রাত পোহালেই আলো: ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতের মধ্যে প্রতীমার টিকে থাকার লড়াই
ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তঃসত্ত্বা মা ও তাদের পরিবারে স্বস্তি আনছে ইউনিসেফের ‘মানবিক নগদ সহায়তা’
- বাংলা
- English
“আমি অন্তঃসত্ত্বা না হলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই কোন নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করতাম,” বলেন প্রতীমা। ১৮ বছর বয়সী এই নারী মা হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
প্রতীমা মুন্সীগঞ্জ জেলার জেলেখালিতে বাস করেন। প্রতিদিন সকালে তিনি খালি পায়ে বাড়ির আঙিনায় হাঁটতেন। ঠান্ডা শীতল মাটিতে পা রাখতেই এক প্রশান্তির অনুভব হতো তার। তারপর শাশুড়ির হাতের তৈরী ভাত ও ডাল দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে সংসারের টুকিটাকি কাজ করতেন প্রতীমা। যত্ন নিতেন গবাদী গরু-ছাগলের। প্রতীমার পরিবারে আরও আছে তার স্বামী দেবাশীষ ও তাঁদের দুই ছেলে-মেয়ে।
কিন্তু ঘূর্ণিঝড় রেমাল যেন সব কিছু ওলট-পালট করে দিলো।
ঘূর্ণিঝড় রেমালের ক্ষয়ক্ষতি
২০২৪ সালের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় রেমাল বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে।শক্তিশালী এই ঝড়ে ৩২ লাখ শিশুসহ ৮৪ লাখ মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়ে। ঝড়ে দেড় লাখ ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। কোন কোন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রতীমা ও তার পরিবারের সদস্যরা ইন্টারনেটে বিভিন্ন খবর থেকে এবং ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতির জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে এই ঝড় আসছে বলে জানতে পেরেছিলেন। এই ঝড় ছিল তীব্র এবং তাদের পক্ষে তখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বের হওয়াটা ছিল অসম্ভব। কয়েক দিন ধরে তাদের বাড়িতে পানি উঠেছিল এবং রাস্তাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ঝড়ে তাদের ঘর টিকে গেলেও গোয়াল ঘরটির বেশ ক্ষতি হয়েছিল। বাড়ির সামনের দিকটায় কাদা জমে বেশ খানিকটা পিচ্ছিল হয়ে পড়েছিল।
আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা প্রতীমার জন্য পুরো পরিস্থিতিটা বেশ কঠিন হয়ে উঠে। তার শরীর দুর্বল লাগা শুরু করল। প্রতিবার ঘুম থেকে জেগে ওঠে কয়েক কদম হাঁটলেই চোখে ঝাপসা দেখতেন প্রতিমা। তার হাসপাতালে যাওয়া দরকার কিন্তু ভাঙা রাস্তা দিয়ে হেঁটে হাসপাতালে যাওয়া তার জন্য বেশ কষ্টকর।
এদিকে দেখা দিলো বিশুদ্ধ পানির অভাব। বৃষ্টির পানি দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। প্রতীমা খানিকটা শুকনো খাবার মজুদ করে রেখেছে, যা দিয়ে তাদের পরের কয়েক দিন চলে যায়। কিন্তু প্রতীমার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। তার জন্য প্রয়োজন যথাযথ পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্য সেবা।
“ঘূর্ণিঝড়ের আগের দিন ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। তাতে আমাদের কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়াটা অসম্ভব হয়ে ওঠে। আর ঝড়ের পরে রাস্তা-ঘাট চলাচলের জন্য একেবারে অনুপোযোগী হয়ে পড়ে,” বলেন প্রতীমা।
পরিবারগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় রেমাল প্রভাব ছিল বেশ জোরালো। ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মৃত্যু ও নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। একইসঙ্গে সেখানে মানুষের সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অগনিত মানুষ নিরাপদ পানি পান ও শৌচাগার ব্যবহারের মতো মৌলিক পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা হারিয়ে ফেলে। বহু পরবিার তাদের ঘর-বাড়ি হারায়। বাজারে যাওয়াও অসম্ভব হয়ে ওঠে এবং প্রতীমার স্বামীর মতো হাজার হাজার মানুষ কাজ হারিয়ে ফেলে।
এই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাবার সাথে সাথেই ইউনিসেফ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে কাজে নেমে যায়। পরিস্থিতি তদারকি করতে ইউনিসেফ তার অংশীজনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ শুরু করে। ইউনিসেফ নারী ও শিশুদের ওপর ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে জরুরি সহায়তা প্রদান টিম মোতায়েন করে ও কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকিং করে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতির বার্তা পৌঁছে দিতে থাকেন। অসহায় মানুষগুলোর জীবনরক্ষা ও কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েই সব প্রচেষ্টা নেওয়া হয়।
জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিতরণ করার পাশাপাশি ইউনিসেফ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরবিারগুলোকে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য অগ্রিম পদক্ষেপ হিসেবে একটি ক্যাশ-প্লাস প্যাকেজ চালু করে। স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা রূপান্তর, এফআইডিবি ও এসডিএ-এর মাধ্যমে ইউনিসেফ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অন্তঃসত্ত্বা মা রয়েছেন এমন পরিবারগুলোকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিহ্নিত করা হয়। জরুরিভাবে তহবিলের ব্যবস্থা করে অন্তঃসত্ত্বা মা রয়েছে এমন ৬ হাজার ৪৮টি পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এতে ৫টি জেলার ১৩টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১৯ হাজারের বেশি মানুষ উপকৃত হয়।
প্রতিটি পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৬ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়। এই নগদ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল ওই সব পরিবারকে সহায়তা করা যাতে তারা অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সেবাসমূহ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। তাছাড়া পরিবারগুলো যাতে উচ্চ হারে ঋণগ্রস্ততা, বাল্যবিবাহ, স্কুল থেকে শিশুদের ঝরে পড়ার মতো অর্থনৈতিক দুরাবস্থার ক্ষতিকর প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারে সেজন্যও এই নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকেরা সহায়তাপ্রাপ্ত মায়েদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেন।
এই উদ্যোগের ফলে যেসব পরিবার উপকৃত হয়েছে, সেগুলোর একটি প্রতীমার পরিবার। অবশ্য ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে যত সংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ঘুরে দাঁড়াতে যে পরিমাণ সহায়তা দেওয়া দরকার এটা তার একটি ছোট্ট অংশ মাত্র। সকল ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে প্রয়োজনীয় সকল সহায়তা নিয়ে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন আরও তহবিলের।
“টাকাটা পাওয়ার পর আমি মেডিকেল চেকআপের জন্য গিয়েছিলাম। ঝড়ের এক সপ্তাহ পরে, তখন রাস্তা-ঘাট শুকাতে শুরু করেছিল। তারপরেও আমাকে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কাদা-মাটির পথে হেঁটে যেতে হয়েছিল,” সে সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন প্রতীমা।
“ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান, আমার রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেছে এবং আমার ওজনও কমে গেছে। আমাকে চার ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পাশাপাশি ভিটামিন খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। অনুদানের ওই টাকা দিয়ে দুই ব্যাগ রক্ত আমার শরীরে দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা দিয়ে ভিটামিন, ফলমূল এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কেনা হয়। সময়মত ইউনিসেফের সহায়তাটা পাওয়ায় আমাদের খুব উপকার হয়েছে। এটা না পেলে আমাদের ধার-কর্য করতে হতো। আমি এখন নিশ্চিন্ত, আমি নিজের ও পেটের সন্তানের বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারছি,” বলেন প্রতীমা।
জলবায়ুজনিত সংকটের মধ্যে জীবনযাপন
প্রতীমার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো তাকে আরও দুই ব্যাগ রক্ত দেওয়া দরকার। পাশাপাশি তাকে অবশ্যই ভিটামিন খাওয়া চালিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যতে জটিলতা এড়ানোর জন্য তাঁর ওজনটাও ঠিক রাখতে হবে। এই পরিস্থিতিতে প্রতীমার স্বামী দেবাশীষ কাজে ফিরলেও, কমিউনিটি এখনো ঝড়ের আঘাত কাটিয়ে উঠতে না পারায় তার আয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে।
“ভারী বৃষ্টির মধ্যেও আমরা ঘরে আটকে ছিলাম। কারণ রাস্তায় পানি ওঠায় আমার স্বামী কাজে যেতে পারছিলেন না। তাতে আমরা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছিলাম। বৃষ্টি, ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়- এসব আমাদের ওপর খুব প্রভাব ফেলে,” বলেন প্রতীমা।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য সব সময় একটি হুমকি সৃষ্টি করে রেখেছে। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ সেই হুমকিকেই তুলে ধরেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধারাবাহিকভাবে সৃষ্ট এসব দুর্যোগের কারণে প্রতীমা ও তার পরিবারের মতো অসংখ্য মানুষ তীব্র স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও প্রতীমা অবিশ্বাস্য শক্তি ও সহনশীলতা দেখিয়েছেন। তিনি শান্ত থেকেছেন এবং সাহসের সঙ্গে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেছেন।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতে লাগাম টানতে না পারায় জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। তাই লাখ লাখ মানুষের সুরক্ষা, দুর্যোগ সহনশীলতা তৈরি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতে জরুরি পদক্ষেপ অপরিহার্য।

