহ্নিত করতে স্বল্পমেয়াদেই উপকারী তা নয়, একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা তৈরি এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতেও এগুলো কাজে আসে।

< উপরে ফিরে যেতে

শেষ কথা…

 

২০১৯ সালে একটি খোলা চিঠিতে আমি লিখেছিলাম, আমি শিশু এবং তরুণদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ ও আশা প্রকাশ করছি। আমি তখনও জানতাম না যে এক বছর পরে বিশ্বব্যাপী একটি মহামারি দেখা দেবে এবং অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে এই উদ্বেগ বাস্তবে রূপ নেবে।

খারাপ খবর: সংকট অব্যাহত থাকায় এবং অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে ধাবিত হতে থাকায় আমাদের সামনে এখনও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। অর্থনীতির ওপর দিয়ে যে ঝড় যাচ্ছে তার কারণে সরকার বাজেট কমাচ্ছে এবং এতে কয়েক দশক ধরে যে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়েছিল তা নস্যাৎ হচ্ছে। আমরা যদি যথাযথ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে কয়েক প্রজন্মকে এর পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

তবে সুসংবাদ হচ্ছে: যে ব্যবস্থাগুলোর ওপর শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী নির্ভরশীল, সেগুলোকে নতুন স্বপ্ন নিয়ে পুনর্নির্মাণ করার জন্য নজিরবিহীন সুযোগ হিসেবে আমরা এই মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে এই প্রবণতাকে উল্টে দিতে পারি।

সুতরাং এটি আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে থাকা শিশু, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং নেতৃবৃন্দের জন্য বিশ্ব মঞ্চের রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতা, সরকারি নীতিনির্ধারক, তারকা ক্রীড়াবিদ, গণমাধ্যম মালিক, অ্যাডভোকেট এবং আমাদের প্রত্যেকের প্রতি পদক্ষেপ গ্রহণের সময়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিতে হবে, যা শিশুদের জন্য বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়। ইন্টারনেট সুরক্ষা ও গোপনীয়তা থেকে শুরু করে ডিজিটাল লার্নিং, পরিষ্কার পানি সরবরাহ পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন সমস্যায় থাকা শিশুদের কাছে পৌঁছাতে এবং তাদের সুরক্ষিত রাখতে বেসরকারি খাতকে অবশ্যই উদ্বাবনী আরও অনেক কিছু করতে হবে। আর নাগরিকদের অবশ্যই ক্ষমতার থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি করতে এবং বৈষম্য ও অসমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অব্যাহত রাখতে হবে।

এই বছর, ইউনিসেফ যখন প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যতের নিয়ে পুনরায় স্বপ্ন দেখার ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপন করছে, তখন চলুন নতুন মনোভাব নিয়ে আমরা শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে, তাদের স্বপ্নকে প্রজ্জ্বলিত করি এবং জীবনের প্রতিটি অংশজুড়ে তাদের সমর্থন দিয়ে তাদের পেছনে দাঁড়াই।

কোভিড-১৯-ই মানবতার জন্য শেষ সংকট নয়। তাই আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী এই মহামারি কাটিয়ে উঠতে চলুন অংশীদার এবং বন্ধু হিসেবে পাশাপাশি কাজ করি।

 

 

হেনরিয়েটা ফোর
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক


চিঠিটি ডাউনলোড করুন [পিডিএফ]