শিশু বিয়ে রুখে দাঁড়াতে সাহস খুজেঁ পাচ্ছে তারা

সুন্দর ভবিষ্যতের গড়ে তুলতে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ইউনিসেফ-সমর্থিত বহুমুখী কেন্দ্রগুলোতে জীবন দক্ষতা শিখছে কিশোরীরা

তাসনীম কিবরিয়া
Azida, 15, outside of a UNICEF-supported multi-purpose centre in the Kutupalong refugee camp in Cox’s Bazar.
UNICEF/UNI519797/Sujan
06 জুন 2024

সবেমাত্র কৈশোরে পা দিয়েছে আজিদা। এমন এক সময়ে পারিবারিক প্রথা মেনে নিয়ে শিশুবিয়েতে রাজি হবে নাকি নিজের স্বপ্নপূরণে পা বাড়াবে- এই দোটানায় পড়ে সে । মায়ানমারে একটি সমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে উঠলেও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এসে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। বিশেষ করে আবাদি জমির সংকট এবং বিয়ের মাধ্যমে মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার প্রচলিত বিশ্বাস তার পরিবারকে, সাথে তার ভবিষ্যতকেও সংকটে ফেলে দেয়। 

“আমার যখন ১৩ বছর বয়স, তখন বিয়ের প্রস্তাব আসে” স্মরণ করেন বর্তমানে ১৫ বছর বয়সী আজিদা। “তখন কোভিড মহামারি চলছে। আমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে এবং এবার আমার পালা। এজন্য এলাকার মানুষ আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়ার জন্য আমার বাবা-মাকে বলতে থাকে। যদিও আমি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলাম।”

শিশু হওয়া স্বত্ত্বেও সামাজিক চাপ ও শিশুবিয়ের প্রচলিত রীতিনীতি আজিদাকে এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। কোভিড মহামারির সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করতে শিক্ষণকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় এই চাপ আরও তীব্র হয়। আজিদার মতো কিশোরীরা বাঁশ-ঘেরা ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বন্দী হয়ে পড়ে। সে সময়ে শিশুবিয়ের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ কমিউনিটির মানুষেরা বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার জন্য তার বাবা-মাকে চাপ দিতে থাকে।

"আমি আমার বাবা মাকে বলেছিলাম, আমি বিয়ে করতে চাই না” আজিদা জানায়। সে আরও বলছিলো, “আমি বহুমুখী কেন্দ্র এবং কিশোর-কিশোরীদের ক্লাবগুলোতে যাতায়াত করতাম। সেখানে আমি শিশুবিবাহ, শিশু নির্যাতন এবং এ জাতীয় সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে শিখতে পেরেছি। আমি জানতাম যে, আমার বয়স কম এবং এতো তাড়াতাড়ি আমার বিয়ে করা উচিত নয়। কারণ এটি আমার ব্যক্তিগত জীবন এবং শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অল্প বয়সে গর্ভধারণ, মা ও শিশুর জন্য অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে- এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।” 

Azida interacts with her peer and vocational training instructor during a sewing class
UNICEF/UNI517337/Sujan বহুমুখী কেন্দ্রে সেলাই ক্লাসের সময় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষকের সাথে কথা বলছে আজিদা; সাথে রয়েছে তার এক বান্ধবী।

শিশুবিয়ে, শিশুশ্রম, মানসিক বিপর্যয় ও নির্যাতন এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি অবহেলা ও বৈষম্যসহ নানা ধরনের সমস্যা সমাধানে কাজ করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং ইউনিসেফের সহায়তায় এই বহুমুখী কেন্দ্রগুলো কাজ করে চলেছে। এই কেন্দ্রগুলোর আওতায় কিশোর-কিশোরীদের ক্লাব, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও আত্মপ্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট ও নিরাপদ পরিবেশ প্রদানের মাধ্যমে তরুণ এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে জীবনের লক্ষ্য ও সহিষ্ণুতা তৈরী করা হয়; সাথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কৌশলও শেখানো হয়।

প্রায় চার বছর ধরে কিশোর-কিশোরীদের ক্লাবে যাচ্ছে আজিদা। এই সময়ে শিশুবিয়ে, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, শিশু নির্যাতন ও শিশুদের ক্ষমতায়নসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছে সে। ফ্যাসিলিটেটরদের দেয়া জীবন-দক্ষতা’র সেশনগুলো থেকে শিশুবিয়ের সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছে; নিজের বক্তব্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আরও আত্মবিশ্বাসী ও  আগ্রহী হয়ে উঠেছে সে। 

 "একদিন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এক ছেলের বাবা-মা আমাদের বাড়িতে আসেন," স্মরণ করেন আজিদা। "আমি আমার বাবা-মাকে বলি যে এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করা আমার পক্ষে ঠিক হবে না। আমি এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে পারবো না। আমি জানিয়ে দিই, বিয়ের আইনী বয়স ১৮ বছর। তবে তারা আমার কথা শুনেনি। তাই আমি বহুমুখী কেন্দ্রে এসে সেলাই প্রশিক্ষকের সাথে আমার অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করি। 

আজিদার আকুতি কানে নেয়নি তার পরিবার। শিশুবিয়ের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ধারণা থাকায় এবার মুখ খুলতে বাধ্য হয় আজিদা। আজিদার কাছ থেকে তার পরিস্থিতির কথা শুনে সেলাই প্রশিক্ষক তাকে একজন কেস কর্মীর কাছে পাঠায়। 

"আমার বাবা-মা বাল্যবিবাহের ক্ষতিকারক পরিণতি সম্পর্কে জানতো না। কেসকর্মী তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদেরকে সচেতন করেন। কীভাবে একটি মেয়ে নির্যাতন এবং অবহেলার শিকার হতে পারে, সে বিষয়ে কেসকর্মী তাদেরকে ধারণা দেন। এর মাধ্যমে অল্প বয়সে গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আমার বাবা-মা জানতে পারে,” ব্যাখ্যা করে বলে আাজিদা।

কেসকর্মীর হস্তক্ষেপে আজিদার বাবা-মা বুঝতে পারেন যে, তারা তাদের মেয়ের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে যাচ্ছেন এবং এরপর তারা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নেন।

"আমার পরিবার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুনে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। এটা আমাকে সাহস জুগিয়েছিলো,' সেই মুহূর্তের স্বস্তি বর্ণনা করতে গিয়ে আজিদা বলে।

এটি শুধু আজিদার ব্যক্তিগত বিজয় ছিলো না, অন্যদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে সে। এখন নিজের স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আজিদা। এখন সে, কিশোর-কিশোরীদের ভবিষ্যতের জন্য বহুমুখী কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালিত প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশের বিভিন্ন সেশনের একটি ‘এমব্রয়ডারি কোর্সে’ নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। বাবার কিনে দেয়া নতুন সেলাই মেশিন দিয়ে নিজের এবং অন্যদের জন্য পোশাক তৈরি করে। 

"আমি এখনও সেলাই শিখছি। আমি ড্রেস, ফ্রকসহ অন্যান্য জিনিস বানাই। আরও দক্ষ হয়ে উঠলে আমি আরও কিছু আইটেম তৈরি করব,” হাসিমাখা মুথে কথাগুলো বলছিলো আজিদা। 

"আমি জানি আমার জীবনকে আমি যেভাবে চাই সেভাবে পরিবর্তন করতে পারি। এখন কেউ যদি আমার কাছে এসে বলে যে, তাদের বাবা-মা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিচ্ছেন, আমি তাদের বোঝানোর জন্য আমার গল্পটি শেয়ার করি,” এভাবেই কথা চালিয়ে যায় আজকের আত্মপ্রত্যয়ী আজিদা।

Azida learns how to use a sewing machine to make clothing and other items.
UNICEF/UNI517338/Sujan  সেলাই মেশিন ব্যবহার করে পোশাক এবং অন্যান্য জিনিসপত্র তৈরি করা শিখছে আজিদা