বাংলাদেশের স্কুলছাত্রীরা শিখেছে যে পিরিয়ড নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই

পিরিয়ড-জনিত কারণে কারুরই স্কুল কামাই করা উচিত নয়, যদিও বাংলাদেশে প্রতি মাসে প্রতি তিন জন মেয়ের মধ্যে একজন এটি করে

ইউনিসেফ
Bangladeshi student
UNICEF Bangladesh/2022/Himu
09 জুন 2022

লাবণ্যর মাসিক বা পিরিয়ড একসময় তার জন্য উদ্বেগ ও লজ্জার কারণ ছিল, কিন্তু যখন থেকে তার স্কুলে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ এবং পিরিয়ডের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া শুরু হয়েছে, তারপর থেকে এটা আর তার কাছে লজ্জার বা লুকানোর মতো নিষিদ্ধ কোন বিষয় নয়। লাবণ্যর স্কুল বাংলাদেশের বরিশালে।

১৪ বছর বয়সী লাবণ্য বলে, “আমি এক সময় পিরিয়ড চলাকালে স্কুলে যেতে বিব্রত বোধ করতাম। আগে স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া বা সেগুলো ব্যবহারের পর অপসারণের কোনো জায়গা ছিল না। এখন এমনকি আমি পিরিয়ডের সময়ও স্কুল কামাই দেইনা।’’

পিরিয়ড মেয়ে থেকে নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ, তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এই বিষয়টি নিয়ে খুব কমই খোলামেলা কথা হয়। ২০১৮ সালের জাতীয় হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধি সমীক্ষা অনুসারে, মাত্র ৫৩ শতাংশ স্কুলগামী কিশোরী তাদের প্রথম পিরিয়ড হওয়ার আগে এ সম্পর্কে জানতে পারে।

মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় বা স্যানিটারি প্যাড কেনার মতো টাকা না থাকায় অনেক মেয়েকেই তাদের নিজেদের মতো করে বয়ঃসন্ধিকালীন সময় পার করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাছাড়া, বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে স্যানিটারি ন্যাপকিনকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি স্যানিটারি ন্যাপকিন সাশ্রয়ী হলেও মেয়ে ও নারীরা সেগুলো কেনা থেকে বিরত থাকে। কারণ ফার্মেসি ও দোকানগুলোতে সাধারণত পুরুষ কর্মীরাই থাকেন।

পিরিয়ড ব্যবস্থাপনায় সমস্যা স্কুল উপস্থিতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কিশোরী পিরিয়ড চলাকালে প্রতি মাসে কয়েকদিনের জন্য স্কুল কামাই দেয়। অনেকেই শ্রেণিকক্ষে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে এটি করে। এর পরিবর্তে তারা ঘরে কাপড়ের টুকরো দিয়ে তাদের পিরিয়ড-জনিত রক্তপাত সামাল দেয়।

পিরিয়ড নিয়ে প্রচলিত সামাজিক লজ্জা ও ভুল ধারণার অবসান ঘটাতে এবং এর কারণে মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ।

Wahida Khanam, an assistant teacher, Pirojpur, Bangladesh, hands out sanitary pads from the hygiene corner.
UNICEF Bangladesh/2022/Himu বাংলাদেশের পিরোজপুরের কাউখালীর উত্তর নিলতী সমতট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ওয়াহিদা খানম স্কুলের হাইজিন কর্নার থেকে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করছেন।

স্যানিটারি প্যাড মজুত করা

২০১৯ সাল থেকে ইউনিসেফ পিরোজপুর ও ফরিদপুর জেলার ৩১টি স্কুলে পিরিয়ড-জনিত হাইজিন কর্নার চালু করতে একটি প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে, যা ৫ হাজারেরও বেশি স্কুল ছাত্রীকে স্যানিটারি প্যাড, ওয়েট ওয়াইপস বা ভেজা টিস্যু, স্যানিটাইজার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি পণ্য ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত প্যাডের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি স্কুলে একটি ইনসিনারেটর বা আবর্জনা পোড়ানোর চুল্লিও সরবরাহ করা হয়েছে।

লাবণ্য বলে, “হাইজিন কর্নারে সবসময় স্যানিটারি প্যাড পাওয়া যায়। আমি একটি ক্যালেন্ডার বা দিনপঞ্জীতে আমার মাসিক চক্রের হিসাব রাখি। তাই আমি জানি কখন আমার পিরিয়ড হবে। এখন আমি এর জন্য প্রস্তুত।”

প্রতিটি স্কুলে একজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার দায়িত্ব হলো হাইজিন কর্নারে সবসময় স্যানিটারি ন্যাপকিন পর্যাপ্ত মজুত রাখা এবং পিরিয়ড ও পিরিয়ড-কালীন স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে ছাত্রীদের জানানো।

লাবণ্যের স্কুলে যেসব মেয়ের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তারা ‘সততা স্টোর’ থেকে স্যানিটারি প্যাড কিনতে পারে। সেখানে শিক্ষার্থীরা কারো কোনো নজরদারি ছাড়া নিজেরাই টাকার বিনিময়ে খাবার এবং নোটবুক, পেন্সিল ও কলমের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারে। অনেক মেয়ের জন্য এটি অন্য কাউকে জানতে না দিয়ে কোনো ধরনের অস্বস্তি ছাড়া স্যানিটারি প্যাড পাওয়ার একটি সুবিধাজনক উপায়।

Labonno, 14, Bangladesh
UNICEF Bangladesh/2022/Himu স্কুলের পিরিয়ড-কালীন হাইজিন কর্নারের কল্যাণে ১৪ বছর বয়সী লাবণ্যকে আর তার পিরিয়ডের কারণে স্কুল কামাই দিতে হয়না।

স্কুলে উপস্থিতি বেড়েছে

হাইজিন কর্নার চালু হওয়ার পর থেকে স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য-প্রমাণ বলছে, স্কুলে অনুপস্থিতি মেয়েদের জন্য উদ্বেগজনক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তারা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়তে শুরু করে, যার ফলে তাদের গ্রেড খারাপ হতে পারে। এটি তাদেরকে স্থায়ীভাবে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য তাদের অভিভাবকদের মত তৈরিতে যথেষ্ট। আর স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েরা শিশুবিয়ের শিকার হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।  

লাবণ্যর স্কুলের সহকারী শিক্ষক ওয়াহিদা খানম ইউনিসেফ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর পিরিয়ড-জনিত স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

তিনি ছাত্রীদের বোঝান, কেন স্যানিটারি প্যাড কাপড়ের চেয়ে নিরাপদ ও অধিক স্বাস্থ্যকর। আর ব্যবহৃত কাপড় সঠিকভাবে ধুয়ে ভালোভাবে শুকানো না হলে মূত্রনালীর সংক্রমণের কারণ হতে পারে। তিনি ছাত্রীদের দেখান, কীভাবে টয়লেটে থাকা শুট বা ঢালু পাইপলাইন ব্যবহার করে তাদের ব্যবহৃত প্যাডগুলোকে ইনসিনারেটর বা চুল্লিতে পাঠাতে হয়।

ওয়াহিদা বলেন, “স্কুলে হাইজিন কর্নার থাকাটা অপরিহার্য। এটি ক্লাসে মেয়েদের অনুপস্থিতি কমায়, যা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।”

এছাড়াও, ছেলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা পিরিয়ড হওয়া কিশোরীদের চাহিদার প্রতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।

Furqan Ahmed, UNICEF WASH Officer from the Barishal Field Office
UNICEF Bangladesh/2022/Himu পিরিয়ড খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয় এবং এটা নিয়ে লুকানোর বা লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই– এটা বোঝাতে ইউনিসেফের বরিশাল ফিল্ড অফিসের ওয়াশ কর্মকর্তা ফুরকান আহমেদ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন।

ইউনিসেফের বরিশাল ফিল্ড অফিসের পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াস) বিষয়ক কর্মকর্তা ফুরকান আহমেদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেন এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে যে, পিরিয়ড মেয়েদের শারীরিক চক্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এটি লুকিয়ে রাখার মতো কোনো গোপন বিষয় নয়। মেয়েদেরকে তাদের পিরিয়ড ব্যবস্থাপনায় যে চক্রের ভেতর দিয়ে যেতে হয় সেই বেদনাদায়ক অবস্থা সম্পর্কে তিনি ভালোভাবেই অবগত।

ফুরকান আহমেদ বলেন, “যখন পিরিয়ড হয়, মেয়েরা লজ্জা পায়। সে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে বাজারে যেতে পারে না, কারণ বিক্রেতাদের শতভাগই পুরুষ। ফলে সে তার মাকে জানায় এবং তার মা জানায় তার বাবাকে। তার বাবাকে অবশ্যই ন্যাপকিন কিনতে হবে, যা কেনার পর তিনি মেয়ের মাকে দেন এবং মা মেয়েকে দেন। যদি বাবা কিনতে ভুলে যান, তাহলে মেয়ের ভোগান্তি হয়।”

"কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমার মেয়েরা সরাসরি আমাকে বলতে পারে এবং আমি দ্রুত গিয়ে তাদের যা প্রয়োজন তা কিনে দিই অথবা তাদের যা প্রয়োজন তা কোনো ধরনের লজ্জা বা সংকোচ ছাড়াই তাদের হাতে তুলে দেই!”