পুষ্টি সেবার মাধ্যমে শিশুদের জীবন বাঁচানো

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের বাঁচতে ও বেড়ে উঠতে সহায়তা করছে পুষ্টি সহায়তা কার্যক্রম।

ইউনিসেফ
Sharif’s height is measured at the UNICEF and WFP supported Nutrition Facility in the Rohingya refugee camps.
UNICEF/UN0665277/Sujan

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ইউনিসেফ ও বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডাব্লিউএফপি) সমর্থিত সমন্বিত পুষ্টি কেন্দ্রে (আইএনএফ) তিন বছর বয়সী শরীফের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে। দূষিত পানি পান ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সে মৃত্যু ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।  অচেতন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়  এবং সেখানকার  জরুরি কক্ষে টানা দুই দিন তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অনেকটা ওজন কমে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট জটিলতা থেকে অবস্থার উন্নতি হওয়া মাত্রই  সার্বিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের জন্য তাকে আইএনএফে পাঠানো হয়।

A health worker measures mid-upper arm circumference of Nur Kayas with a colour coded tape.
UNICEF/UN0665274/Sujan একজন স্বাস্থ্যকর্মী একটি নির্দিষ্ট রঙের ফিতা দিয়ে নূর কায়েসের বাহুর মধ্য উপরিভাগের পরিধি (মুয়াক)

শরীফের মতো শিশুরা যখন আইএনএফ-এ আসে, তখন তাদের ওজন নেওয়া হয়, উচ্চতা পরিমাপ করা হয়, নথিভুক্ত করা হয় এবং তাদের পুষ্টিগত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে একটি চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সী রোহিঙ্গা শিশুরা নিয়মিতভাবে আইএনএফ-এর ওজন ও উচ্চতা পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং পেতে পর্যবেক্ষণ সেশনে অংশগ্রহণ করে, যা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি অপরিহার্য অংশ। এটি রোগনির্ণয়ের একটি পন্থা হিসেবেও কাজ করে কারণ এর মাধ্যমে শিশুর বৃদ্ধিজনিত ত্রুটি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়।  

একটি সাধারণ রঙিন ব্যান্ড (এমইউএসি টেপ) মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি এবং তীব্র অপুষ্টিতে (এসএএম বা এমএএম)-এ ভোগা শিশুদের শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়। সবুজ ব্যান্ডের অর্থ 'স্বাস্থ্যকর', কমলা অর্থ 'সতর্কতা' বা মাঝারি ধরণের অপুষ্টি এবং লাল অর্থ 'চরম বিপদ' বা মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি।

২০২১ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ইউনিসেফের সহায়তাপ্রাপ্ত কেন্দ্রগুলোতে মারাত্মক অপুষ্টিতে (এসএএম) ভোগা পাঁচ বছরের কম বয়সী ৬,৯২৩ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ১০৭ শতাংশ। এদের মধ্যে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৮৬৯ জন রোহিঙ্গা শিশুকে অন্য কোন চিকিৎসাজনিত জটিলতা না থাকায় কেএস রিলিফের সহায়তায় গড়ে ওঠা এবং ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত সমন্বিত পুষ্টি কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।  

এসএএম বা মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি শিশুদের মধ্যে কৃষকায় অবস্থাকেও বোঝায়, যা শিশুদের অপুষ্টির জন্য সবচেয়ে দৃশ্যমান ও প্রাণঘাতী ধরন।পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং বারবার ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে এটি ঘটে, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

মারাত্মক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর ২৩ মাস বয়সী শিশু নুর কায়েসকে সমন্বিত পুষ্টি কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণেই পুষ্টিকর্মীরা তার মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে ভোগার বিষয়টি নিশ্চিত হন। কায়েসকে অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে তার মা সাজিদার সঙ্গে কথা বলে তারা একটি পুষ্টি পরিকল্পনা তৈরি করেন। ওই পরিকল্পনার অধীনে শিশুটিকে পুনরায় স্বাস্থ্যবান ও হাসিখুশি করে তুলতে নিয়মিত তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা ও পরামর্শ নেয়ার জন্য বলা হয়।

Rohingya mother feeds RUTF to her daughter in the UNICEF nutrition facility. Bangladesh
UNICEF/UN0665276/Sujan ইউনিসেফের পুষ্টি কেন্দ্রে মেয়েকে আরইউটিএফ খাওয়াচ্ছেন রোহিঙ্গা মা।

ইউনিসেফ নুর কায়েসের মতো মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করে। কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টারের (কেএস রিলিফ) সহায়তায় এই চিকিৎসা কার্যক্রম চলে এবং এর মধ্যে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ প্রদান এবং রেডি টু ইউজ থেরাপিউটীক ফুড (আরইউটীএফ) খাওয়ানো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরইউএফপি ক্যালোরি ও পুষ্টিতে পরিপূর্ণ, যা শিশুদের সেরে ওঠার জন্য প্রয়োজন।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ বছরের কম বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ তাদের বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতির বা কম উচ্চতার ছিল। নবজাতক এবং ছোট শিশুদের অনুপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, বিচিত্র এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার পরিমাণ অনুযায়ী না পাওয়া  এবং সেইসঙ্গে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পানি ও স্যানিটেশনের দুরবস্থার মতো বিষয়গুলো অপুষ্টির এই উচ্চ হারের কারণ বলে মনে করা হয়।

The nutrition counsellor explains to a Rohingya mother that her child needs a diverse diet to be healthy.
UNICEF/UN0665279/Sujan পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শদাতা একজন রোহিঙ্গা মাকে বোঝান যে তার সন্তানের সুস্থ থাকার জন্য বিচিত্র খাবারের প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা মায়েদের মধ্যে নবজাতক ও ছোট শিশুদের খাদ্যভ্যাস (ইনফ্যান্ট অ্যান্ড ইয়াং চাইল্ড ফিডিং- আইওয়াইসিএফ) সম্পর্কিত জ্ঞান এবং চর্চা বাড়াতে ইউনিসেফ পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো ও সর্বোত্তম পরিপূরক খাবার দেওয়ার অনুরোধ জানায়। পুষ্টি কেন্দ্রগুলোতে একজন পরামর্শকের মাধ্যমে সরাসরি পরামর্শ সেবা দেওয়া হয়। আর বাড়িতে এই সেবা দেওয়া হয় প্রশিক্ষিত কমিউনিটিভিত্তিক পুষ্টি স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে।

২৩ বছর বয়সী সাজিদা সেই মায়েদের একজন, যারা এই প্রতিরোধমূলক পরিষেবা থেকে উপকৃত হন। "নূর কায়েস আমার প্রথম সন্তান। আমি বুকের দুধ খাওয়ানো এবং এটি শিশুর জন্য কতটা উপকারী সে সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমি শিখেছি যে, দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। আমার মেয়ের বয়স প্রায় দুই বছর এবং এখন আমি  তাকে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিতে শুরু করেছি”, বলেন সাজিদা।

Shajida plays with her daughter in the ECCD corner of UNICEF INF.
UNICEF/UN0665278/Sujan ইউনিসেফ আইএনএফ-এর ইসিসিডি কর্নারে নিজের মেয়ের সঙ্গে খেলা করেন সাজিদা।

কেএস রিলিফের সহায়তায় ইউনিসেফ ও সহযোগীরা ১৪,০০০ অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী মায়েদের আইওয়াইসিএফ সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদানে সক্ষম হয়েছে। খাওয়ানোর বিষয়ে পরামর্শ প্রদান ছাড়াও বাবা-মায়েরা সন্তান লালন-পালনের বিষয়ে তথ্য পেয়েছে। শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির জন্য যেমন স্বাস্থ্যকর খাবার প্রয়োজন, তেমনি তার মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য উদ্দীপক খেলা ও ভালোবাসা প্রয়োজন।  

Rohingya camp, Bangladesh
UNICEF/UN0665275/Sujan