“আমার মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর তখন তার বিয়ে হয়ে যায় - আমারও সেই জীবন হোক তা তিনি চাননি”

শিশুবিয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাহমিনা

ইউনিসেফ
Tahmina takes a stand against child marriage. Bangladesh
UNICEF/UN0836120/Lateef
03 মে 2023

“আমার মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর তখন তার বিয়ে হয়ে যায়- আমারও সেই জীবন হোক তা তিনি চাননি,” বলে তাহমিনা।

সে আরও বলে, “আমি আমার ভাইবোনদের মধ্যে বড়। তবে আমার একজন বড় ভাই থাকত, সে জন্মের পরপরই মারা গেছে। কারণ সন্তান জন্ম দেওয়ারজন্য আমার মায়ের বয়স তখন খুব কম ছিল।”

ছয় মাস আগে বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া জেলার ১৬ বছর বয়সী এই মেয়েটির স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে প্রায় তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছিল! তবে সাহসিকতার সাথে  কমিউনিটির লোকজনের সহায়তায় সে তার বাবা-মাকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, শিশুদের বিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

 

দারিদ্র্যের কারণে শিশুবিয়ের ঘটনা ঘটছে

16-year-old Tahmina with her siblings. Bangladesh
UNICEF/UN0836127/Lateef ১৬ বছর বয়সী তাহমিনা তার ভাইবোনদের সঙ্গে। স্কুলের ফি দিতে না পারায় তাহমিনার বাবা-মা এই বছরের শুরুতে তাকে বিয়ে প্রায় দিয়েই ফেলেছিলেন।

তাহমিনা দশম শ্রেণীতে উঠার পরপরই পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তার বাবা-মাকে তাকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরিবারটির কাছে তাহমিনার স্কুলের ফি দেওয়ার মতো টাকা ছিল না।

তার মা আরেফা বেগম এ বিষয়ে বলেন, “আমরা খুব গরীব মানুষ। তাহমিনার বাবা হাঁপানির রোগী হওয়ার কারণে বেশি কাজ করতে পারেন না। কখনই চাইনি আমি যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছি, সেই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আমার মেয়েও যাক। তবে একটা সময়ে আমার মনে হয়েছিল সবসময় বোধহয় এমনটাই ঘটে।’’

তাই পরিবারটি মেয়ের জন্য বর খুঁজতে শুরু করেছিল। বাবা-মায়ের এই সিদ্ধান্ত শুনে তাহমিনা ভেঙে পড়েছিল।

তাহমিনা বলে, “আমি খুব আতঙ্কিত বোধ করছিলাম, প্রতিদিন কাঁদতাম।“ এরপর তাহমিনা স্থানীয় শিশু সুরক্ষা কমিউনিটি হাবের একজন স্বেচ্ছাসেবকের কাছে যায়, যেখানে সেও একসময় সমবয়সীদের নেতা বা পিয়ার লিডার হিসেবে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতো। সবকিছু জানার পর কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন স্থানীয় প্রতিনিধিকে তাহমিনার বাবা-মায়ের বাড়িতে নিয়ে যান। কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা তাহমিনার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। শিশুবিয়ের ঘটনা মেয়েদের ওপর সারাজীবনের জন্য যে প্রভাব ফেলে সেটি তারা তাহমিনার বাবা-মাকে বোঝান।

মেয়েকে শিশুবয়সে বিয়ে দেওয়া যে উচিত নয় সেটি বুঝতে পারার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আরেফা বেগম বলেন, "আমি পরে বুঝতে পারি যে, আমি ভুল ছিলাম। শিশুদের বিয়ে দেওয়া যে ভুল সেটিও বুঝতে পেরেছিলাম।" তিনি আরও বলেন, “তাহমিনার জন্য খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই আমি তার বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি তাকে আজীবনের জন্য কষ্ট দিতে চাইনি।’’

 

একটি বিস্তৃত সামাজিক ব্যাধি

তাহমিনা ২০২২ সাল থেকে শিশু সুরক্ষা কমিউনিটি হাবের একজন পিয়ার লিডার। সচেতনতা বাড়াতে সে শিশুবিয়ে ও শিশুশ্রম সম্পর্কে অন্য শিশুদের সঙ্গে কথা বলে। ইউনিসেফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত এইসব হাব কমিউনিটির সব শিশু ও কিশোর-কিশোরীর জন্য উন্মুক্ত। বাংলাদেশে এই ধরনের এক হাজারেরও বেশি হাব চালু রয়েছে। আর প্রতিটি হাবে কমিউনিটির দুইজন স্বেচ্ছাসেবক ও দুইজন পিয়ার লিডার রয়েছেন।

শিশুবিয়ে একটি মেয়ের কী ক্ষতি করতে পারে তাহমিনা একজন পিয়ার লিডার হিসেবে সে সম্পর্কে সচেতন। তবে কমিউনিটির খুব কম লোকই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চায়।

Tahmina with her father in her village in Ukhiya, Cox's Bazar.
UNICEF/UN0836125/Lateef কক্সবাজারের উখিয়ায় তার গ্রামে বাবার সঙ্গে তাহমিনা

“শিশুবিয়ে মেয়েদের জন্য কতটা ক্ষতিকর তা নিয়ে কেউ কথা বলে না। যখনই একটি মেয়ে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায় তখনই লোকজন সেই মেয়েটিকে বিয়ে দেওয়ার কথা বলতে শুরু করে। এখানেও এমনটাই হয়,” বলে তাহমিনা। সে আরও বলে, “আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য আমার কমিউনিটির লোকজনের অনেক চাপ ছিল। আমার বয়স ১২ বছর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা এটি শুরু করে। সবাই আমার বাবা-মাকে বলে, আমাকে বিয়ে দিয়ে দিতে।”

সাম্প্রতিক কয়েক দশকে অনেক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশে শিশুবিয়ের ঘটনা ব্যাপকমাত্রায় রয়ে গেছে। দেশে ৫১ শতাংশ তরুণী বিয়ে হয়ে যায় তাদের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই এবং দেশটিতে শিশু বিয়ের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ও বিশ্বে অষ্টম সর্বোচ্চ।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা বিষয়ক প্রধান নাটালি ম্যাককলি বলেন, “শিশুবিয়ে আজীবন কষ্টের কারণ হয়, মেয়েদের শৈশব ও অধিকার কেড়ে নেয়। শিশুবিয়ের কারণে মেয়েরা শুধু স্কুল ছেড়ে দিতেই বাধ্য হয় না, তারা অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। অল্পবয়সী মা এবং তাদের গর্ভে জন্মানো শিশু উভয়ই গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগতে পারে। দেশের সব অঞ্চলে শিশুবিয়ের অবসান ঘটানোর জন্য পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশে আমাদের আরও সমাজকর্মী প্রয়োজন।’’

 

ক্ষতিকারক রীতিনীতি না মানা

Tahmina at home, studying. Her mother, Arefa, says she will do all she can to support her children to get educated.
UNICEF/UN0836126/Lateef বাড়িতে পড়াশোনা করছে তাহমিনা। তার মা আরেফা বলেছেন, তিনি তার সন্তানদের শিক্ষিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

বিয়ে নিয়ে কিছুদিন তাহমিনা ও তার বাবা-মায়ের সম্পর্ক বেশ শীতল ছিল। “আমি কিছুদিন তাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলাম এবং তারা আমার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। কিন্তু এখন সবকিছু ঠিক আছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে আমি জানি আমার জন্য কোনটি সঠিক,” বলে তাহমিনা।

তার বাবা-মা পরে বুঝতে পারে যে তাহমিনার স্কুলে যাওয়া উচিত। তাই তাহমিনাকে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কমিউনিটির লোকজন চাপ দিলেও  তাদের মন পরিবর্তন হয়নি।

আরেফা বেগম বলেন, “আমি তাদের কথা শোনা বন্ধ করে দিয়েছি। আমি চাই তাহমিনা যা করতে চায় তাই করুক। সে আমাকে বলেছে, সে পড়াশোনা করতে চায়। আর তাই এই চাওয়া পূরণ করতে আমাদের পক্ষে যা যা করা সম্ভব, তার সবটুকুই আমরা করবো। আমি চাই আমার সব সন্তান শিক্ষিত হোক।”