বাংলাদেশে একজন টিকাদান কর্মীর জীবনের এক দিন

তাহিরপুরের দুর্গম প্রান্তে শিশুদের জীবনরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন টিকাদান কর্মী আব্দুল বাতেন।

স্তুতি শর্মা
Vaccinator Abdul Baten with a vaccine carrier on his shoulder in Bhawanipur village, Tahirpur.
UNICEF/UNI561908/Sujan
04 জুন 2025

ভোর বেলা যখন তাহিরপুর উপজেলার পাহাড়গুলোর উপর দিয়ে সূর্য উঁকি দেয়, এমন সময় ভবানীপুর গ্রামে আব্দুল বাতেনের দিন শুরু হয়। এরপর সেই নিয়মিত, শান্ত ও চেনা নিয়মে কাটে তার প্রতিটি দিন। ঢাকা থেকে ৩০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বের প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন ৪৫ বছর বয়সী এই টিকাদান কর্মী।

সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত উপজেলাগুলোর একটি তাহিরপুর; প্রতি বছর এখানে প্রবল বৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে সীমান্তবর্তী মেঘালয় রাজ্য থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সেখানে বার বার বন্যাও হয়। বন্যায় ঘর-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি জমি, স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে তলিয়ে যেতে দেখা যায়। পরিবারগুলো ঘরের জিনিসপত্র, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। বন্যায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাহিরপুরে দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় শিশুদের টিকাদানের হারসহ প্রধান স্বাস্থ্য সূচকগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমুখী। তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাতেন ও তার মতো অনেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়ে সব প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে তাদের জীবনরক্ষাকারী কাজ চালিয়ে যান।

“সকালে ঘুম থেকে উঠার পর আমি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। এ সময় দেখে নিই যে আমার নিবন্ধন খাতা, ট্যালি শিট ও সিরিঞ্জসহ শিশুদের টিকা দেওয়ার সব সরঞ্জাম ঠিকমতো আছে কি না। বাহক যখন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বিতরণ পয়েন্টে পৌঁছান, তখন আমি তার কাছ থেকে টিকার বাক্সটি নিই এবং যেদিন যে এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেদিকে রওনা দিই।”

A dedicated team of vaccinators ready to dispatch and deliver life-saving vaccines to children.
UNICEF/UNI561914/Sujan নিবেদিত টিকাদান কর্মীদের একটি দল শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকাদানের জন্য প্রস্তুত।

বাতেনের প্রতিদিনের রুটিন প্রায় একই রকম, কিন্তু তা একেবারেই সহজ নয়। প্রতিদিনই নতুন নতুন বাধা তাকে মোকাবিলা করতে হয়। কখনও তাকে নদী পার হতে নৌকা নিতে হয়, কখনও সেতু পার হতে হয়। আর যে সব দিনে দুটোর কোনোটিই পাওয়া যায় না, তখন বাতেন পানি মাড়িয়ে হেঁটেই নদী পার হয়ে যান।

Vaccinator Abdul Baten wades through water as he crosses a river on his way to Moddho Nagar village in Tahirpur, Sunamganj.
UNICEF/UNI561928/Sujan সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের মধ্য নগর গ্রামে যেতে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন টিকাদান কর্মী আব্দুল বাতেন।

বের হওয়ার আগেই তিনি গ্রামে যেসব বাড়িতে নবজাতক, শিশু বা গর্ভবতী নারী আছেন, সে সব বাড়ি চিহ্নিত করে রাখেন এবং নিশ্চিত করেন যে, তাদের সবাইকে যেন টিকাদান কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে বলা হয়।

আজ বাতেন যাচ্ছেন উক্তিয়ারগাঁওয়ের মধ্য নগরে অবস্থিত একটি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কেন্দ্রে শিশুদের পোলিওসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগের টিকা দেওয়ার জন্য। তার কাঁধে ঝুলে আছে পরিচিত এক সঙ্গী- নীল রঙের টিকা বহনকারী বাক্সটি। অধিকাংশ মানুষের কাছে এটা কেবল একটি বাক্স। কিন্তু এটা আসলে একটি ভ্রাম্যমাণ সৌরশক্তিচালিত ফ্রিজ, যা টিকাগুলোকে সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে রাখে। যেহেতু টিকাদান কর্মীগণ ঘুরপথ, মেঠোপথ, নদী পারাপার এবং বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে চলাচল করেন, সে কারণে টিকাগুলোকে সঠিক তাপমাত্রায় রাখার জন্য এটা আবশ্যক।

A mother waits in line to get her child vaccinated at the EPI centre in Moddho Nagar.
UNICEF Bangladesh/2024/Sujan মধ্য নগরে ইপিআই কেন্দ্রে সন্তানকে টিকা দেওয়ার জন্য লাইনে অপেক্ষা করছেন একজন মা।

বাতেন ইপিআই কেন্দ্রে পৌঁছাতে পৌঁছাতে একদল মা-বাবা তাদের সন্তানদের কোলে নিয়ে সেখানে চলে আসেন। তারা টিকার কার্ড হাতে করে লাইনে দাঁড়িয়ে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন। অনেকে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছেন।

টিকা দেওয়ার আগে বাতেন একটি কাজ করতে কখনোই ভুলেন না। তিনি কখনো শিশুদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলেন, কখনো বা শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণে হাততালি দেন। তার এই সাধারণ কাজ মুহূর্তেই শিশুদের ভয়কে বদলে দেয় হাসিতে এবং শিশুরা তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে। শিশুরা যখন খিলখিলিয়ে হাসে, তখন বাতেন ধীরে ধীরে যত্নের সঙ্গে তার বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সিক্ত দৃঢ় হাত দিয়ে শিশুকে টিকা দিয়ে দেন।

বাতেন একের পর এক প্রতিটি শিশুকে টিকা দেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রত্যন্ত প্রান্তগুলোর একটিতে জন্ম নেওয়া এই শিশুরা এমন জায়গায় বাস করে, যেখানে চিকিৎসক, ক্লিনিক ও টিকার জন্য কয়েক ঘণ্টার এমনকি কয়েক দিনের পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু বাতেনের কল্যাণে আজ তারা সুরক্ষিত। সময়মতো প্রতিটি শিশুকে টিকা দিয়ে তিনি একটি স্বাস্থ্যকর ও সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করছেন।

A child receives polio vaccine at the EPI centre at Moddho Nagar, Tahirpur.
UNICEF/UNI561963/Sujan তাহিরপুরের মধ্য নগরে ইপিআই কেন্দ্রে পোলিও’র টিকা খাচ্ছে একটি শিশু।

“টিকা দিতে দেরি হলে শিশুরা প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই যখনই আমি কোন শিশুকে টিকা দেই, আমার খুব ভালো লাগে এই ভেবে যে আমার এই হাত দিয়ে আমি তাকে সুরক্ষিত করতে সহায়তা করেছি,” মুখে গর্বের হাসি নিয়ে বলেন বাতেন।

মধ্য নগরের মতো দুর্গম গ্রাম, যেখানে স্বাস্থ্য সেবা অনেকের নাগালের বাইরে, সেখানে বাতেন শুধু একজন টিকাদান কর্মী নন, বহু পরিবারের জন্য তিনি জীবন রক্ষাকারী এক দূত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই কমিউনিটির আস্থাভাজন একজন ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন, যার উপর সবাই সুস্থতা ও কল্যাণের আশায় ভরসা করেন।

বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও প্রায় পাঁচ লাখের মতো শিশু পূর্ণ ডোজ টিকা পায়নি। তাহিরপুরের মতো জায়গা, যেখানে রাস্তা খুবই কম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত, সেখানে জীবনরক্ষাকারী টিকা নিয়ে পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছানো মোটেই সহজ কাজ নয়।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বাতেনের মতো মাঠ পর্যায়ে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে ইউনিসেফ শিশু ও পরিবারগুলোর কাছে নিয়মিত টিকাদান সেবা পৌঁছে দিতে সহায়তা করছে, যাতে প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্যবান হয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত হয়। ইউনিসেফ ও গ্যাভির (দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স) কারিগরি দিকনির্দেশনা ও অর্থনৈতিক সহায়তায় এবং সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জনের দপ্তরের বাস্তবায়ন পর্যায়ে সহযোগিতায় টিকাদান সেবার মান ধীরে ধীরে আরও ভালো হয়েছে। সেই সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে মিলে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগগুলো পরিবারগুলোকে পোলিও, হাম, রুবেলা ও রোটাভাইরাসের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশুদের বাঁচাতে নিয়মিত টিকাদানের গুরুত্ব বোঝানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

Vaccinator Abdul Baten, Bangladesh
UNICEF Bangladesh/2024/Sujan

এই প্রচেষ্টার মূল চালিকাশক্তি হলেন বাতেনের মতো পেছনে থাকা বীরেরা- টিকা ভাই, টিকা আপা নামে কমিউনিটিতে পরিচিত এই টিকাদান কর্মীগণ যারা দূর-দূরান্ত ছুটে চলেন, কোন কিছুই তাদের দমাতে পারে না, কখনও নদী পার হয়ে, কখনও ভাঙাচোরা সেতু পার হয়ে, কখনও আবার কাঁদামাখা পথ ধরে হেঁটে যান তারা; ঘরের দরজায় টোকা দেন, কাঁধে সেই চিরচেনা টিকার নীলবাক্স; শিশুর জন্য জীবন রক্ষাকারী এক ডোজ।

A father plays with his child at the EPI centre in Moddho Nagar, Tahirpur.
UNICEF/UNI561990/Sujan তাহিরপুরের মধ্য নগরে ইপিআই কেন্দ্রে নিজের সন্তানের সঙ্গে খেলছেন একজন বাবা।

তাদের এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতি অনেক জীবনকে অকালে ঝরে যাওয়া থেকে রক্ষা করছে। সকল বাধা অতিক্রম করে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে অত্যাবশ্যক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার গুরুত্বপূর্ন কাজটি অব্যাহত রেখেছে।

একেকটি শিশুকে টিকা দেওয়ার সময় বাতেন জানেন যে তার এই কঠোর পরিশ্রম প্রতিটি জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে চলেছে। কোনো শিশু যেন পেছনে পড়ে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাতেন।

আপনি কি বাতেন ও তার জীবনরক্ষাকারী কাজ সম্পর্কে আরও জানতে চান। ভিডিওটি দেখুন।

Embedded video follows
UNICEF