‘মেয়েরাও (কন্যাশিশুরা) বড় কিছু অর্জন করতে পারে, তা আমি দেখাতে চাই’
নড়াইলের এক সময়ের লাজুক কিশোরী রানী জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখে; নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে তৈরী করে চলেছে
- বাংলা
- English
নড়াইল, বাংলাদেশ- পড়ন্ত বিকেলে গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছিল। এমন সময় ১৫ বছর বয়সী রানী বিশ্বাস আত্মবিশ্বাসের সাথে ভলিবলটিকে স্পর্শ করল; বলটি নিমিষে নেটের ওপারে। উচ্ছস্বিত তার দলের খেলোয়াড়েরা সব একসাথে তালি দিয়ে ওঠে, আর দ্রুত পরবর্তী সার্ভের জন্য নিজেদের অবস্থান ঠিক করে নেয়।
মাত্র দুই বছর আগেও রানী কখনো কল্পনা করেনি যে, সে ভলিবল কোর্টে দাঁড়াবে, তার ওপর আবার জার্সি পরে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় দর্শকদের সামনে খেলবে। রানী তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বাবা বাড়ি ছেড়ে যান। এরপর থেকে মায়ের কাছেই বেড়ে উঠেছে সে। ছোটবেলা থেকেই রানী লাজুক ও অন্তর্মুখী স্বভাবের। তার মা সুচিত্রা (৫০) কৃষিকাজ করতেন, তবে মেয়ে যেন নিয়মিত স্কুলে যায় এব্যাপারে তিনি বেশ সচেতন ছিলেন।
এক বিকেলের কথা, তাদের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। কমিউনিটি মবিলাইজার শিউলি মোরশেদা (৫০) ওই এলাকার কন্যাশিশুদের স্পোর্টস ফর ডেভেলমেন্ট (এসফোরডি) প্রোগ্রামের আওতায় খেলাধুলার প্রশিক্ষণে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছেন। এটাকে মেয়ের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখেন সুচিত্রা। তিনি রানীকে প্রশিক্ষণে পাঠাতে উৎসাহিত করলেন। নড়াইলে চালু হওয়া ফুটবল, কাবাডি, ভলিবল, ক্রিকেট ও আত্মরক্ষার কোশল- এই পাঁচটি খেলার প্রশিক্ষণের মধ্যে ভলিবল বেছে নেয় রানী।
রানী এখন উপজেলা পর্যায়ে খেলে। “একটি শান্ত, অন্তর্মুখী মেয়ে থেকে রানী একজন আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী ভলিবল খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে, সে একদিন জাতীয় পর্যায়ে খেলার বিষয়ে প্রত্যয়ী,” বলেন শিউলি।
খেলা, খেলার প্রতি নিষ্ঠা আর ভালোবাসা এবং একজন মায়ের নিরলস সমর্থন কীভাবে রানীর একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যাত্রায় ভূমিকা রাখছে, সেই গল্প শুনতে সম্প্রতি আমরা রানী, তার মা সুচিত্রা ও কমিউনিটি মবিলাইজার শিউলির সঙ্গে বসেছিলাম।
প্রশ্ন: রানী, কীভাবে তুমি ভলিবল খেলা শুরু করলে সেটা আমাদের একটু বলো।
রানী: শিউলি আপু আমাদের বাড়িতে আসার পর আমি ভলিবল খেলা শুরু করলাম। খেলাধুলা কীভাবে আমার মতো একটি মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক হতে পারে, তা তিনি আমার মাকে বুঝিয়ে বললেন। শুধু খেলা করা নয়, এটা আত্মবিশ্বাস অর্জন, দলগতভাবে কাজ করা ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে শেখায়। এই প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার বিষয়ে মা খুশি মনে রাজি হলেন। আমি সব খেলার মধ্যে ভলিবল শিখতে চেয়েছিলাম। প্রথম দিকে আমি লজ্জা পেতাম। কিন্তু এখন স্টেডিয়ামকে আমার দ্বিতীয় ঘরের মতো মনে হয়।
প্রশ্ন: এসফোরডি প্রোগ্রাম থেকে খেলার বাইরে আর কী কী তুমি শিখেছ?
রানী: আমরা অনেক কিছু শিখেছি। শিউলি আপা আমাদেরকে বাল্যবিবাহ ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ক্ষতিকর দিকগুলো, শিক্ষার গুরুত্ব এবং ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে বলেছেন। আমরা দুই মাসে এ রকম ১৬টি সেশনে অংশ নিয়েছি। আগে আমি চুপচাপ থাকতাম, কিন্তু এখন রাস্তায় কাউকে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতে দেখলে আমি প্রতিবাদ করি।
প্রশ্ন: আমরা জেনেছি, তুমি এখন উপজেলা পর্যায়ে খেলছ। অভিনন্দন! এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
রানী: ধন্যবাদ। আমাদের কোচ আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমি নিজেও নিয়মিত অনুশীলনে গিয়েছি। আমার স্কুলও ক্লাস শেষে ভলিবল প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আমাকে উৎসাহিত করেছে ও সহায়তা দিয়েছে। আমি কখনো ভাবিনি, আমি আমার নড়াইল সদর উপজেলাকে প্রতিনিধিত্ব করব। এখন আমি তা করছি।
প্রশ্ন: খেলোয়াড় হিসেবে কে তোমাকে অনুপ্রাণিত করেছে?
রানী: আমি বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমাকে খুবই পছন্দ করি। আমি লিওনেল মেসিকেও পছন্দ করি। তারা দুজনই আমাকে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রশ্ন: তোমার ভবিষ্যতের স্বপ্ন কী?
রানী: একদিন আমি বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি পরে জাতীয় নারী ভলিবল দলের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। আমি দেখাতে চাই যে, মেয়েরা (কন্যাশিশু) বড় কিছু অর্জন করতে পারে।
প্রশ্ন: সুচিত্রা, রানীর মা হিসেবে মেয়ের এই পথে যাত্রা দেখতে আপনার কেমন লেগেছিল?
সুচিত্রা: সমাজ কীভাবে এব্যাপারটা দেখবে, তা নিয়ে শুরুতে আমি দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম, আমার মেয়ের জন্য এটাই সঠিক পথ। আমার অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে এবং আমি কখনো স্কুলে যাইনি। আমি রানীর জন্য ওই জীবন চাইনি। আমি চেয়েছি, আমি জীবনে যেসব সুযোগ পাইনি সেগুলো যেন সে পায়। প্রতিবার সে হাসতে হাসতে বাড়িতে আসে এবং বলে, “আমি আজকে ভালো খেলেছি।” তখন আমার গর্ব হয়। সে খুশি হলে আমিও খুশি হই।
প্রশ্ন: রানীকে নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
সুচিত্রা: সে পড়াশোনা ও খেলা চালিয়ে যাক। সে তার নিজের পায়ে দাঁড়াক। আমি সব সময় তাকে সহায়তা করব। একদিন সে যদি ভালো একটা চাকরি পায়, তাহলে সেটা খুব ভালো হবে।
প্রশ্ন: শিউলি, আপনি এখানে কমিউনিটি মবিলাইজার। আপনার কাজটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?
শিউলি: সাধারণত, বাবা-মায়েরা ইতিবাচক মনোভাব দেখান। কিন্তু অনেক পরিবার এখনো মনে করে, খেলাধুলা শুধু ছেলেদের জন্য। আমি বাড়িতে বাড়িতে যাই, বাবা-মায়েদের সঙ্গে কথা বলি এবং এই কর্মসূচি কীভাবে তাদের সন্তানদের আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে এবং কীভাবে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, তা ব্যাখ্যা করে বলি।
মাঝে মাঝে মায়েরা তাদের মেয়েদের গোপনে অনুশীলনে পাঠান। বাবারা যখন টের পান, তারা তাদের অনুশীলন বন্ধ করে দেন। তখন আমি এগিয়ে যাই, বাবাদের সঙ্গে আলোচনা করি এবং এই কর্মসূচি কীভাবে কন্যাশিশুদের শিক্ষা ও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক সেটা বুঝতে তাদের সহায়তা করি। আমি তাদের এটাও বলি যে, অনুশীলনে অংশ নেওয়ার জন্য মেয়েরা সনদ পাবে। ওই সনদ তাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য সহায়ক হবে। তারপর তারা বুঝতে পারে, এটা কীভাবে তাদের সন্তানদের উপকার করবে এবং এই চিন্তার সঙ্গে একমত পোষণ করে। যখন তারা দেখে তাদের মেয়েরা ভালো করছে, তখন বাবা-মায়েরা সাধারণত তাদের মানসিকতার পরবির্তন করে।
প্রশ্ন: এই কর্মসূচির আওতায় খেলাধুলার বাইরে আর কী কী বিষয় শেখানো হয়?
শিউলি: যেসব ছেলে-মেয়ে এই কর্মসূচিতে নাম লেখায় তাদের নিয়ে প্রতি মাসে বাল্যবিবাহ, শিশু নিপীড়ন, শিশুশ্রম ও ঘরে সহিংসতার মতো ক্ষতিকর সামাজিক চর্চাগুলো নিয়ে গ্রুপভিত্তিক আলোচনা করা হয়। বাবা-মায়েরা কীভাবে তাদের সন্তানদের বিকাশের জন্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারেন, সে বিষয়েও সেশন পরিচালনা করা হয়। এ রকম একটি সেশনে একজন মা স্বীকার করেন যে, তিনি প্রায়ই তার মেয়েকে মারধর করেন। সেদিন আমি তাকে বলি, এটা বন্ধ করবেন বলে আপনি প্রতিজ্ঞা করুন। দুই মাস পরে তার মেয়ে আমাকে বলেছে, তার মা ওই প্রতিজ্ঞা রেখেছেন।
প্রশ্ন: ইউনিসেফের জন্য আপনার কি কোনো বার্তা আছে?
শিউলি: এই উদ্যোগের অংশ হতে পারার সুযোগ দেওয়া এবং কন্যাশিশুদের জন্য এই নিরাপদ জায়গা তৈরিতে সহায়তা করার জন্য আমি ইউনিসেফের প্রতি কৃতজ্ঞ। যখন মেয়েরা আমার কাছে আসে এবং বলে, “আপু, আমি তোমাকে ভালোবাসি,” এটা আমার কাছে বিশ্বজয় করার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এটা আমাকে এমন উপলব্ধি দেয় যে, আমি এই প্রান্তিক শিশুদের জন্য বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের সত্যিকারে ভালো কিছু করছি।
ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০২২ সালে ‘দ্য স্পোর্টস ফর ডেভেলপমেন্ট (এসফোরডি) প্রোগ্রাম’ চালু করে। এই কর্মসূচি ধীরে ধীরে তবে নিশ্চিতভাবে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। যেসব সামাজিক রীতি-নীতি ছেলে-মেয়েদের বিকাশের অন্তরায় হিসেবে কাজ করে, সেগুলো মোকাবিলায় এই কর্মসূচি তাদের সহায়তা করছে। তারা এই কর্মসূচি থেকে নিচের বিষয়গুলো থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ারও সুযোগ পাচ্ছে: ফুটবল, ভলিবল, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, আত্মরক্ষা, ক্রিকেট, স্কেটবোর্ডিং, সার্ফিং এবং স্থানীয় বিভিন্ন খেলা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এসফোরডি কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের ৩৮টি এলাকার (২৬টি জেলা ও ১২টি সিটি করপোরেশন) এক কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এসব মানুষের মধ্যে শিশু, কিশোর-কিশোরী, বাবা-মা ও কমিউনিটি সদস্যরা রয়েছেন। এই কর্মসূচিতে সহায়তা করার জন্য সৌদি আরবের কিং সালমান হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টারকে ধন্যবাদ। এই কর্মসূচির ফলে কমিউনিটিগুলোতে সেই সব স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে, যেগুলো এক সময় তাদের কাছে অকল্পনীয় ছিল।