প্রতিবন্ধকতা জয়: ইউনিসেফ স্বেচ্ছাসেবকদের নেতৃত্বে দেশজুড়ে স্যানিটেশন জরিপ
নবীন স্বেচ্ছাসেবকদের নতুন দক্ষতা অর্জন এবং কমিউনিটিতে সেবার বিস্তার
- বাংলা
- English
সাধারণ কোনো ২৩ বছর বয়সী তরুণীর মতো নয় হুমায়রা রেজওয়ানা। ঢাকা শহরে পয়ঃনিষ্কাশন (স্যানিটেশন) ব্যবস্থার ওপর একটি জরিপের বিষয়ে বললে সুযোগটা লুফে নিলেন তিনি। “আমি খুবই কৌতূহলী মানুষ। আমি দেশের পরিস্থিতি জানতে চাই। যদি ঘরে বসে থাকি তাহলে আমি কিছুই জানতে পারব না,” আগ্রহ নিয়ে বলেন হুমায়রা।
অনিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে প্রতিদিন ডায়রিয়ায় ৭০০’র বেশি শিশু মারা যাচ্ছে। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ এমন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহার করেন যেখানে মানব বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নেই, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা একটি মানবাধিকার। তবে বাংলাদেশে অনেক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনও নাগালের বাইরে। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে তত্থ্য-উপাত্তের ঘাটতি আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা এবং জাতীয় অগ্রগতি যাচাই করার পথে বাধাস্বরূপ।
এ বিষয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশের ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) অফিসার সৈয়দ আদনান ইবনে হাকিম বলেন, “সাম্প্রতিক স্যানিটেশন জরিপটি হয়েছে শুধু মানুষের টয়লেট ব্যবহার ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সুযোগের ওপর। এই জরিপে মানুষের বাড়িতে পাঁচটি ক্ষেত্রে নিরাপদ মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি কীভাবে কাজ করছে তা অনুসন্ধান করা হয়েছে: ট্যাংকে ধারণ, ট্যাংক খালি করা, পরিবহন, পরিশোধন এবং মানব বর্জ্যের পুনঃব্যবহার। পয়ঃনিষ্কাশন সেবা ব্যবস্থার এই ধারাবাহিকতায় কোনো একটি অংশে দুর্বলতা থাকলে খুব দ্রুতই মানবস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে যায়।”
সামাজিক ভ্রান্তি ভাঙা
“বাংলাদেশে স্যানিটেশন নিয়ে মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলে না। আমি যখন লোকজনকে বললাম, তাদের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দেখতে চাই এবং তাদের প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ে কথা বলতে চাই তখন বেশ কিছু হাস্যরসাত্মক প্রতিক্রিয়া পেলাম,” হাসতে হাসতে জানান হুমায়রা।
এই জরিপ শুরু করার আগে হুমায়রা ও ইউনিসেফের আরও ৬১ জন স্বেচ্ছাসেবী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) এবং ইউনিসেফের ওয়াশ টিমের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জরিপের উপকরণ, তথ্য সংগ্রহ ও যোগাযোগের ওপর তিন দিনের একটি প্রশিক্ষণ নেন।
হুমায়রা বলেন, “আমার মনে হয়েছে, লোকজনের প্রশ্নের জবাব কীভাবে দিতে হবে সে বিষয়ে তারা আমাদের প্রশিক্ষণ না দিলে আমি খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কিন্তু তারা আমাদের ভালোভাবে শিখিয়েছে এবং যখন লোকজনকে এই জরিপে অংশ নেওয়ার বিষয়ে লোকজনকে রাজি করাতে হয়েছে তখন আমি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।”
বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম মিলিয়ে ৩,৪২৫টি বাসা-বাড়িতে জরিপ চালিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। বাড়ির সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পাশাপাশি সশরীরে টয়লেট পরিদর্শন, পিট ল্যাট্রিনের পরিমাপ নিয়েছেন এবং সে সব তথ্য একটি মোবাইল অ্যাপে রেখেছেন তারা।
নিরাপদ স্যানিটেশনের জন্য তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা
একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে জরিপ পরিচালনা চ্যালেঞ্জের হলেও হুমায়রা এবং তার সহকর্মীরা বুঝতে পেরেছেন, এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা ভবিষ্যতে তাদের কমিউনিটির কাজে লাগবে।
হুমায়রা বলেন, “আমি দেখেছি, আমি যেসব বাসাবাড়িতে জরিপ চালিয়েছি সেগুলোর কোনো একটিতেও সেপটিক ট্যাংক নেই। সাধারণত লোকজন টয়লেটের পাইপ নিকটবর্তী নদীতে ফেলেছে। একারণে নদী ভয়াবহভাবে দূষিত, পুরো পানি কালো।”
বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বস্তি গড়ে ওঠায় টয়লেট ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তবে নিরাপদ ব্যবস্থা করা সম্ভব।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) তুষার মোহন সাধু খান বলেন, “বাড়িতে ভালোভাবে তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা স্যানিটেশন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নিরাপদ বর্জ্য পরিশোধন, অপসারণ ও পুনঃব্যবহার করা যায় তা বিদ্যমান স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার টেকসই বিকল্প হতে পারে। সেবাসমূহের মানোন্নয়ন এবং কমিউনিটির স্বাস্থ্যগত সুফল নিশ্চিত করতে নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পারাটা খুবই জরুরি।”
এই জরিপের ফল বাংলাদেশকে ৬.২ নম্বর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রগতি বুঝতে সহযোগিতা করবে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য পর্যাপ্ত ও সমতাভিত্তিক স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধিসম্মত জীবনরীতিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং খোলা জায়গায় মলত্যাগের অবসান ঘটানোর কথা বলা হয়েছে।
“এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। খোলা জায়গায় বা প্রকাশ্যে মলত্যাগ প্রায় বন্ধ হয়েছে এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ বিষয়ে সামাজিক রীতি-নীতিরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে,” বলেন সাধু খান।
কমিউনিটিতে উজ্জ্বল স্বেচ্ছাসেবকরা
হুমায়রা ইউনিসেফের নিবন্ধিত ৩৩,০০০ স্বেচ্ছাসেবকের একজন যারা বিভিন্ন প্রচারাভিযানে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশু এসব কার্যক্রমের সুফল পেয়ে আসছে।
স্বেচ্ছাসেবকদের দক্ষতার ঝুলিতে এখন জরিপ করার সামর্থ্য যুক্ত হয়েছে, যা দিয়ে তারা তাদের কমিউনিটির ইতবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
“আমার কাছে এটা ছিল একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। এর মধ্য দিয়ে আমি হাতে-কলমে জ্ঞান অর্জন করেছি এবং এটা আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। আমি আবিষ্কার করেছি, আমি অপরিচিতদের সঙ্গে কত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারি। আমি নিশ্চিত, এটা ভবিষ্যতে আমার অনেক কাজে লাগবে,” বলেন হুমায়রা।
বাংলাদেশসহ ১২টি দেশে নিরাপদ স্যানিটেশন নিয়ে সরেজমিন জরিপ পরিচালনায় সহযোগিতার জন্য বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে ইউনিসেফ।