রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের নারীদের জীবনকে নতুনভাবে শুরু করতে সহায়তা করছে সেফ স্পেসসমূহ

নারী এবং মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিরসনে সহায়তা

কুসালি নেলি কুবওয়ালো
Rohingya refugee
UNICEF Bangladesh/2021/Kusali
12 আগস্ট 2021

সেলাই মেশিন কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং সেলাইয়ে ধীরে ধীরে কীভাবে নিজ গতিতে আগাতে হয় সে বিষয়টি রুবাইদা (আসল নাম নয়) অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে এক মেয়েকে দেখিয়ে দিচ্ছে । যদিও মেয়েটি বার বার ভুল করছে, তবুও রাগারাগি না করে রুবাইদা অত্যন্ত শান্তভাবে বারবার প্রক্রিয়াটি দেখিয়ে দিচ্ছে। রুবাইদা বুঝতে পারছে যে, এই মেয়ের আত্মবিশ্বাস তার মতোই ভেঙ্গে গেছে এবং এ সময় সে যদি তার সাথে কোনও কঠোর ব্যবহার করে, তাহলে অতীতের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো মেয়েটির মধ্যে আবারও ফিরে আসবে।

রুবাইদা জানায়, “লকডাউনের সময় যখন তার স্বামী তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে ঠিক এমন সময়ই তার সাথে আমার দেখা হয়। বাড়িতে খাবার নেই - এই বিষয়টি তার স্বামীকে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো সাধারণ ভুলটিই মেয়েটি করেছিল।”

রুবাইদা মেয়েটিকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। নিজের পরিবারের সাথে যে ঘরে রুবাইদা থাকে, ঠিক সেখানেই একটি ছোট্ট কোণে মেয়েটিকে সে আশ্রয় দেয়। রুবাইদা তাকে সান্ত্বনা দেয় এবং মনোস্তাস্ত্বিক সহায়তা দেয়। এছাড়াও রুবাইদা মেয়েটিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে নারী এবং মেয়েদের জন্য সেফ স্পেস (নিরাপদ সেবাকেন্দ্রটি) দেখিয়ে দেয়। ইউনিসেফের সহযোগিতায় অ্যাকশন এইড এই কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে।

নারী এবং মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সহিংসতার বিরূদ্ধে প্রতিরোধের জন্য সেবাকেন্দ্রগুলো কাজ করে। একটি নিরাপদ, গোপনীয় এবং স্বস্তিকর পরিবেশ নিশ্চিত করে এসব সেবাকেন্দ্র। এখানে পুরুষ ও ছেলেদের উপস্থিতি থাকে না। একইসাথে কোনো সামাজিক কলঙ্ক ছাড়াই নারী ও মেয়েরা এসব সেবাকেন্দ্রে উপস্থিতি থেকে একে অপরের সাথে দেখা-সাক্ষাত এবং যোগাযোগ করতে পারে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) থেকে বেঁচে যাওয়া নারী ও মেয়েরা এখানে মনো-সামাজিক সহায়তা এবং কেস ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সেবা পেতে পারে। জিবিভি থেকে বেঁচে যাওয়া এবং সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে এমন নারী ও মেয়েরা যাতে সহজে যেতে পারে এমন স্থানে কেন্দ্রগুলো অবস্থিত।

নারীদেরকে অর্থর্নৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে পোশাক তৈরি এবং হাতের কাজ (সেলাই এর কাজ) শেখানোর জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানেরও ব্যবস্থা রয়েছে এসব কেন্দ্রে।  কোভিড-১৯ মহামারী যখন তুঙ্গে ঠিক সেই সময়ে পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত কেস কর্মীদের পাওয়াটা বেশ কঠিন। আয় কমে যাওয়া বা আয় না থাকার ফলে সৃষ্ট হতাশা জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে।

ঐতিহ্যগত এবং সামাজিক নিয়মকানুনের কারণে আশ্রয়শিবির এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়ের (হোস্ট কমিউনিটি) নারী ও মেয়েদের নিজের বাড়ির বাইরে যাওয়ার বিষয়টি এমনিতেই সীমিত ছিল। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে তা আরও বেড়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের সেবা পাবার সীমিত সুযোগ, স্কুল বন্ধ থাকা এবং অর্থনৈতিক চাপের ফলে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের দ্বারা সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরিমাণও বেড়ে গিয়েছিল। স্বামীর দ্বারা মারধরের শিকার হওয়া এবং বৃষ্টির মধ্যে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর একজন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবী রুবাইদার সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল।

অ্যাকশন এইডের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক শেইনাজ পারভিন বলেন, “আশ্রয়শিবির গুলোতে যেহেতু কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় সেবার সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল, সেহেতু আমরা কমিউনিটি আউটরিচ কর্মসূচি এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার্যক্রম শুরু করার দিকে মনোনিবেশ করছিলাম। স্বামীর দ্বারা খারাপভাবে নির্যাতিত হবার পরে আমাদের একজন স্বেচ্ছাসেবী রুবাইদাকে বেশ শরনাপন্ন অবস্থায় পেয়েছিল।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শেইনাজ আরও বলেন, রুবাইদাকে কাউন্সেলিং করা হয়েছিল এবং তাকে মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। মহামারী-সংক্রান্ত চলাচলের বিধিনিষেধ আংশিকভাবে প্রত্যাহার হবার পর থেকেই রুবাইদা ঘন ঘন সেবাকেন্দ্রে আসতে শুরু করে এবং স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে এখন সে তার মতো অন্য নির্যাতিত নারী এবং মহিলাদের সাহায্য করছে।

পর্দার আড়ালে থাকলেও তার মুখের গভীর হাসি চোখের কাছে পৌঁছায় এবং সন্তানদের সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করলে তার পুরো মুখ আলোকিত হয়ে ওঠে। রুবাইদা তার সন্তানদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এবং কোনো রকম বাঁধা ছাড়াই তার সন্তানরা শিক্ষিত এবং স্বাধীন হবে এমনটিই সে কল্পনা করে।

রুবাইদা তার সন্তানদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এবং কোনো রকম বাঁধা ছাড়াই তার সন্তানরা শিক্ষিত এবং স্বাধীন হবে এমনটিই সে কল্পনা করে।

রুবাইদা জানায়, “তারা যা হতে চায় তা তারাই বেছে নিবে। তবে, তাদেরকে অবশ্যই সঠিক তথ্য দিয়ে শিক্ষিত এবং ক্ষমতায়িত করতে হবে। আর এটাই একমাত্র জিনিস যা তাদের জীবন বদলে দিতে পারে।”

রুবাইদা খুব কষ্ট পেয়েছে। মায়ানমারে থাকা অবস্থায় মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল এবং এখন তার বয়স ২৫ বছর। ১২ থেকে ৪ বছর বয়সের মধ্যে তার চারটি সন্তান রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজার আশ্রয়শিবিরে বসবাসকারী এক রোহিঙ্গা শরণার্থী রুবাইদা স্মৃতি হাতরিয়ে জানায় যে, এখন পর্যন্ত  নিজের জীবনে ভাল কোন কিছুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সে খুব বেশি একটা পায়নি। এমন এক বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল যখন বিয়ে সম্পর্কে তার তেমন কোন ধারণাই ছিলনা। তার মনে আছে যে, দুটি পরিবার তার বিয়ের বিষয়ে ঝগড়া করছিল এবং শেষ পর্যন্ত ১৯ বছর বয়সী এক ছেলেকে বর হিসাবে তার পরিবার বেছে নিয়েছিল যার সাথে এর আগে রুবাইদা একবার বা দুইবার কথা বলেছিল। প্রকৃতপক্ষে রুবাইদার কোন বিকল্প ছিল না। যদি এই বিয়েতে রুবাইদা রাজী না হতো, তবে ছেলেদের মধ্যে একজন তাকে অপহরণ করত যা তার পরিবারের জন্য অনেক কলঙ্কের হতো।

সে আরও জানায়, “বিয়ের পর পরই আমি গর্ভবতী হয়ে পড়ি। আমার স্বামী খুব হিংস্র প্রকৃতির ছিল। ছোটখাটো সমস্যা যেমন, খাবার দিতে দেরি করা বা দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার কারণে সে আমাকে প্রায়ই মারধর করতো।”

তার স্বামীর পরিবার ক্রমাগতভাবে তাকে মৌখিক নির্যাতন করতো। রুবাইদা যে কোন কাজের না; বরং তাকে বাড়িতে রাখা মানে একজন মানুষের জন্য অতিরিক্ত খাবার দেয়া এবং অথে©র অপচয় করা এ কথাটিই তারা বার বার রুবাইদাকে মনে করিয়ে দিতো। এতে করে রুবাইদার আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং সে সবকিছু থেকে আলাদা এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

যখন তারা বাংলাদেশে চলে আসে, জীবন তখন আরও কঠিন হয়ে উঠে। দীর্ঘদিন ধরে তার স্বামীর কোনো আয় ছিল না এবং তার স্বামী তাকে প্রায়ই মারধর করতো। একজন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবী রুবাইদাকে যেদিন খুঁজে পেয়েছিল, সেই দিন থেকে তার জীবন চিরতরের জন্য বদলে যেতে শুরু করে।

রুবাইদা জানায়, “এখন আমার স্বামী আমাকে সম্মান করে, এবং কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার সাথে পরামর্শ করে। এখন আমি অনেক নারীকে সাহায্য করি বলে কমিউনিটির লোকজনের কাছ থেকে আমি অনেক সম্মান পাই। আর এ বিষয়টা আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। অনেক বিয়ে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে আমি এখন দাওয়াত পাই।”

রুবাইদা সেবাকেন্দ্রে গিয়ে পোষাক তৈরির দক্ষতা  অর্জন করেছে। এখন সে মাসে ১০০ ডলারের বেশি উপার্জন করতে সক্ষম। কমিউনিটিতে তার সম্মান অর্জন এবং তার সন্তানদের নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার জন্য এই আয়ই যথেষ্ট।


রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশি স্বাগতিক সম্প্রদায়ের (হোস্ট কমিউনিটি) প্রতি অব্যাহত সহায়তার জন্য ইউনিসেফ কোরিয়ার জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।