রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটের তিন বছর
শিশুদের সাহস, সহনশীলতা এবং শক্তির বীর গাথা
- বাংলা
- English
ক্রমবর্ধমান সহিংসতার ফলে ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্টি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করে। নারী, পুরুষ এবং শিশুরা সাথে করে নিয়ে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচারের কাহিনী। হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষজন তাদের বাড়িঘর ছেড়ে মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে।
যারা বেঁচে গেছে তাদের জন্য এটি ছিল এক যন্ত্রণাদায়ক যাত্রা। দীর্ঘ পথ হেঁটে পাহাড়, পর্বত, নদী ও সাগর পেরিয়ে তারা এদেশে এসেছে। এদেশে আসতে কারো কারো কয়েক দিন লাগলেও, অনেকের জন্য এক মাসেরও বেশি সময় লেগেছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার সময় শিশুরা তাদের হাতের কাছে যে সব জিনিষপত্র পেয়েছে সবই নিয়ে এসেছে। তবে, ব্যথা, ভয়, ক্লান্তি, অনাহার এবং তৃষ্ণা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
বেশ কয়েক মাস ধরে, মিয়ানমারে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় শরণার্থীরা বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আসতে থাকে।
বাংলাদেশে আসার পর থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বন্যা, ভূমিধ্বস, তীব্র ঝড়সহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে এবং এখন তারা কোভিড-১৯ মহামারীর রিরুদ্ধে লড়াই করছে।
দুঃখজনক এসব ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণামূলক গল্পও এখন সামনে আসতে শুরু করেছে। ক্ষত দুর করে জীবন পুনর্নির্মাণের জন্য সাহস, সংকল্প এবং শক্তির গল্পও রয়েছে চ্যালেঞ্জিং এবং উপচে পড়া শরণার্থী আশ্রয়শিবিরগুলোতে।
আশাবাদী ও উন্নত ভবিষ্যতের লক্ষ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিশু,তরুণ ও নারীরা এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী আশ্রয়শিবিরে এখন প্রায় ৮ লক্ষ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা নির্বাসিত জীবনযাপন করছে। এদের অর্ধেকের বেশি শিশু।
জুবায়ের অবিশ্বাস্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। সে সব সময় হাসে, পড়াশোনা করে এবং ফুটবল খেলতে ভালবাসে। মিয়ানমারে তার গ্রাম ছেড়ে পালানোর সময় যখন সে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। তার পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং অচেতন হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল। জীবন বাঁচাতে তাঁর গুলিবিদ্ধ বাম পা কেটে ফেলা হয়েছিল। ফুটবলে প্রচন্ড আগ্রহ থাকায় কেবলমাত্র একটি পা দিয়ে সে ফুটবল খেলে এবং বাঁশের তৈরি একটি লাঠির সাহায্যে সে তার শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে। জুবায়েরের অনেক স্বপ্ন আছে। সে জানায়, “আমি মেসির সাথে দেখা করতে এবং তার সাথে ফুটবল খেলতে চাই।”সে ভালভাবে পড়াশোনা করতে চায়। সে আরও জানায়, “আমি ভালভাবে পড়াশোনা করতে চাই যাতে করে একদিন আমি ভাল একটা চাকুরি পেতে পারি এবং আমার পরিবারকে সাহায্য করতে পারি।”
শারীরিক ও মানসিক ক্ষত থেকে বেঁচে যাওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে জুবায়ের একজন। তবে, এতো কিছুর পরও তাদের উন্নত ভবিষ্যত গড়ার সাহস এবং শক্তিকে ধ্বংস করা যায়নি।
ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত কেন্দ্রে ১৪ বছর বয়সী কোহিনুর হস্তশিল্পের পাশাপাশি বার্মিজ এবং ইংরেজি ভাষা শিখছে। কোহিনুর জানায়, “আমি বার্মায় আমার বাড়িটি খুব মিস করি।”সে আরও জানায়, “আমার পরিবারের একটি দোতলা খামার-বাড়ি ছিল। এই খামার বাড়িতে কিছু জমি, গবাদি পশু এবং একটা সুন্দর বারান্দা ছিল।”কোহিনুরকে এ সব কিছুই ফেলে আসতে হয়েছে এবং তার বাড়ি থেকে অনেক দুরে শরণার্থী আশ্রয়শিবিরে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়েছে। ২০১৭ সালে তার পরিবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত কেন্দ্রে এই প্রথম সে কোনও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেলো। কোহিনুর জানায়, ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত কেন্দ্রটি তাকে জীবনের নতুন অর্থ দিয়েছে। প্রতিদিনের গৃহস্থালী কাজ যেমন রান্না করা ও পানি সংগ্রহ করার অবসরে কেন্দ্রটি তার জন্য একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। কোভিড-১৯ শুরুর আগে, কেন্দ্রটিতে সে সপ্তাহে ছয়দিন যেত। ভবিষ্যতে একদিন সে একজন দর্জি হয়ে তার জীবিকা নির্বাহের আশা করে।
বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয়শিবিরের এক আগ্রহী শিক্ষার্থী ১০ বছর বয়সী সাদিয়া মিয়ানমারে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারত না। কারন সহিংসতার ফলে স্কুলে যাওয়ার পরিবেশ অনিরাপদ হয়ে উঠেছিল। মিয়ানমারের নিজ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসে ২০১৭ সালে কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে হয়েছিল বলে সে মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিল। যে দুর্দশা সে প্রত্যক্ষ করেছিল সেগুলি এখন সে ভুলে যেতে চায়। মনো-সামাজিক সহায়তা পাওয়ার পরে এখন যদিও সে আগের চেয়ে ভাল আছে, তবু ফেলে আসা বাড়ির জন্য তার মন কাঁদে। সে জানায়, “এখানে আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছি বলে সত্যিই খুশি। আমি আমার আশেপাশের সকল বন্ধুবান্ধবকেও শিক্ষা কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করি। ভবিষ্যতে এটি আমাদের সহায়তা করবে।”
শরণার্থী সংকট ১৩ বছর বয়সী জিয়াকে তার পরিবারের জন্য জীবিকা অর্জন করতে বাধ্য করেছে। তবে, উচ্চশিক্ষা এবং উন্নত জীবনের জন্য তার স্বপ্নের এখনও অবসান হয়নি। সে ডাক্তার হতে চায়। সে জানায়, “আমি একদিন মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। এভাবে শরণার্থী আশ্রয়শিবিরে আমাদের জীবনযাপন করা উচিত নয়।”আশ্রয়শিবিরে জিয়া একটা ছোট্ট দোকান দিয়েছে। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় সে তার পিতাকে হারিয়েছিল। সে বলছিল, “তারা আমাদের গুলি করছিল। তারপর পাহাড়ে আমি আমার বাবাকে খুঁজে পেলাম না। সম্ভবত তাকে হত্যা করা হয়েছিল।” তার পরিবার, বিশেষ করে তার প্রতিবন্ধী ভাই ছিল জিয়ার অনুপ্রেরণা। সে আরও বলছিল, “আমার ছোট ভাইবোনরাও এখন শিক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। তবে, আমি ইতোমধ্যে মিয়ানমারে এসব পড়াশোনা শেষ করেছি। আমার এখন উচ্চতর শিক্ষার প্রয়োজন।”রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের উন্নত শিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ইউনিসেফ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে । ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে টার্গেট করে পাইলট প্রকল্প হিসাবে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম চালু করার অনুমতি দিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার এই সম্প্রসারণের ফলে জিয়ার স্কুলে ফিরে আসা এবং তার স্বপ্নগুলি একদিন বাস্তবায়ন করার সুযোগ হবে।
২০১৮ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে চ্যাম্পিয়ন যুব স্বেচ্ছাসেবক হয়েছিল আশেকা আকতার। সে সময় তার বয়স ছিল ১৬ বছর। উন্নত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনায সম্পর্কিত জীবন রক্ষাকারী তথ্য দিয়ে সে নিজের সম্প্রদায়ের অগণিত মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেছে সে। আশেকা জানায়, “স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত সেরা অনুশীলনগুলো অনুসরণ করে কীভাবে শিশুদের এবং তাদের নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হয় সে সম্পর্কে আমি আমার সম্প্রদায়ের নারী এবং মেয়েদের সাথে ঘরে বসে কথা বলি এবং এসব বিষয়ে তাদের অবহিত করি।” মিয়ানমারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শেষে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আশেকা বাংলাদেশে আসে। আশ্রয়শিবিরে কাজ করা যদিও খুব কঠিন, তবুও যুব স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করার চ্যালেঞ্জকে সে উপভোগ করে। সে আরও জানায়, “আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আমি আমার সম্প্রদায়ের জন্য এমন কিছু করতে সক্ষম হয়েছি যা ইউনিসেফের তথ্য কেন্দ্রে আসার আগে এবং সঠিক তথ্য প্রদান সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে আমি জানতাম না।”
মিয়ানমারে তার গ্রামে আক্রমণ হওয়ার সাথে সাথে নাহার তার বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে। একটি শরণার্থী আশ্রয়শিবিরের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা থাকে, কিন্তু সেসব সমস্যা নাহারকে স্বাস্থ্যকর্মী হয়ে তার সম্প্রদায়ের লোকজনকে সেবা প্রদানে বাধা দিতে পারেনি। কোভিড-১৯ চলাকালীন জীবন রক্ষার জন্য তার সেবা অপরিহার্য। নিজের ছোট শিশুর যত্ন নেওয়ার সময় উন্নত স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যকর অনুশীলন প্রচারের মাধ্যমে সে তার সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সে জানায়, “অবসর সময়ে আমি আমার ছোট্ট বাসস্থানের জন্য কৃত্রিম ফুল এবং সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরি করি।” এসব বিনোদনমূলক কার্যকলাপ আশ্রয়শিবিরের কঠিন জীবন থেকে তাকে কিছুটা হলেও অবসর দেয়।
ছয় মাস বয়সী এক মেয়েশিশুর তরুণী রোহিঙ্গা মা সানজিদা জানায়, “আমি যখন সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পৌঁছলাম, তখন আমি শুধু এক ফোঁটা পানযোগ্য পানি চেয়েছিলাম।”সে আরও জানায়, “আমাদের পুরো যাত্রাটি ছিল বাংলাদেশে পৌঁছানোর জন্য। আমরা অনেক কষ্ট করেছি। জীবন বাঁচানোর জন্য আমরা দৌড়েছি। তবে, আমাদের পানীয় জলের কোন রকম ব্যবস্থা ছিল না। আমরা তৃষ্ণার্ত ছিলাম এবং অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম।”
বাংলাদেশের কক্সবাজারের এক জনবহুল রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয়শিবিরে এখন বাস করছে সানজিদা। সানজিদা জানায়, “আমি সব সময় আমার মেয়েকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি। আশ্রয়শিবিরে বাস করা বেশ কঠিন। কিন্তু আমার সন্তান যেন নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর থাকে সেটি আমি নিশ্চিত করতে চাই। আমার সন্তানের স্বাস্থ্য ভালো রাখার ক্ষেত্রে আমাদের বাড়ির নিকটে নিরাপদ পানির নলকূপ স্থাপন করাই সবচেয়ে বড় বিষয়। এটি জীবন রক্ষাকারীও বটে!”
যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ঠিক সেই সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে সুরক্ষা এবং আশ্রয় দেওয়ায় ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি পুনরায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। কোভিড-১৯ চলাকালীন বিভিন্ন ধরনের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য শরণার্থী শিশুদের আশা ও স্বপ্ন সমুন্নত রাখতে ইউনিসেফ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কক্সবাজারের শরণার্থী জনগোষ্ঠি এবং স্বাগতিক বাংলাদেশী উভয় সম্প্রদায়ের জন্য সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
মানবিক কার্যক্রমে অবদান রাখার জন্য কানাডা, এডুকেশন ক্যাননট ওয়েট, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, গ্যাভি, জার্মানী, গ্লোবাল পার্টনারশীপ অন এডুকেশান, জাপান, বিএমজেড/কেএফডব্লিউ উন্নয়ন ব্যাংক, দ্যা রিপাবলিক অব কোরীয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য, কিং আবদুল্লাহ ফাউন্ডেশন, সিইআরএফ, বিশ্বব্যাংকসহ ইউনিসেফের বিভিন্ন জাতীয় কমিটি এবং বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিগত দাতাদের ইউনিসেফ বাংলাদেশ ধন্যবাদ জানাচ্ছে।