সবকিছু আবারো স্বাভাবিক হচ্ছে: পুনরুজ্জীবিত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতকদের সুরক্ষা

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কোভিড-১৯ একদিকে যেমন কঠোর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে নিয়ে এসেছে অনন্য সুযোগ

ক্যারেন রেইডি
Newborn. Bangladesh
UNICEF Bangladesh/2021/Rony
01 এপ্রিল 2021

দেশের প্রত্যন্ত জেলা ভোলার ৩৫ বছর বয়সী নূর জাহান ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি একটি সন্তানের জন্ম দেন। এটি তার পঞ্চম সন্তান এবং শারীরিক কোন সমস্যা না থাকার কারনে তিনি তার গ্রামের বাড়িতে একজন ধাত্রীর সহায়তায় সন্তান জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

জন্ম দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নূর জাহানের ছেলে নবজাতকের ঠান্ডা লাগে এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার শুরু হয়। চিকিৎসার জন্য তার পরিবারকে ভোলা জেলা হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। নূর জাহানের বাড়ি থেকে গাড়ি করে এই হাসপাতালটিতে যেতে তিন-চার ঘন্টা সময় লাগে। নূর জাহান ও তার স্বামী আবদুল এক্ষেত্রে দুটি বড় সমস্যার সন্মুখিন হন। কোভিড-১৯ এর প্রভাবে পারিবারিক ব্যবসা ব্যাহত হয় এবং সে কারনে জেলা হাসপাতালে যাওয়ার মতো কোনও অর্থ তাদের ছিল না। অন্যটি, জন্মের সময় রক্তক্ষরণের কারনে নূর জাহান অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।

নূর জাহান বলেন, “আমার সন্তানের শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার কারনে আমি ভয় পেয়েছিলাম। সে ঠান্ডাজনিত রোগেও ভূগছিল। আমি জানতাম এটি নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক কিছু হতে পারে।”

পরিস্থিতি আরও সঙ্কটাপূণ© হয়ে উঠলে তাদের যাতায়াত ভাড়ার জন্য নুর জাহানের স্বামীকে অর্থ ধার করতে হয় এবং তার সন্তানের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভেবে নূর জাহান দীর্ঘ পথ যাওয়ার শক্তি সঞ্চয় করে।

 

মাতৃ ও শিশুর সেবার ক্ষেত্রে কোভিড -১৯ দূরত্ব তৈর করে

গত এক দশকে বাংলাদেশে নবজাতক ও শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। বরং শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসের ক্ষেত্রে কাঙ্খিত অগ্রগতি স্থবির হয়ে রয়েছে।[i]

কোভিড -১৯ এর বিস্তারের ফলে দেশব্যাপী মাতৃ এবং শিশু স্বাস্থ্য (এমসিএইচ) সম্পর্কিত সেবা গ্রহণের হার ৫০ শতাংশ নিচে নেমে গিয়েছিল। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে সেবা গ্রহণের সংখ্যা সাধারণতঃ প্রতি মাসে তিন লক্ষ ৫০ হাজারের বেশি হলেও গত এপ্রিল ২০২০-এ সংখ্যাটি এক লক্ষ ৬০ হাজারে নেমে আসে। ছয় মাসে মাতৃ এবং শিশু স্বাস্থ্য (এমসিএইচ) সম্পর্কিত সেবা গ্রহণের হার ৪৫ শতাংশ হ্রাসের ফলে ৩০ শতাংশ বেশি মাতৃমৃত্যু হতে পারে বলে ল্যানসেট মেডিকেল জার্নাল এক বড় ধরনের সতর্ক বার্তা দিয়েছিল।[ii]­­­­

ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রধান ডাঃ সানজানা ভরদ্বাজ বলেন, “এ সময় কোভিড -১৯ এ সংক্রমিত হওয়ার ব্যাপারে উভয় পক্ষেরই ভয় ছিল। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে রোগীরা ভীত ছিল। আবার কাজ করার সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম পাননি।”

২০২০ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ২০০ টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপর পরিচালিত একটি সমীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, কোভিড এবং নন-কোভিড উভয় ক্ষেত্রে সেবা দেওয়ার জন্য ৭০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে  পর্যাপ্ত অক্সিজেন অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরঞ্জাম ছিল না।

 

ভালো ফলাফলের জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি

বাংলাদেশ সরকারের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে ইউনিসেফ ও যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এক সাথে ভোলাসহ আটটি অগ্রাধিকার জেলায় মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

বাংলাদেশের পাঁচটি দরিদ্রতম জেলার একটি হিসাবে ভোলা স্বতন্ত্র চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এটি একটি দ্বীপ জেলা, এই জেলাটি প্রায়শই বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড় দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই জেলায় কোনও রাস্তা বা রেল সংযোগ নেই। কেবল নৌকায় করেই মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানো যায়।

ভোলা জেলা হাসপাতালের স্পেশাল কেয়ার নবজাতক ইউনিট (স্ক্যানু) এর উর্ধ্বতন স্টাফ নার্স অ্যানি লুসিয়া বাড়ৈ বলেন, “জরুরি চিকিৎসার জন্য যদি রোগীদের ভোলা থেকে বরিশাল বা ঢাকায় স্থানান্তরিত করা দরকার হয়, তবে আমাদের অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। এর কারন হলো যাতায়াতের সুযোগ-সুবিধা বেশ জটিল। এই জেলায় যদি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবসম্পদ পাওয়া না যায় তবে রোগীরা মারা যেতে পারে।”

ইউনিসেফ-এফসিডিওর সহায়তায় ভোলা জেলা হাসপাতালের এসসিএএনএনউ’তে (স্ক্যানুতে) অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, সিলিন্ডার, ফ্লোমিটার, রেডিয়েন্ট ওয়ার্মার এবং রিসাসসিটেটর সহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে সন্দেহভাজন কোভিড-১৯ রোগীকে অন্যান্য রোগীদের থেকে পৃথক করার জন্য ট্রিজেস পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।

ডা. ভরদ্বাজ বলেন, “আমরা স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের "ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার", নবজাতকের যত্নের মান এবং অক্সিজেন থেরাপির ব্যবহারের পাশাপাশি ডেটা ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।”

উন্নতমানের সুযোগ-সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের কারনে ভোলা জেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের উপর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে।

উর্ধ্বতন স্টাফ নার্স বাড়ৈ বলেন, ““আমাদের কম ওজনের অনেক নবজাতক রয়েছে। এদেরকে সময়ের আগেই প্রসব করানো হয় এবং এরা মারাত্মক নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়। এসব নবজাতকের অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। এর আগে, আমরা সিলিন্ডার ব্যবহার করে অক্সিজেন সরবরাহের গ্যারান্টি দিতে পারিনি, এবং অক্সিজেনের অভাব জীবন বা মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য করে দিতো। এখন অক্সিজেন কনসেনটেটর থাকার কারনে আমরা স্বস্তি পাই। কারণ আমরা ২৪/৭ অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারি।"

তিনি আরও বলেন, “অক্সিজেন থেরাপির প্রয়োজন রয়েছে এমন জটিল ক্ষেত্রে সেবা দিতে আমরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং আরও সুশৃংখল বোধ করি।”

Newborn. Bangladesh
UNICEF Bangladesh/2021/Rony
ভোলা জেলা হাসপাতালের সদ্য উন্নীত স্পেশাল কেয়ার নবজাতক ইউনিট (এসসিএএনএনইউ) -এ জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ায় নূর জাহান বিছানার পাশে বসে তার নবজাতক শিশুটির দিকে খেয়াল রাখছেন।

সময়ের নিরিখে

ভোলা জেলা হাসপাতালে পৌঁছানোর সাথে সাথে নূর জাহান ও তার সন্তান উভয়েরই তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। নূর জাহানকে রক্ত দেওয়া শুরু হয় এবং তার সন্তানটিকে দ্রুত স্ক্যানুতে ভর্তি করা হয়।

বাড়ৈ বলেন, “নূর জাহানের বাচ্চার কথা আমার মনে আছে। বাচ্চাটির বড় ধরনের প্রসবোত্তর সমস্যা এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ছিল। আমরা তাকে দ্রুত অক্সিজেন সহায়তা সরবরাহ করেছিলাম এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাকে একটি বিশেষ উষ্ণতায় রেখেছিলাম”।

বাড়ৈ আরও জানান, “বাচ্চাদের সাধারণত ২-৩ দিনের জন্য স্ক্যানুতে ভর্তি করা হয়। নূর জাহানের বাচ্চার অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত চারদিন চিকিৎসা সেবা পেয়েছিল। সে সুস্থ হয়ে উঠলে এবং বুকের দুধ খেতে সক্ষম হওয়ার পরেই কেবলমাত্র আমরা তাদের উভয়কেই হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। অক্সিজেন সহায়তা না থাকলে ফলাফলটি অন্য রকম হতে পারত।"

Newborn. Bangladesh
Senior Nurse, Ani Lucia Baroi monitors a newborn baby’s pulse in the newly upgraded Special Care Newborn Unit (SCANU) in Bhola District Hospital.
সিনিয়র নার্স আনি লুশিয়া বাড়ৈ ভোলা জেলা হাসপাতালের সদ্যোন্নত স্পেশাল কেয়ার নবজাতক ইউনিট (এসসিএএনএনইউ) এ নবজাতক শিশুর নাড়ি দেখছেন।

প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ঠেকাতে পরিস্থিতি বদলে দেয়া

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষে্ত্রে যে গুরুতর সমস্যা রয়েছে সেগুলোর দিকে কোভিড-১৯ নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের উপর নতুন করে আলোকপাত করার ফলে এই ব্যবস্থাকে আরও ভাল করে গড়ে তোলার এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ডাঃ ভরদ্বাজ বলেন, “প্রয়োজনীয় সকল মাতৃ এবং শিশু স্বাস্থ্য সেবাসমূহ পুনরুদ্ধার করতে আমরা কোভিড-১৯ প্রতিরোধ, সুরক্ষা এবং অভিযোজন ব্যবস্থার পাশাপাশি কমিউনিটিতে প্রচার কায©ক্রম চালু রাখতে সরকারের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মাতৃ এবং শিশু মৃত্যুর হার আরও কমিয়ে আনতে সেবার মানের দিকে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুকে শূন্যে নামিয়ে আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

ডাঃ ভরদ্বাজ আরও বলেন, ““অক্সিজেন সহায়তা, মানবসম্পদ, ডেটা ম্যানেজমেন্ট এবং মানসম্মত সেবাসমূহের ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ একটি কঠিন সময়ে মাতৃ এবং শিশু স্বাস্থ্য সেবাকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করে। আমরা বিশ্বাস করি যে, এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। কারণ ভবিষ্যতে মা এবং ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতকদের বাঁচানোর জন্য আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।"

সমগ্র বাংলাদেশে স্পেশাল কেয়ার নবজাতক ইউনিটগুলো স্থাপনে অবদান রাখার জন্য ইউনিসেফ যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অফিসের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে


[i] ইউনিসেফ (২০১৯)। বাংলাদেশ মাল্টি ইনডিকেটর ক্লাষ্টার সার্ভে (মিক্‌স) ২০১৯।<https://mics.unicef.org/news_entries/152/BANGLADESH-MICS-2019-REPORT:-KEY-FINDINGS> গৃহিত ০৯ মার্চ ২০২১।

[ii] রবাট©সন, টিমুথি এবং অন্যান্যরা., (২০২০)। ‘আর্লি এসটিমেটস অব দ্যা ইনডাইরেক্ট ইফেক্টস অব দ্যা কোভিড-১৯ প্যানডেমিক অন ম্যাটারন্যাল এন্ড চাইল্ড মরটারলিটি ইন লো-ইনকাম এন্ড মিডল ইনকাম কান্ট্রিজ: অ্যা মডেলিং স্ট্যাডি’, দ্যা ল্যানসেট, ভলিউম. ৮, জুলাই ২০২০, পৃষ্ঠা, ৯০১-০৮।< www.thelancet.com/pdfs/journals/langlo/PIIS2214-109X(20)30229-1.pdf > গৃহিত ১০ মার্চ ২০২১।