তাপপ্রবাহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তরুণী মা শিল্পীর মুখে আজ স্বস্তির হাসি
ইউনিসেফের সহায়তা নিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবকেরা তীব্র তাপমাত্রার মধ্যেও অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতে ভূমিকা রাখেন এই স্বেচ্ছাসেবকেরা।
- বাংলা
- English
রান্নাঘরে ভাত রাঁধছেন সন্তানসম্ভবা শিল্পী। পাশে তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে নুসরাত; জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে তার বন্ধুরা কেউ খেলতে বেরিয়েছে নাকি; হঠাত দৌড়ে পালালো ছোট্ট নুসরাত।
স্বামী, শশুড়ি আর ছোট্ট নুসরাতকে নিয়ে ঢাকার কড়াইলে শিল্পীর সুখের সংসার। দৈনন্দিনের কাজকর্ম তারা স্বামী-স্ত্রী ভাগ করে নিয়েছেন; “আমি প্রতিদিন পরিবারের জন্য খাবার রান্না করি আর আমার স্বামী কাজ থেকে ফিরে সংসারের অন্যান্য বিষয়গুলো দেখভাল করেন,” চুলা থেকে ভাত নামাতে নামাতে বলেন ২৩ বছর বয়সী শিল্পী।
সন্তান প্রসবের দিন ঘনিয়ে এসেছে শিল্পীর, আর মাত্র দুই সপ্তাহ। এবারের শিল্পীর গর্ভকালীন সময়টা বেশ ভালো কেটেছে; প্রথম থেকেই তিনি ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত আলো ক্লিনিকের পরামর্শ অনুযায়ী চলেছেন। ক্লিনিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক আঁখি আখতারের সাথে পরিচয় হয় শিল্পীর। এরপর, আঁখির পরিচালিত বিভিন্ন ‘কমিউনিটি এঙ্গেজমেন্ট সেশনে’ যোগদান করেন তিনি। এসব সেশনে কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকেরা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। এবারের বিষয় হচ্ছে তাপ-প্রবাহ চলাকালীন সময় সুস্থ্ থাকার উপায়।
অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের ওপর তাপপ্রবাহের প্রভাব
বাংলাদেশে গত এপ্রিল ও মে মাসে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। এ সময় দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী, আরও তীব্র এবং ঘন ঘন হচ্ছে। এমনকি সেপ্টেম্বরেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
গর্ভধারণকালে নারীদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। সে কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর বিশেষভাবে তাপপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতিরিক্ত তাপ্প্রবাহ ও গরমে অস্বস্তি বোধ করার পাশাপাশি পানিশূন্যতাও দেখা দিতে পারে যার ফলে অপরিণত সন্তান জন্মদান ও জন্মের সময় শিশুর ওজন কম হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘প্রোটেকটিং চিলড্রেন ফ্রম হিট স্ট্রেস’ (তীব্র তাপমাত্রার প্রভাব থেকে শিশুদের সুরক্ষা) শীর্ষক একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীতকালের তুলনায় উচ্চ তাপমাত্রার সময় সন্তান প্রসব হলে সেই সন্তানদের জন্মের পরপর অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ১৪ শতাংশ১ বেশি থাকে।
গুরুতর এই সময়ে ইউনিসেফের সহায়তায় আঁখি ও অন্যান্য কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকেরা তাপপ্রবাহ ও তাপজনিত বিভিন্ন অসুস্থতা সম্পর্কে জীবনরক্ষাকারী বার্তাসমূহ অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের কাছে বাড়ি বাড়ি গিয়েও পৌঁছে দিয়েছেন। তীব্র তাপপ্রবাহের সময় কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়, সে বিষয়ে ইউনিসেফের সহায়তায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) দ্বারা উন্নীত মূল্যবান পরামর্শ সংবলিত প্রচারপত্র (লিফলেট) তাদেরকে বিলি করেন স্বেচ্ছাসেবকেরা।
শিল্পী বলেন, “আখি আপার পরামর্শ অনুযায়ী, আমি পানি খাওয়া বাড়িয়ে দিই এবং শরীরে যাতে পানিশূন্যতা দেখা না দেয় সেদিকে সচেতন থাকি। কিন্তু পাইপলাইন দিয়ে যে পানি আসে তা পরিষ্কার না হওয়ায় পান করার আগে পানি ফুটিয়ে নিতে হয়। প্রায়ই গ্যাস না থাকায় এবং অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে রান্নাঘর ব্যবহার করতে হয় বলে মাঝে মাঝেই আমার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় অথবা ফুটানো ছাড়াই পানি পান করতে হয়।”
স্বাস্থ্য সংকট
শিল্পীর গর্ভধারণের সাত মাসের মাথায় এক সকালে তিনি হঠাৎ দুর্বলতা ও ক্লান্তি অনুভব করতে লাগলেন। দুপুরে রান্নার সময় তিনি চোখে ঝাপসা দেখতে থাকেন; তাড়াতাড়ি শিল্পী বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েন। তার অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে; হেঁটে ক্লিনিকে যাওয়া তো দূরের কথা, তিনি উঠে বসতেও পারছিলেন না। তখন কী করতে হবে সে বিষয়ে তার শাশুড়ি ও মেয়ে বুঝে উঠতে পারছিল না।
এ সময় নিয়মিত পরিদর্শনে ওই বাসায় যান আঁখি। শিল্পীর অবস্থা দেখে তিনি দ্রুত শিল্পীর শাশুড়ির সহযোগিতা নিয়ে তাকে আলো ক্লিনিকে নিয়ে আসেন। ক্লিনিকে পৌঁছানোর পর ঘামতে থাকা শিল্পীর শরীর ঠাণ্ডা করতে আঁখি জোরে ফ্যান ছেড়ে দেন এবং তার রক্তচাপ পরীক্ষা করেন। তখন শিল্পীর রক্তচাপ ছিল অনেক বেশি। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ঠাণ্ডা পানি পান করতে দেওয়া হয় এবং বিশ্রামে রাখা হয়। এর মধ্যে আঁখি বারবার শিল্পীর রক্তচাপ পরীক্ষা করেন এবং ঘণ্টা দেড়েকের মাথায় দেখতে পান, তার রক্তচাপ স্বাভাবিকের কাছাকাছি নেমেছে।
“তার উচ্চ রক্তচাপের প্রধান কারণ ছিল গরম। উচ্চ তাপমাত্রায় অন্তঃসত্ত্বা নারীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন,” বলেন আঁখি। দীর্ঘ সময় অধিক তাপমাত্রার মধ্যে থাকার কারণে শিল্পী ক্লান্তি অনুভব করেন এবং চোখে ঝাপসা দেখতে থাকেন। শিল্পীদের টিনের ছাদের ঘরে সরাসরি সূর্যের তাপ পড়ে তা ঘরে আটকে থাকে।
এই ঘটনার পর ক্লিনিকের চিকিৎসক ও আঁখি বারবার তাপমাত্রাজনিত অসুস্থতা বিষয়ক গাইডলাইনের পরামর্শগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শরীরে পানির ঘাটতি হতে না দেওয়া, অস্থিরতা তৈরি করে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা, হালকা-পাতলা পোশাক পরা, চোখে ঝাপসা দেখা ও বমি ভাব হওয়ার মতো ‘হিট স্ট্রেসের’ উপসর্গগুলো বুঝতে পারা এবং এর কোনো একটি উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিতে যাওয়া।
আঁখি বলেন, “প্রতিবছর তাপমাত্রা আরও তীব্র হচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এই চরম তাপমাত্রার সময় নিরাপদে থাকার জন্য সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলোতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।”
কমিউনিটিতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার প্রস্তুতি
শিল্পী খুব সতর্কতার সঙ্গে এসব পরামর্শ অনুসরণ করতে থাকেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাটা নিশ্চিত করার জন্য তিনি বেশি পরিমাণে লেবুর শরবত তৈরি করতেন এবং সারা দিন তা পান করতেন। “আমি প্রতিদিন এক জগ করে লেবুর শরবত তৈরি করতাম যাতে পানি ফুটানোর জন্য চুলা খালি না পাওয়া গেলে ও গ্যাস না থাকলে যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি পান করা ছাড়া থাকতে না হয়। এছাড়া আমি খাবারে সবজির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিই। বাইরে খুব গরম না থাকলে কিছুক্ষণ হাঁটি। শরীর ঠাণ্ডা রাখতে আমি হালকা-পাতলা কাপড় পরি। এসব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকে আমি আগের চেয়ে অনেক ভালো বোধ করতে শুরু করি,” বলেন তিনি।
আলো ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী ও কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকেরা অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে মানিয়ে নেবার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেন, সেগুলো তাপমাত্রাজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধে প্রণীত জাতীয় নির্দেশিকার (ন্যাশনাল গাইডলাইন) আলোকে তৈরী। ইউনিসেফের সহায়তায় ২০২৪ সালের মে মাসে এই নির্দেশিকা প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। উচ্চ তাপমাত্রাজতি অসুস্থতা প্রতিরোধ এবং তাপপ্রবাহের সময় নিরাপদ থাকার কৌশল তুলে ধরে কমিউনিটির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই নির্দেশিকায় - সেবাদাতা, কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক এবং নীতি-নির্ধারক - কার কী করণীয় সে বিষয়ে স্পষ্ট বলা আছে।
জাতীয় নির্দেশিকার আলোকে এবং রিস্ক কমিউনিকেশন অ্যান্ড কমিউনিটি এনগেজমেন্ট (আরসিসিই) উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইউনিসেফ তাপমাত্রাজনিত অসুস্থতা কীভাবে সামাল দিতে হয়, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য সেবাদাতাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। আরসিসিই উদ্যোগের আওতায় প্রচারপত্র বিলি এবং জাতীয় টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহারের মতো নানা উপায়ে জনগণের মাঝে জীবনরক্ষকারী বার্তাগুলো পৌঁছে দেওয়া হয়।
“আঁখি আপা যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো আমি আমার ননদ ও প্রতিবেশীদের বলেছি এবং তাদেরকে সেগুলো মেনে চলতে বলেছি। আমার শাশুড়ি ও মেয়েও যাতে এসব বিষয় মেনে চলে তা আমি নিশ্চিত করেছি,” বলেন শিল্পী। এ সময় তার মেয়েটি পাশে এসে বসে; তখন মেয়েটির গায়ে ছিলো গরমের উপযোগী সুতির একটি হালকা পোশাক।
সহনশীলতার সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া
তারপর থেকে শিল্পীর স্বাস্থ্যগত আর কোনো সমস্যা হয়নি। তবে তিনি সন্তান প্রসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। আলো ক্লিনিকে সন্তান প্রসবকালীন সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। শিল্পীর প্রথম সন্তান হয়েছিল বাড়িতে। তখন সন্তান জন্মের পর জটিলতা দেখা দিয়েছিল।
“আঁখি আপা ও আমার ডাক্তার দুজনই বাড়িতে সন্তান প্রসবের বিপক্ষে বলেছেন। এবার আমি একটি সরকারি হাসপাতালে যাব। কিন্তু আমার বাসা থেকে হাসপাতালের দূরত্ব এবং এখন যে গরম পড়েছে তা নিয়ে আমি ভয়ে আছি। তাছাড়া গর্ভধারণকাল যে গরমের মধ্যে কাটাতে হয়েছে তাতে সন্তানের কোনো ক্ষতি হবে কি না তা নিয়ে আমার ভয় হচ্ছে,” বলেন শিল্পী; এ সময় তার চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ দেখা যায়।
সন্তান প্রসবের দিনক্ষণ এগিয়ে আসতে থাকায় শিল্পী তার শরীরের দিকে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। সন্তান প্রসব যেন নিরাপদ হয়, সেজন্য পূর্ব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে থাকেন। চ্যালেঞ্জ আছে অনেক, তারপরও তার যত্নশীল পরিবার, আঁখি আপা ও আলো ক্লিনিক তাঁর জীবনের বড় একটা ভরসার জায়গা। এরা সবাই তার এই গর্ভধারণকালের শেষ সময়টা ভালোভাবে যেন কেটে যায় সেজন্য চেষ্টা করছেন।

