স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা ও উদ্যোক্তা হবার শিক্ষা

ইউনিসেফ-এর সহযোগিতায় পরিচালিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ শেষে কক্সবাজারের স্থানীয় এক মেলায় হাস্যোজ্জ্বল কিশোরীরা

তাসনীম কিবরিয়া
Adolescent girls participate in a handprint and batik skills session at a UNICEF-supported multi-purpose centre in Cox’s Bazar.
UNICEF/UNI675686/Sujan
19 ডিসেম্বর 2024

মঙ্গলবারের উষ্ণ সন্ধ্যায় কক্সবাজারে সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় যোগ দিতে দর্শনার্থীরা লাবনী বিচ পয়েন্টে এসে ভিড় জমিয়েছে। মেলার ২০০টি স্টলের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী নিপা এবং জেসমিনের রয়েছে পাশাপাশি দুটি স্টল। তারা তাদের নিজেদের এবং তাদের সমবয়সীদের নিজের হাতে তৈরি জিনিসপত্রে ভরা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রেতারা যখন নিজেদের পছন্দের জিনিস কেনার জন্য সে সব জিনিস সম্পর্কে জানতে তাদের কাছে যাচ্ছিলেন তখন তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে ক্রেতাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল এবং পণ্যগুলো সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছিল।

মেলায় নিজেদের পণ্য প্রদর্শন এবং বিক্রি করার সুযোগটি ছিল নিপা এবং জেসমিনের দীর্ঘ এক মাসের পরিশ্রমের ফল। নিকটবর্তী সমিতি পাড়া বহুমুখি কেন্দ্রে (মাল্টি-পারপাস সেন্টারে) তাদের এই প্রশিক্ষণটি শুরু হয়েছিল। কক্সবাজারের নিপা এবং জেসমিনের মতো অল্প বয়সে স্কুল ছেড়ে দিয়েছে এমন ক্ষতিগ্রস্ত শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং ইউনিসেফ-এর সহযোগিতায় পরিচালিত কেন্দ্রটি। সেখানে তারা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, হস্তশিল্প, ব্লক বাটিক, হাতের কাজ (হ্যান্ডপ্রিন্ট), হেয়ারড্রেসিং এবং সৌন্দর্য্য (বিউটি) থেরাপি সহ উদ্যোক্তা হবার মূল্যবান দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

কেন্দ্রের একজন প্রশিক্ষক শান্তা বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, “বহুমুখী কেন্দ্রের অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী দুস্থ পরিবার থেকে আসা। এদের কেউ কেউ বাবা-মাকে হারিয়েছেন, আবার অন্যরা নিজেদের একেবারে ছোট চাহিদাগুলোও পূরণ করতে পারে না।” শান্তা আরও বলেন, “নিজেদের দক্ষতা অর্জন এবং পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাহায্যকারী হতে বহুমুখি কেন্দ্র কার্যকর সুযোগ সৃষ্টি করে।”

বহুমুখি কেন্দ্রে ৬ (ছয়) মাসের দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায়, কিশোরী মেয়েরা হাতব্যাগ (হ্যান্ডব্যাগ), আলংকারিক টিস্যু বক্স, কলমদানি (পেন হোল্ডার), স্বামী-স্ত্রীর জন্য ম্যাচিং করা শাড়ি ও পাঞ্জাবি, ল্যাপটপ এবং স্মার্টফোনের থলি, ব্যাগ, কম্বল এবং গহনা সহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করতে শিখেছে। এরই মধ্যে অনেকেই নিজেদের বাড়ি থেকে তাদের পণ্য ও সেবা বিক্রি শুরু করেছে।

আর্থিক চ্যালেঞ্জের সন্মুখিন ছেলে-মেয়েদের জন্য, বহুমুখি কেন্দ্রগুলো শিক্ষাঙ্গনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এসব বহুমুখি কেন্দ্র তাদেরকে একদিকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছে; ঠিক একইভাবে তাদের ক্ষমতায়নের পথও সৃষ্টি করেছে।

দলীয় আলোচনার সময় মেয়েরা বলেছে, “আমরা দক্ষতা অর্জন করছি দেখে আমাদের পরিবার খুব গর্বিত।” মেয়েরা আরও বলেছে, “আমরা এখন নিজেরাই উপার্জনকারী হয়েছি। আমাদের বাবা-মা এখন খুবই খুশি। কারণ, আমরা আমাদের পরিবারে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারি। আমাদের বাবা-মা আমাদের প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের কাছে আমাদের নিয়ে গর্ব করে।”


স্বাধীনতার দিকে একটি ধাপ

শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং বাজারের সাথে তাদেরকে পরিচয় করে দেওয়ার আশায়, শান্তা কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত সপ্তাহব্যাপী পর্যটন মেলায় দুটি স্টল নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিল। কিশোরী মেয়েদের জন্য এটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার দ্বার খুলে দিয়েছিল।

স্টলে কক্সবাজারের পাঁচটি উপজেলার (উপজেলা) ১৬টি বহুমুখি কেন্দ্রের গৃহসজ্জার সামগ্রী থেকে শুরু করে হাতের ছাপযুক্ত জামাকাপড় সহ উৎপাদিত সকল পণ্যের প্রদর্শন করা হয়েছিল। বিউটিশিয়ান এবং হেয়ারড্রেসিং দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ থেকে জেসমিন এবং তার সহকর্মীরা মেহেদি শিল্প বিষয়ক প্রশিক্ষণও পেয়েছিল।

বহুমুখি কেন্দ্রে শেখা দক্ষতা দিয়ে কিশোর-কিশোরীরা মেলায় তাদের সৃষ্টিশীল কর্ম প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছিল। এছাড়াও, হেয়ারড্রেসিং দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণে তারা মেহেদি শিল্প বিষয়ক প্রশিক্ষণ পেয়েছিল।

Nipa and Jesmin (second from right) with their instructors from the multi-purpose centre at their stall.
UNICEF/UNI675698/Kruglinski বহুমুখি কেন্দ্রে নিজেদের স্টলে প্রশিক্ষকদের সাথে নিপা এবং জেসমিন (ডান থেকে দ্বিতীয়)।

ল্যাপটপ ব্যাগ এবং ব্রেসলেট তৈরি করে ক্রেতাদের মনোযোগ কেড়েছে ১৭ বছর বয়সী সেই সুফিয়ার মতে, “আমরা কখনই ভাবিনি যে আমরা মেলায় একটি স্টল দিতে পরেবো এবং সেখানে আমাদের হাতের তৈরি পণ্য দেখাতে পারবো।” সুফিয়া আরও বলেছে, “আমি গ্রাহক সেবা, যোগাযোগ, বিক্রয় এবং বাজেট বিষয়ক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। কম্পিউটার দক্ষতা প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও আমাদের সমর্থন করতে মেলায় এসেছিল। কারুশিল্প নিয়ে আমাদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এটি।”

সাধারণ মানের হস্তশিল্প শেখা থেকে শুরু করে একটি জমজমাট মেলায় পণ্য বিক্রি করা- যাত্রাটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে। এটি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। অনেকের জন্য, এটি শুধুমাত্র তাদের পণ্য দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটা ছিল তাদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

মেয়েদের মতে, “মেলায় আমরা নিজেরাই ক্রেতাদের সামলাতে পেরেছি। এটি আগে আমরা কখনোই করিনি।” মেয়েরা আরও বলেছে, “প্রথমে, আমরা কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের প্রশিক্ষকরা আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন। একটি স্টল চালানোর জন্য আমাদের যা যা প্রয়োজন তারা আমাদের সেগুলো শিখিয়েছেন এবং সব সময় আমাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন।”

Adolescent girls talk about their experiences selling their handmade products at the tourist fair.
UNICEF/UNI675688/Sujan পর্যটন মেলায় তাদের হাতে তৈরি পণ্য বিক্রির অভিজ্ঞতার কথা বলছে কিশোরী মেয়েরা।

মেলাটি মেয়েদের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে। এখন তারা আরও উন্নতমানের দক্ষতা শিখতে চায়। সাধারণ হস্তশিল্প শেখা থেকে শুরু করে মেলায় পণ্য বিক্রির অভিজ্ঞতা তাদেরকে সনদের মাধ্যমে পেশাদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিয়েছে।

বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে ১৮ বছর বয়সী নার্গিস বলেছে, “আমরা [জাতীয় বোর্ড] পরীক্ষায় বসতে এবং সনদ পেতে  চাই। তারপর স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেতে আমরা এই সনদকে ব্যবহার করতে পারি। ”

বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দিয়ে মেয়েরা বলেছে, “স্নাতক হওয়ার পরে আমরা আর বহুমুখি কেন্দ্রে আসব না। একটি সনদ আমাদের বিশ্বাস তৈরি করতে সাহায্য করবে যাতে করে আমরা আরও গ্রাহক এবং ক্রেতা পেতে পারি।”

মেলার অভিজ্ঞতা আমাদের মানস পটে অম্লান স্মৃতি হয়ে আছে এবং এটি ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষার জন্য একটি সোপান হয়ে উঠেছে।

Adolescent girls show the products they handcrafted at the centre.
UNICEF/UNI675693/Sujan বহুমুখি কেন্দ্রে নিজেদের হাতে তৈরি পণ্যগুলো দেখাচ্ছে কিশোরী মেয়েরা

নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করে মেয়েরা বলেছে, “আমরা ছয় মাসের প্রশিক্ষণের সময় মৌলিক বিষয়গুলো শিখেছি এবং আমরা অধিকতর উন্নত প্রশিক্ষণ পেতে চাই। তারা আরও বলেছে, “অভিজ্ঞ পেশাদার হওয়ার জন্য কয়েক মাস একজন বিশেষজ্ঞের অধীনে আমাদের কাজ করতে হবে। হতে পারে ইতিমধ্যে বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন করা । এতে করে আমরা তাদের কাছ থেকে আরও শিখতে পারি। আমাদের প্রশিক্ষণ আছে এবং এখন, আমরা পেশাদার অভিজ্ঞতা পেতে চাই।”

তাদের এসব সাফল্য নিজেদের কমিউনিটির অন্যান্য মেয়েদেরকে বিকল্প শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। নিপা, জেসমিন এবং তাদের সহকর্মীরা মেলায় নিজেদের অভিজ্ঞতার বিষয় তুলে ধরে বলেছে যে, সামনের চ্যালেঞ্জগুলো 
মোকাবেলা করতে তারা নিজেদেরকে আরও উপযুক্ত বলে মনে করে। এই সাত দিনে অর্জিত শিক্ষা এবং আত্মবিশ্বাস তাদের ভবিষ্যত জীবন গঠনে অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে।


কক্সবাজারে বাংলাদেশী কমিউনিটি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী কমিউনিটি উভয়ের সহযোগিতার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে ইউনিসেফ। এই সহযোগিতার মাধ্যমে, ২০২৪ সালে কক্সবাজারে ইউনিসেফ-এর সহযোগিতায় পরিচালিত বহুমুখি কেন্দ্রে ১,৬৪০ জন বাংলাদেশী কিশোর ও যুবক বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নিবন্ধিত হয়েছে।