শিশুদের জন্য শুধু খেলাধূলা নয়: বাংলাদেশের যুবাদের মূল্যবান শিক্ষা দিচ্ছে কিশোর-কিশোরী ক্লাব
ইউনিসেফ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় পরিচালিত কিশোর-কিশোরী ক্লাবগুলো শিক্ষার সুফল এবং বাল্যবিবাহের বিপদ সম্পর্কে শিক্ষা দিচ্ছে
- বাংলা
- English
নিজের শিক্ষার সম্ভাবনাকে পিছনে ফেলে রেখে ২১ বছর বয়সী সুলতানা খুব সহজেই বিয়ে করতে এবং মা হতে পারতো। কিন্তু বিয়ে না করে, একজন হিসাবরক্ষক হওয়ার জন্য পড়াশোনা করার পাশাপাশি সুলতানা তার বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট বোনঝি’র দেখাশোনা করছে এবং বাংলাদেশের ব্যস্ত রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলায় কিশোর-কিশোরী ক্লাবে শিক্ষকতা করছে।
ঢাকার একটি সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় অবস্থিত ক্লাবটি শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য এমন একটি নিরাপদ স্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে যেখানে তারা শিখতে ও খেলতে পারে। এসব শিশু এবং কিশোরী-কিশোরীদের অনেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও দারিদ্র্যতার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। এমনকি এদের অনেকেই রাস্তায় বসবাস করেছে। ক্লাবগুলো আবার তাদের শৈশব ফিরে পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, এছাড়াও বাল্যবিবাহের বিপদ এবং শিক্ষার সুফল সম্পর্কে প্রচার করেছে।
২০১১ সালে ক্লাবে যোগদানের পর থেকে, কিশোর-কিশোরী ক্লাব সুলতানার জীবন এবং তার আকাঙ্খাকে বদলে দিয়েছে। সে যা শিখেছে এখন তা সে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
একজন পিয়ার লিডার বা দলনেতা হিসাবে সুলতানা ২০১৮ সাল থেকে ক্লাবে সপ্তাহে দুইবার প্রায় ৩০জন কিশোর-কিশোরীকে স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং পুষ্টি থেকে শুরু করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে শেখাচ্ছে। এছাড়াও সে কারাতে, ক্রিকেট এবং নাচের মতো শারীরিক ক্রিয়াকলাপ চালানোর মাধ্যমে তার সমবয়সীদের উৎসাহিত করছে।
অল্প বয়সে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তে বদ্ধপরিকর সুলতানা
দুই বোন এবং তিন ভাই সহ একটি বড় পরিবার থেকে এসেছে সুলতানা। কিন্তু তার বাবা-মা এবং ভাগ্নির বেশিরভাগ দায়িত্ব এখন সুলতানার অল্পবয়সী কাঁধে। সংসারের সব চাহিদা মেটাতে সুলতানা দর্জি এবং গৃহশিক্ষকের কাজ করার পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনাতেও সাহায্য করে।
সুলতানা যখন শিশু ছিল, তার বোনরা তাকেও বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করতো, উল্লেখ্য যে তার দুই বোনের অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু ক্লাবে সুলতানা যে শিক্ষা লাভ করেছিল সেটা তখনও তার কানে বাজতো। এ কারণে সুলতানা তার মাকে বলে:
“আমার ভাইয়েরা তোমার দেখাশোনা করছে না। আমি তোমার মেয়েদের মত অশিক্ষিত কাউকে বিয়ে করে বিচ্ছেদের শিকার হয়ে বাড়ি ফিরব না। আমি আমার নিজের খরচে পড়াশুনা করবো, একটা চাকরি করবো তারপর একজন ভালো মানুষকে বিয়ে করবো যাতে তোমার দেখাশোনা করতে পারি।”
বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫০ শতাংশেরও বেশি মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এদেশে বাল্যবিবাহের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
সুলতানা সবসময় যে এতটা শক্তিশালী ছিল তা নয়। বিষয়টি সে নিজেও স্বীকার করেছে। কয়েক বছর আগে, সুলতানা এক ছেলেকে ভালোবেসে তার প্রেমে পড়েছিল। সে ছেলে সুলতানাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সুলতানা জানায়, এতে করে সে অনেক কান্নাকাটি করেছিল এবং সে সময় সে অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছিল।
এখন সুলতানা যে কিশোর-কিশোরী ক্লাবের পিয়ার লিডার, সেই ক্লাবের একজন কাউন্সেলরের কাছে এসে সুলতানা আবার নতুন করে অনেক কিছু উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল। “আপা, আমি একটি ব্যাঙ্কের চাকরি পেতে চাই, এবং আমার আপনার নির্দেশনা দরকার”। এই কথাগুলো বলার সাথে সাথে সুলতানা আরও জানিয়েছিল যে, সে তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা-যত্ন করতে এবং ক্লাবের মাধ্যমে অন্যদের সহযোগিতা করতে চায়।
কাউন্সেলরের নির্দেশনায় সুলতানা তার নিজের পথ পাড়ি দিতে থাকে। সে স্বাধীন হতে, কর্মজীবন শুরু করতে, তার পিতামাতাকে সহযোগিতা করতে এবং পিহুর জন্য আদর্শ হতে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ ছিল। পিহু সুলতানার বোনের মেয়ে। সুলতানার এই বোন তার প্রথম স্বামীকে তালাক দেওয়ার পরে পুনরায় বিয়ে করেছে এবং পিহুকে সুলতানার কাছে রেখে গিয়েছে।
ভবিষ্যৎ গড়ার পথে
এটি সবসময় সহজ ছিল না। কারণ ২১ বছর বয়সও বিয়ে না করার জন্য সুলতানা ও তার পরিবারকে আজও প্রতিবেশীরা বিরক্ত করে।
কিন্তু সুলতানা এ ধরনের মন্তব্যকে ঝেড়ে ফেলে।পিহুকে বাল্যবিবাহে বাধ্য হওয়া এবং পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে, সুলতানা তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে এবং তার পড়াশোনায় সহায়তা করছে।
কুর্মিটোলা কিশোর-কিশোরী ক্লাব ঢাকায় বসবাসকারী ৮৫০ জন কিশোর-কিশোরীকে সহায়তা করছে। ২০২১ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকায় এরকম ২৫টি শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্লাব চলছে। ক্লাবগুলো ইউনিসেফের সহায়তায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক আনুকূল্যে বাংলাদেশের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।