ডেঙ্গু: শিশুদের যেভাবে নিরাপদ রাখতে হবে

ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষায় পরিবারের জন্য পরামর্শ

ইউনিসেফ বাংলাদেশ
2-year-old Lyaman was brought to the Shaheed Ahsan Ullah Master General Hospital because he had high fever. He tested dengue-positive upon admission to the children's ward.
UNICEF/UNI494148/Haque
01 সেপ্টেম্বর 2025

বাংলাদেশে এখন বর্ষাকাল, জমে থাকা ও দূষিত পানি থেকে রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য এটি উপযুক্ত সময়। এসব রোগের মধ্যে ডেঙ্গু রয়েছে, যেটি মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে।
জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত দেশে ২০ হাজার ৯০০ এরও বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং এতে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ শিশু রয়েছে, যাদের বয়স ১৫ বছরের কম।

এটি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো সংবাদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী মাসে আরও নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হতে পারে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যায় আর আপনার সন্তানদের সুরক্ষিত রাখতে আপনি কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সকলেই যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তা নয়। আর দ্রুত চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলো এড়ানো যায়। তাই কোন কোন উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে এবং কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে সেটা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু নিয়ে অভিভাবকেরা যেসব বিষয়ে জানতে চান, সেগুলো জানাতে এবং আপনাকে ও আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার সর্বোত্তম উপায় জানানোর জন্য আমরা আমাদের স্বাস্থ্য, পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (স্বাস্থ্যবিধি) বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি। 

ডেঙ্গু কী?

ডেঙ্গু হলো ‘ফ্লু’ এর মতো একটি রোগ, যেটা এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষের কোনো আলাদা কোন উপসর্গ থাকে না। তবে এটি জ্বরজনিত অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে। এমনকি ডেঙ্গুতে মৃত্যুও ঘটতে পারে।
 

Mosquito
Designed by Freepik (www.freepik.com)

আপনি কীভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন?

ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত কোনো এডিস মশা কামড় দিলে আপনার ডেঙ্গু হতে পারে।

এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়, বিশেষ করে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পরের ২ ঘণ্টায়। তাই এই দুই সময়ে এডিস মশার কামড় খেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

আপনার বাড়ি, আশপাশের এলাকা, কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা প্রতিদিনের যাতায়াতের পথে কোথাও যদি পানিভর্তি কোনো পাত্র থাকে কিংবা বৃষ্টির পানি জমে থাকে, তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

কারণ এডিস মশা পানিতে বংশবিস্তার করে এবং অল্প পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। যেমন বালতি, পুরোনো গাড়ির টায়ার, জমে থাকা পানি এবং এমনকি বোতলের ঢাকনায়ও তারা ডিম পাড়তে পারে।

ডেঙ্গু সরাসরি একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষে ছড়ায় না। তবে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সংক্রমণের প্রথম সপ্তাহে তার রক্তে এই ভাইরাস থাকে। এ সময়ে কোনো মশা তাকে কামড়ালে সেই মশা ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। পরবর্তীতে সেই সংক্রমিত মশা অন্য মানুষকে কামড়ালে তার/তাদের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ডেঙ্গু হলে গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় তাদের শিশুর শরীরেও এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।

Nadia, 3, was brought to the Shaheed Ahsan Ullah Master General Hospital by her mother. She had dengue fever, and her condition improved after getting proper treatment.
UNICEF/UNI494152/Haque নাদিয়া, ৩, তার মায়ের সাথে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়ে। সে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ছিল এবং সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার পর তার অবস্থা উন্নত হয়।

আমার বা আমার সন্তানের ডেঙ্গু হয়েছে, তা আমি কীভাবে বুঝব?

আপনার ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা বোঝা কঠিন হতে পারে, কারণ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের আলাদা বা বিশেষ কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দিলে তা প্রায়ই অন্যান্য সাধারণ শৈশবকালীন অসুস্থতার মতো মনে হতে পারে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের উপসর্গ মৃদু হয় বা একেবারেই বোঝা যায় না এবং তারা সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে সুস্থও হয়ে ওঠেন। সাধারণভাবে, ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রায় চার জনের মধ্যে একজনের উপসর্গ প্রকাশ পায়। উপসর্গ দেখা দিলে তা সাধারণত সংক্রমিত মশার কামড়ের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায় এবং ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়।

ডেঙ্গুর উপসর্গের মধ্যে থাকতে পারে:

  • হঠাৎ তীব্র জ্বর, যা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস/১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে।
  • তীব্র মাথা ব্যথা
  • চোখের পেছনের অংশে ব্যথা, মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যথা
  • বমি বমি ভাব
  • বমি হওয়া
  • গ্রন্থিগুলো ফুলে যাওয়া
  • ত্বকে দানা বা ফুসকুড়ি (র‌্যাশ ওঠা)

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশু ও নবজাতকেরা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি বিরক্ত করতে পারে এবং তাদের খাবারের আগ্রহ ও ঘুমের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।

ডেঙ্গুর উপসর্গের সঙ্গে জিকা, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো অন্যান্য রোগের উপসর্গের সঙ্গে মিল থাকতে পারে। যেহেতু ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেকের উপসর্গ দেখা দেয় না বা মৃদু উপসর্গ দেখা দেয়, তাই প্রায়ই এটা অন্যান্য রোগ হিসেবে ভুলভাবে বিবেচিত হয়। ডেঙ্গু রয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায় শুধুমাত্র ল্যাবরেটরির পরীক্ষার মাধ্যমে।

আপনার বা আপনার সন্তানের যদি ডেঙ্গুর কোনো উপসর্গ থাকে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী চলুন।

Dengue symptoms
World Health Organization South-East Asia Region - WHO SEARO

মৃদু ডেঙ্গুর চিকিৎসার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?

ডেঙ্গু সংক্রমণের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ডেঙ্গুর চিকিৎসা মূলত উপসর্গগুলো সামলানোর চিকিৎসা; যেমন জ্বর ও ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ দেওয়া হয়।

মৃদু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করানো যায়, যেমন প্যারাসিটামলের মতো ওষুধ দিয়ে ব্যথা ও জ্বর কমানো। এর জন্য সাধারণত হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তারা ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে সুস্থ হয়ে ওঠে।

যদি আপনি বা আপনার শিশুর মৃদু ডেঙ্গু হয়:

  • বিশ্রাম নিন।
  • পানিশূন্যতা রোধ করতে আর শরীরকে সতেজ রাখতে (হাইড্রেটেড থাকতে) প্রচুর পানি পান করুন।
  • পুষ্টিকর খাবার খান।
  • আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর ও ব্যথা উপসমের জন্য প্যারাসিটামল খেতে পারেন।
  • জ্বর কমাতে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করুন।
  • আইবুপ্রোফেন ও অ্যাসপিরিনের মতো নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ এড়িয়ে চলুন কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • গুরুতর উপসর্গগুলো খেয়াল করুন এবং এ ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

ডেঙ্গুর উপসর্গ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গুরুতর হতে পারে। যদি আপনি বা আপনার শিশুর কোনো গুরুতর ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন।

আমার সন্তানের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন কি না তা কীভাবে বুঝব?

কিছু মানুষ ডেঙ্গুতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে উঠতে পারে। ছোট শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং কিডনি রোগ বা ডায়াবেটিসের মতো অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যাযুক্ত প্রবীণ ব্যক্তিদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ডেঙ্গু সংক্রমণ হুট করে গুরুতর হয়ে উঠতে পারে এবং প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই শিশুদের উপসর্গগুলোর দিকে খেয়াল রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসার জন্য পদক্ষেপ নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

গুরুতর ডেঙ্গুর উপসর্গ প্রায়ই জ্বর কমে যাওয়ার পর দেখা দেয় এবং এর মধ্যে থাকতে পারে:

  • তীব্র পেটে ব্যথা
  • বারবার বমি হওয়া
  • দ্রুত শ্বাস নেওয়া
  • মাড়ি বা নাক দিয় রক্ত পড়া
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি
  • অস্তিরতা
  • বমি বা মলের সঙ্গে রক্ত বের হওয়া
  • অতিরিক্ত পিপাসা
  • ফ্যাকাশে ও ঠাণ্ডা ত্বক
  • দুর্বলতা অনুভব করা
  • ঘুম ঘুম ভাব, শক্তি কমে যাওয়া বা অল্পতেই বিরক্তি 

যদি আপনার সন্তান বা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অন্য যে কারও মধ্যে এসব উপসর্গের কোনোটি দেখা দেয়, তাহলে তার দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ।

গুরুতর ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয়। 

এ ছাড়া শিশুদের মধ্যে ডিহাইড্রেশনের (পানিশূন্যতা) বিষয়ে খেয়াল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ডিহাইড্রেশন তখনই দেখা যায় যখন জ্বর, বমি, ডায়রিয়া বা পর্যাপ্ত তরল পান না করার কারণে শরীর থেকে খুব বেশি তরল বেরিয়ে যায়।

শিশুদের ডিহাইড্রেশনের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, দুর্বল হয়ে পড়া, অস্থির হয়ে ওঠা
  • মুখ, জিহ্বা ও ঠোঁট শুষ্ক থাকা
  • দ্রুত শ্বাস নেওয়া
  • চোখ ডুবে যাওয়া
  • কাঁদার সময় কম বা কোনো অশ্রু না আসা
  • হাত বা পা ঠাণ্ডা ও রঙ পরিবর্তিত হওয়া
  • প্রস্রাব কম হওয়া
  • প্রস্রাব গাঢ় হলুদ রঙের এবং প্রস্রাবে তীব্র গন্ধ হওয়া

আপনার শিশুর মধ্যে ডিহাইড্রেশনের এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

Embedded video follows
WHO South-East Asia Region: Dengue symptoms and care

ডেঙ্গু সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা কতটা?

প্রায় ৫ শতাংশ ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর এবং জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

সাধারণত কোনো ব্যক্তি একবার মশার কামড়ে সংক্রমিত হওয়ার পরে গুরুতর অসুস্থ হয় না। কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার ডেঙ্গু ভাইরাসযুক্ত মশা কামড়ালে বা তিনি একাধিকবার এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলে ডেঙ্গুতে গুরুতর অসুস্থ হন।

এর অর্থ হলো আপনার গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি হবে যদি:

  • আপনি অতীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন,
  • আপনি বার বার মশার কামড় খাচ্ছেন।

এমনও হতে পারে যে আপনাকে আগে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা কামড়েছে কিন্তু তখন হয়তো আপনার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি, তাই ঝুঁকি কমাতে সব ধরনের মশার কামড় থেকে সতর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের জন্য ডেঙ্গু কতটা গুরুতর? 

স্বাস্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের তুলনায় ছোট শিশু এবং বিশেষ করে নবজাতকেরা ডেঙ্গুতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া ও জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে। এর কারণ তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল। তাই শিশুদের মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে শিশুদের গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

>>১১ বছর বয়সী ফাহিমের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা পড়ুন

অন্তঃসত্ত্বা নারীরাও গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন এবং গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় শিশুর শরীরে তাদের থেকে ডেঙ্গু সংক্রমিত হতে পারে।

যদি একজন মা গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, তাহলে তার অপরিণত সময়ে শিশুর জন্ম হতে পারে, জন্মের সময় শিশুর ওজন কম হতে পারে এবং ফিটাল ডিস্ট্রেস (শিশুটি ভ্রূণ থাকা অবস্থায় অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন) হতে পারে।  

ডেঙ্গু থেকে পরিবারকে রক্ষায় সর্বোত্তম উপায়গুলো কী কী? 

মশার কামড় রোধ করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায়। বিশেষ করে দিনের বেলায় এবং ভোর ও সন্ধ্যার দিকে যেন কোন মশাই না কামড়াতে পারে সেভাবে সতর্ক থাকতে পারে; আপনার ও আপনার পরিবারের বাসা, কাজের জায়গা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা আপনার চারপাশে যেন মশা বংশবৃদ্ধি করতে না পারে সেভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। 

এছাড়া, আপনার এলাকায় ডেঙ্গুর সর্বশেষ খবর বা তথ্য জেনে নিন এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ অবশ্যই মেনে চলুন।

মশার কামড় প্রতিরোধ করা 

  • মশা যে সময় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে সে সময় বাইরে না যাওয়া। (সূর্যোদয়ের পর দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের ঠিক আগে মশার কামড়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।)
  • ঢিলেঢালা পোশাক পরুন যাতে আপনার হাত ও পা ঢাকা থাকে।
  • মোজা ও বড় জুতা পরুন যাতে শরীরে বেশি অংশ উন্মুক্ত না থাকে।
  • উন্মুক্ত ত্বকে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন (ডিইইটি ভিত্তিক প্রতিরোধক সবচেয়ে কার্যকর)। মশা প্রতিরোধক পণ্যের লেবেলে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
  • ভবনের চারপাশে মশা প্রতিরোধক স্প্রে করুন।
  • মশার কয়েল ব্যবহার করুন।
  • ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন –বিশেষ করে দিনের বেলায়।
  • সম্ভব হলে এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবহার করুন। যদি না থাকে তাহলে জানালা ও দরজা বন্ধ রাখুন বা মশারি ব্যবহার করুন।
  • মশাদের বাইরে রাখতে দরজা ও মশারি স্ক্রিন ব্যবহার করুন। স্ক্রিনে কোনো ফাটা থাকলে মেরামত করুন।

যদি পরিবারের কোনো সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তাহলে উপরোক্ত সতর্কতাগুলো বাড়ির ভিতর ও বাইরে দুই জায়গাতেই মেনে চলুন। এতে সংক্রমিত ব্যক্তিকে মশা কামড়ানোর পর অন্য কাউকে ওই মশার কামড় দেওয়ার সম্ভাবনা কমবে।

ছোট শিশুদের মশার কামড় থেকে রক্ষা করা 

  • মশা থেকে সুরক্ষার জন্য ছোট শিশুর ক্রিব/দোলনা/খাট, স্ট্রলার বা খেলার জায়গার ওপর ঠিকভাবে মশারি লাগান বা স্ক্রিন ব্যবহার করুন।
  • শিশুকে লম্বা হাতা, লম্বা প্যান্ট ও মোজা পরান যাতে উন্মুক্ত ত্বক কম থাকে।
  • কোনো স্বাস্থ্য সেবাদাতার পরামর্শ অনুযায়ী শিশুর জন্য উপযুক্ত মশার প্রতিরোধক ব্যবহার করুন।(৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে লেমন ইউক্যালিপটাস তেল (ওএলই) বা প্যারা-মেনথেন-ডায়ল (পিএমডি) যুক্ত পণ্য এড়িয়ে চলুন।)
  • মশা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে যেসব সময়, ভোর ও সন্ধ্যার সময় বাইরে খেলা বা কার্যক্রম কমিয়ে দিন।

আপনার চারপাশে মশার বংশবৃদ্ধির জায়গা কমানো

  • আপনার বাড়ি পরিষ্কার রাখুন।
  • বাড়ি, কর্মক্ষেত্র বা শিশুদের স্কুলের আশপাশে কোনো সম্ভাব্য পানি জমার পাত্র বা আবর্জনা থাকলে সরান বা উল্টে দিন। উদাহরণস্বরূপ, বোতল, প্লাস্টিকের বাক্স, টায়ার, নারকেলের খোসা বা কোনো বস্তু, যা পানি ধরে রাখতে পারে।
  • জল জমা না হওয়ার জন্য বদ্ধ নালা পরিষ্কার করুন।
  • ফুলের পাত্র ও বালতির মতো যেসব পাত্রে নিয়মিতভাবে পানি জমে থাকে সেগুলো খালি করুন, ঢেকে রাখুন বা উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা নিন।
  • পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখুন: বালতি, ড্রাম বা ট্যাঙ্কে সব সময় ভালোভাবে ঢাকনা দিন। মশা যাতে ডিম দিতে না পারে সেজন্য টাইট ফিটিং লিড/ঢাকনা, স্ক্রিন বা এমন তারের জাল ব্যবহার করুন যার ছিদ্র বড় মশার তুলনায় ছোট।
  • পানি সংরক্ষণের পাত্র খালি করে ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করুন, যাতে মশার ডিম অপসারণ করা যায়।
  • আপনার প্রতিবেশীদেরও উৎসাহ দিন যাতে তারা মশার বংশবৃদ্ধি কমাতে পদক্ষেপ নেয় এবং নিজেদেরকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করে।
Embedded video follows
WHO South-East Asia Region: Steps to stop dengue at home
Embedded video follows
WHO South-East Asia Region: Steps to stop dengue at home

ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত থাকতে আপনার সন্তানদের সহায়তা করুন

মশার কামড়ে কীভাবে শরীর অসুস্থ হয়ে উঠতে পারে এবং মশার কামড় থেকে নিজেদের রক্ষা করার পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে আপনার সন্তানদের সঙ্গে কথা বলুন। যেমন- বাইরে যাওয়ার সময় সুরক্ষামূলক পোশাক পরা এবং মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করার গুরুত্ব তাদের কাছে তুলে ধরুন।

শিশুরা তাদের বাবা-মা ও সেবাদাতাদের কাছ থেকে শেখে, তাই উদাহরণ তৈরি করুন! মশার কামড় এড়ানোর পদক্ষেপ নিজে নিন এবং কী করছেন ও কেন করছেন তা শিশুদের বুঝিয়ে বলুন।

ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কেন বাড়ছে? 

এ বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।

ডেঙ্গু সাধারণত উষ্ণ ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় দেখা যায়। উষ্ণতর আবহাওয়া মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাসকে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়, আর দীর্ঘ ও তীব্র বর্ষাকাল মশার বংশবৃদ্ধির আরও বেশি সুযোগ তৈরি করে।

জলবায়ু বিজ্ঞানবিষয়ক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংস্থা, দ্য ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)ও সতর্ক করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন উচ্চ ভূমিতেও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটছে।

নগরায়ন ও তার ফলে সৃষ্ট স্যানিটেশন সমস্যা এবং পণ্য ও মানুষের চলাচল বৃদ্ধি- এসবকেও ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যান্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলমান বর্ষা মৌসুমের কারণে ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে আশঙ্কা করা হয়।

>> বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে ডেঙ্গু সম্পর্কে আরও জানুন