ভার্চুয়াল আদালত কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি কমাচ্ছে বাংলাদেশে

ভার্চুয়াল আদালত জনাকীর্ণ ডিটেনশন কেন্দ্র থেকে তরুণদের মুক্ত করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে

ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী
কান্নারত একটি শিশুকে তার বাবা  আলিঙ্গন করছে
UNICEF Bangladesh/2020/Paul
01 জুলাই 2020

ঢাকা, বাংলাদেশ – একমুখ হাসি নিয়ে ১৬ বছর বয়সী সাকিব (পরিবর্তিত নাম) কয়েক মাসের ভিতরে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় তার বাড়িতে পা রাখে।

“নিজের পরিবারের কাছে ফিরে আমার যে কি ভালো লাগছে,” বাসার সবার সাথে কুশল বিনিময় করতে করতে সে জানায়। ঢাকার প্রান্তে টঙ্গি এলাকায় একটি ডিটেনশন কেন্দ্রে সাকিবকে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু জনাকীর্ণ পরিবেশে কোভিড-১৯ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগ বেড়ে যাওয়াতে ভার্চুয়াল আদালত খোলা হয়েছে যাতে এই তরুণদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো দ্রুত নিস্পত্তি করা যায়।

“ডিটেনশন কেন্দ্রে খুব যে খারাপ লাগত এমন নয়, তবে আমি আমার মাকে খুব মিস করতাম,” সাকিব জানায়।

ছেলেকে দেখে সাকিবের মা কেঁদে ফেলে। আবেগতাড়িত অবস্থায় সাকিবের হাসিও কান্নায় রূপ নেয়। মা এবং সন্তানের জন্য এ হল আনন্দের অশ্রু এবং পরম স্বস্তির ব্যাপার।

সুখ ও দুর্ভোগ

সাকিব অন্তত এমন পাঁচশ শিশুদের একজন, যাদেরকে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে সম্প্রতি জামিন দেয়া হয়েছে। এই ভার্চুয়াল আদালতগুলো ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানে অধিকাংশ শিশুদেরই রাখা হয়েছে গৌণ অভিযোগের ভিত্তিতে। অথচ এই অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করতেই কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যায় অনেক সময়।

দেশের আদালতগুলোতে প্রায় ২৩,০০০ শিশু-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের ভিতরে এসকল মামলায় জড়িত ১,০০০ জনের বেশী শিশুকে মাত্র তিনটি ডিটেনশন কেন্দ্রে রাখা হয়, যার পরিণামে কেন্দ্রগুলোতে জনাকীর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

জামিনে মুক্ত হওয়া শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জামিনে মুক্তি দেওয়ার পরে তাদেরকে বাবা-মায়ের কথা অনুযায়ী সুন্দর জীবনযাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়। সাকিব সেই পরামর্শগুলো মেনে চলার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।

“আমি বাড়িতেই থাকব কারণ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ব্যাপারে আমি অবগত এবং খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলার ব্যাপারেও আমি সচেষ্ট থাকব। এছাড়া বাসার কাজেও বাবা-মাকে সহায়তা করার চেষ্টা করব,” সাকিব জানায়।

একটি ডিটেনশন কেন্দ্রের সামনে তরুণরা দাঁড়িয়ে আছে
UNICEF Bangladesh/2020/Paul

সাকিবের বাবা সন্তানের মুক্তিতে ভীষণ আনন্দিত। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে এখন সাতজনে দাঁড়ানোতে সংসারের খরচ চালানোর ব্যাপারে সে তার দুশ্চিন্তার কথাও স্বীকার করেন।

“লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে আমার আয় অনেক কমে গেছে। আমার অন্য দুই সন্তান যারা ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করে তারা এখন সংসারে টাকা দিচ্ছে। তারপরেও অপরিহার্য জিনিসগুলো কিনতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি। আমাদের জন্য উপার্জনের প্রায় সমস্ত রাস্তাই বন্ধ হয়ে গেছে,” সাকিবের বাবা জানান।

চাপের মুখে

বাংলাদেশের প্রলম্বিত আদালতের কর্মকাণ্ড কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই জনাকীর্ণ পরিবেশে এই ডিটেনশন কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কার কারণে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ২০২০-এর মে মাসের নয় তারিখে একটি অধ্যাদেশ জারি করে ভার্চুয়াল আদালত চালু করার নির্দেশ প্রদান করেন, যার ফলশ্রুতিতে অল্প কিছুদিনের ভিতরেই শিশুদের জন্য দেশের প্রথম ভার্চুয়াল আদালত যাত্রা শুরু করে।

কান্নারত একটি শিশুকে তার মা আলিঙ্গন করছে
UNICEF Bangladesh/2020/Paul

স্বল্প জনবলসম্পন্ন ও জনাকীর্ণ কিশোর ডিটেনশন কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের বিশেষ অফিসার ও অতিরিক্ত জেলা জজ সাইফুর রাহমান বলেন, “এরকম পরিবেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব।”

ঝামেলামুক্ত থাকা

জামিন প্রক্রিয়ার ব্যবস্থাপনার জন্য ইউনিসেফ ডিটেনশন কেন্দ্রগুলোকে সহযোগিতা প্রদান করে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাথে একযোগে কাজ করে ইউনিসেফ শিশুদেরকে তাদের পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের ব্যাবস্থাসহ এও নিশ্চিত করে থাকে যে, তাদেরকে কেউ যেন সাথে করে নিয়ে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।

এছাড়াও পরিবারের সাথে একত্রিতকরনসহ ইউনিসেফ নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকে, যেমনঃ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, আইনগত ও সামাজিক-মনস্তাত্বিক সহযোগিতা, সহিংসতা প্রতিরোধ ও সাড়া দেওয়া, এবং শিক্ষা ইত্যাদি সহযোগিতা।

ডিটেনশন কেন্দ্রের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলর শরীফুল বলেন, “শিশুরা মুক্ত হওয়ার পরে এখানকার কর্মীরা ফোন করে তাদের ভালমন্দ সম্পর্কে খোঁজ নেয়।” মুক্ত হয়ে এই শিশুরা আবার কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে কিনা তা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই শিশুদেরকে খুবই গৌণ অভিযোগের ভিত্তিতে এখানে এনে রাখা হয়। তাই তাদের ভিতরে অপরাধমূলক প্রবণতা কম।

শরীফুল মনে করেন যে, যারা জামিনে মুক্ত হচ্ছে তারা আবার আইন ভঙ্গ করবে কিনা সেটা আসলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নয়, বরং কোভিড-১৯ মহামারীর প্রেক্ষাপটে এখানে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হয়েছে তা তারা বাড়িতে মেনে চলবে কিনা সেটাই আসল চিন্তার বিষয়।

“আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে বাড়িতে ফেরার পর তারা একইভাবে শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে কিনা,” শরীফুল জানান।

*নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।