শিক্ষায় অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্ব এখনও মেয়েদের জন্য সহিংস ও অত্যন্ত বৈষম্যমূলক: ইউনিসেফ

ঐতিহাসিক বেইজিং নারী সম্মেলনের আড়াই দশক পর এখনও নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কেবল নিয়মিত ঘটনাই নয়, গ্রহণযোগ্যও

04 মার্চ 2020
কিশোর-কিশোরী ক্লাব
UNICEF Bangladesh/2017/Kiron

ঢাকা/নিউইয়র্ক, ৪ মার্চ ২০২০ ইউনিসেফ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও ইউএন উইমেন আজ নতুন এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি সংখ্যক মেয়ে শিশু স্কুলে যাচ্ছে এবং স্কুলে পড়াশোনা অব্যাহত রাখছে। তবে শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও তা মেয়েদের জন্য আরও সমতাভিত্তিক ও কম সহিংস পরিবেশ তৈরিতে সহায়তার ক্ষেত্রে সামান্যই ভূমিকা রেখেছে।

নারীর অবস্থা বিষয়ক কমিশনের ৬৪তম অধিবেশনের আগে প্রকাশিত মেয়েদের জন্য একটি নতুন যুগ: ২৫ বছরের অগ্রগতির খতিয়ানশীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েদের সংখ্যা কমে ৭ কোটি ৯০ লাখে নেমে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরাই বেশি আগ্রহী ছিল শুধু গত দশকেই।

তা সত্ত্বেও নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও নিয়মিত ঘটনা। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের শনাক্ত করা গেছে তাদের ৭০ শতাংশই ছিল নারী এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যৌন শোষণের কারণে তারা পাচারের শিকার হয়। বিশ্বব্যাপী ১৫-১৯ বছর বয়সী প্রতি ২০ জন মেয়ের মধ্যে একজন বা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মেয়ে তাদের জীবনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা নারী ও মেয়ে শিশুরা যত ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তার মধ্যে সবচেয়ে সহিংস রূপগুলোর একটি।

শিক্ষা, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এই নেতিবাচক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ১৪-২৪ বছর বয়সী প্রায় ৮৮.৭ শতাংশ মহিলা এখন সাক্ষর। তারপরও মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০১৯ অনুসারে, বিগত এক মাসে লালনপালনকারীদের দ্বারা যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক শাস্তি বা আগ্রাসনের মুখোমুখি হওয়া ১-১৪ বছর বয়সী শিশুর হার ছিল ৮৮.৮ শতাংশ।

এমআইসিএস ২০১৯-এ আরও উঠে এসেছে যে, ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের ৩৭ শতাংশ সন্ধ্যার পর একা চলাফেরার ক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করে না। ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকের বেশির বিয়ে হয় তাদের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই। প্রায় ২৪ শতাংশ নারী অপরিণত বয়সে সন্তানের জন্ম দিচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশে ১৫-৪৯ বছর বয়সী প্রতি চারজন নারীর একজন (২৫.৪ শতাংশ) নিম্নোক্ত পরিস্থিতিগুলোর যেকোনো একটি তৈরি হলে স্বামীর দ্বারা স্ত্রীকে প্রহার করা ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করেন: (১) স্বামীকে  কিছু না জানিয়ে ঘরের বাইরে গেলে, (২) সন্তানদের প্রতি অবহেলা করলে, (৩) স্বামীর সাথে তর্ক করলে, (৪) স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকৃতি জানালে এবং (৫) খাবার পুড়িয়ে ফেললে।

জরীপের এসব নতুন ফলাফল সত্ত্বেও সহিংসতা বন্ধে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গিকারকে ইউনিসেফ স্বাগত জানায়। চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ নম্বর, যেখানে শিশুরা সরাসরি সহিংসতার ঘটনা জানাতে ও এর থেকে প্রতিকারের জন্য সাহায্য চাইতে পারে, সরকার ও ইউনিসেফের যৌথ প্রচেষ্টার একটা সফল উদাহরন।   

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “পঁচিশ বছর আগে বিশ্বের সরকারগুলো নারী ও মেয়ে শিশুদের প্রতি যে প্রতিশ্রুতি করেছিল, তারা কেবল তার আংশিক সুবিচার করতে পেরেছে। যদিও বিশ্ব অনেক বেশি সংখ্যক মেয়ে শিশুকে স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে অনেক রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখিয়েছে, তবে নিজেদের ভাগ্য গঠনের পাশাপাশি নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য তাদের যে দক্ষতা ও সহায়তা প্রয়োজন তা প্রদানে বিশ্ব বিব্রতকরভাবে পিছিয়ে পড়েছে।

এই বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে জেনারেশন ইক্যুয়ালিটি প্রচারাভিযানের প্রেক্ষাপটে এবং নারী ও মেয়েশিশুদের অধিকার আদায়ে ঐতিহাসিক নীলনকশা হিসেবে পরিচিত বেইজিং ঘোষণা ও প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশনের ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান-ব্রিজিত অ্যালব্রেস্টেন বলেন, “ঐতিহাসিক বেইজিং ঘোষণার প্রতি সরকারগুলোর করা প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ২৫ বছর পর মেয়েদের জন্য বিশ্ব কতটা অনুকূলে এসেছে তার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে এই প্রতিবেদন।

ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক ফুমজাইল ম্লাবমো-এনজিকুকা বলেন, “বেইজিংয়ে ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো মেয়ে শিশুইস্যুতে নির্দিষ্টভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং এরপর থেকে আমরা ক্রমবর্ধমানভাবে মেয়েদেরকে তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে এবং এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তাদের আহ্বান শুনেছি। তবে পৃথিবীর দায়িত্বশীল রক্ষক হিসেবে, নারীদের জন্য সহিংসতামুক্ত জীবন এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণে বিশ্ব তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে আসতে পারেনি।

মেয়েরা আজ প্রতিটি জায়গাতেই সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে অনলাইন থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ, বাড়ি ও কমিউনিটি সবখানেই-- যা তাদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক উন্নতির জন্য নেতিবাচক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুবিয়ের মতো ক্ষতিকর সামাজিক প্রথার কারণে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মেয়ের জীবন ও সম্ভাবনা নষ্ট হওয়া অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর, ১ কোটি ২০ লাখ মেয়ের শৈশবেই বিয়ে হয়ে যায়। বৈশ্বিকভাবে, ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েরা একই বয়সের ছেলেদের মতো স্ত্রী-প্রহারকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করে।

প্রতিবেদনে মেয়েদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নেতিবাচক দিকগুলোও উল্লেখ করা হয়েছে, যার অনেকগুলো ২৫ বছর আগে চিন্তাও করা যায়নি। ঐতিহ্যবাহী খাবার থেকে প্রক্রিয়াজাত ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ধাবিত হওয়ায় অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং চিনি-যুক্ত কোমল পানীয় গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে, যার কারণে মেয়েদের স্থূলতার সমস্যাও বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বে অতিরিক্ত ওজনের মেয়ের সংখ্যা ১৫ কোটি ৫০ লাখ, যা ১৯৯৫ সালের (৭ কোটি ৫০ লাখ) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

গত ২৫ বছরে দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক উদ্বেগ বাড়তে দেখা গেছে, যার পেছনে অত্যধিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারেরও প্রভাব রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। এক্ষেত্রে এগিয়ে কেবল মাতৃত্বজনিত কারণে মৃত্যু।

প্রতিবেদনে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে:

  • শ্রেণি, জাতিগোষ্ঠী এবং আয় ও সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে সব মেয়ে যাতে সুযোগ উদ্ভাবন ও      বিস্তৃত করায় সাহসী হতে পারে এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিবর্তনের প্রবক্তা ও সমাধান পরিকল্পনা করতে পারে সে লক্ষে তাদের বক্তব্য, মতামত ও ভাবনা, বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে তুলে ধরতে হবে, যা তাদের শরীর, কমিউনিটি, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
  • চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য তাদের দক্ষতার উন্নয়ন এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, শিশুবিয়ে ও মেয়েদের যৌনাঙ্গ ছেদ বন্ধে আন্দোলনসহ বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কিশোরী মেয়েদের নিয়ে তাদের জন্য অগ্রগতিকে জোরদার করে এমন প্রতিশ্রুতিশীল মডেলগুলো জোরদার করার জন্য       নীতিমালা ও প্রকল্প বিনিয়োগ বাড়াতে হবে
  • লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা, একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা অর্জন, কিশোরীদের পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো যেসব বিষয়ে জ্ঞান সীমিত সেসব ক্ষেত্রে বয়স ও লিঙ্গ সংক্রান্ত উচ্চমানের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ব্যবহার এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। 

    ###

সম্পাদকদের জন্য নোট:

আরও তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন:

হেলেন উইলি, ইউনিসেফ নিউইয়র্ক, টেলি: +১ ৯১৭ ২৪৪ ২২১৫, [email protected]

ইউএন উইমেন সম্পর্কিত

ইউএন উইমেন হচ্ছে লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নিবেদিত জাতিসংঘের একটি সংস্থা। নারী ও মেয়েদের বৈশ্বিক প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বব্যাপী তাদের চাহিদাগুলো পূরণে অগ্রগতি জোরদার করার লক্ষ্যে ইউএন উইমেন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unwomen.org

ইউএন উইমেনকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook Instagram-

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

ইয়েনি গেমিং
চিফ অব কমিউনিকেশন, এ্যাডভোকেসি এ্যান্ড পার্টনারশীপ
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801713043478
ই-মেইল: [email protected]
ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817586096
ই-মেইল: [email protected]

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার