সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা
বাংলাদেশে দ্য স্পোর্টস ফর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম কন্যাশিশুদের সব প্রতিকূলতা পার হতে এবং ক্ষতিকর সামাজিক রীতি-নীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করছে।
- বাংলা
- English
ঢাকায় এক বৃষ্টিভেজা বৃহস্পতিবার বিকেল।শহরের সবচেয়ে বড় বস্তিগুলোর একটি কড়াইলের টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠ, সেখানে ঘাসের চেয়ে কাদা বেশি। প্রতিবার পা ফেললেই পানি ছিটে ভেজা মোজার ভেতরে চলে যাচ্ছে।
এরপরেও মাঠ প্রাণবন্ত। ফুটবল ম্যাচ শুরু করতে প্রস্তুত দুই দলের মেয়েরা (কন্যাশিশুরা) মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।খেলা দেখতে ভিড় জমেছে- তারা মেয়েদের এমন একটি খেলা দেখতে চায়, যেটা এখনো মূলত ছেলেদের নিয়ন্ত্রণে। খেলোয়াড়দের মধ্যে আছে ১৭ বছর বয়সী শিমুলী। সে বলের দিকে চোখ রেখে কোচের নির্দেশনা অনুযায়ী ভেজা ঘাসের ভেতর দৌড়াচ্ছে।
মাত্র কয়েক বছর আগেও শিমুলীর জগৎ ছিল একেবারেই ভিন্ন।
শিমুলী আগে গৃহস্থালির কাজ করত, ঘর পরিষ্কার করা ও থালা-বাসন মাজা ছিল তার দায়িত্ব। তার বাবা ছোলা বিক্রি করে সংসার চালান, মা গৃহিণী, তার ছোট তিন ভাই-বোন রয়েছে। ছয়জনের সংসারের খরচ চালাতে সহায়তা করার জন্য বয়সের তুলনায় অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছিল মেয়েটি। একদিন কেউ একজন তাদের বাসায় না পৌঁছানো পর্যন্ত ফুটবল ছিল তার একেবারেই দূরবর্তী স্বপ্ন।
সেই একজন ছিলেন নাসিমা, যাকে শিমুলী ভালোবেসে ‘আপা’ ডাকে। নাসিমা হলেন দ্য স্পোর্টস ফর ডেভেলপমেন্ট (এসফোরডি) প্রোগ্রামের আওতায় ইউনিসেফের প্রশিক্ষণ ও সহায়তাপুষ্ট একজন কমিউনিটি সংগঠক। তিনি ধৈর্য নিয়ে শিমুলীর বাবা-মায়ের সঙ্গে বসলেন এবং বোঝালেন কেন তাদের মেয়ের ঘরের কাজ করা আর বিয়ের প্রস্তাবের বাইরে আরও বেশি কিছু করার আছে। কেন পড়াশোনা, খেলাধুলা আর জীবনদক্ষতাবিষয়ক প্রশিক্ষণ বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা।
বুঝিয়ে বলার পর শিমুলীল বাবা-মা রাজি হলেন। এখন শিমুলী দিনে স্কুলে যায় আর ক্লাস শেষে মাঠে অনুশীলন করে। তার মা মুর্শিদা খুশি যে, মেয়ে এসব সুযোগ পাচ্ছে। মুর্শিদার বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১২ বছর বয়সে এবং দারিদ্র্যের কারণে তিনি পড়াশোনার সুযোগ পাননি। মুর্শিদা চান, তার সন্তানরা যেন সেই সুযোগগুলো পায়, যেগুলো তিনি কখনো পাননি।
মুর্শিদা বলেন, “সমাজ কী বলবে, তা নিয়ে প্রথমে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখন দেখি আমার মেয়ে ভালো করছে, তাই তাদের কথায় আমার আর কিছু যায় আসে না। সে কোনো ভুল কিছু করছে না। অন্য মেয়েরা যদি খেলতে পারে, তবে আমার মেয়ে কেন পারবে না?”
তবে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সামাজিক রীতি-নীতির কারণে শিমুলী এখনো ফুটবল জার্সি পরে ঘর থেকে বের হতে পারে না। তাই সে সাধারণ পোশাকে ঘর থেকে বের হয় এবং মাঠে পৌঁছে তারপরে গিয়ে জার্সি পরে।
বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ২০২২ সালে এসফোরডি কর্মসূচি চালু করে ইউনিসেফ। এই কর্মসূচির আওতায় শিমুলী শুধু ফুটবল খেলা নয়, আরও অনেক কিছু শিখেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এমন নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ছেলে-মেয়েরা শুধু ফুটবল, ভলিবল, কাবাডি, সার্ফিং, স্কেটবোর্ডিং আর আত্মরক্ষার কৌশলই শিখছে না, তারা বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম আর নির্যাতনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও জানছে। যেসব সামাজিক রীতি-নীতি ক্ষতিকর এবং পেছনে টেনে ধরে সেগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন করতে তাদেরকে উৎসাহিত করা হয় এখানে।
এই কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছেন নাসিমার মতো কমিউনিটি সংগঠকেরা, যারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করেন এবং দ্বারে দ্বারে গিয়ে বাবা-মাকে বোঝান যেন তাদের সন্তানদের একটি সুযোগ দেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এসফোরডির আওতায় বাংলাদেশের ৩৭টি এলাকায় ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো হয়েছে, যাদের মধ্যে শিশু, বাবা-মা ও কমিউনিটির সদস্যরা রয়েছেন।
কিং সালমান হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টারের উদার সহায়তার কারণে এমন কমিউনিটিগুলোতে স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে, যেখানে আগে তা কল্পনাও করা যেত না। শিমুলী সাহস পেয়েছে। তার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সে শিখেছে কেবল নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে হয়।
যখন তার বন্ধু ১৮ বছর বয়সী তানজিনা বাড়িতে শারীরিক নির্যাতন ও অবহেলার মুখে পড়ল, সে সময় শিমুলী হস্তক্ষেপ করল। তানজিনার মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, তার বর্তমান স্বামী চাইছিলেন না তানজিনা তাদের সঙ্গে থাকুক। পরিস্থিতি যখন খুব গোলমেলে অবস্থায় পৌঁছাল সে সময় শিমুলী দুর্ঘটনাক্রমে তানজিনার মায়ের আঘাতের শিকার হলো। তবু সে থেমে থাকল না। প্রথমে, সে তানজিনাকে নিজেদের বাসায় আশ্রয় দিল, যদিও তাদের পরিবারকেই অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। তারপর আবার তানজিনার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গেল। ধৈর্য ও যুক্তি দিয়ে শিমুলী তাকে বোঝাল যে, কোনো শিশুরই সহিংসতার শিকার হওয়া উচিত নয়।
এটা সহজ ছিল না। কিন্তু এটা ছিল তার নেতৃত্বের প্রথম অভিজ্ঞতা। এটা এমন এক ধরনের নেতৃত্ব, যা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
শিমুলীর মধ্যে এই পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা নাসিমার জন্য এ ধরনের গল্পগুলো আশার সঞ্চার করে। তিনি বলেন, “বাবা-মাকে বোঝানোটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। যখন আমি বাবা-মাকে তাদের মেয়েদের (কন্যাশিশু) ট্রেনিংয়ে পাঠাতে বলি তখন প্রায়ই তারা বলেন যে, তাদের মেয়েরা বাড়ির আঙ্গিনায় খেলতে পারবে। মানুষ খারাপ কথা বলবে ভেবেই তারা এটা বলে থাকেন। তবে তাদেরও অন্য সবার মতো মাঠে দলের সঙ্গে খেলা দরকার। এভাবেই পরিবর্তন ঘটছে।”
পরিবর্তন আসছে। শিমুলীর বাবা প্রথম দিকে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ভাবছিলেন। এখন তিনি মেয়ের ফুটবল ম্যাচ দেখতে যান। দর্শক সারি থেকে মেয়েকে নিয়ে গর্ব করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
“আমি বুঝিয়ে বললাম যে, শিমুলীর বয়স অনেক কম। এখনও তার শরীর ও মনের বিকাশ ঘটছে এবং এখন তার বিয়ের উপযুক্ত সময় নয়। শেষ পর্যন্ত তার বাবা-মা মেনে নিলেন,” বলেন নাসিমা।
এদিকে কড়াইলে ম্যাচটি পেনাল্টির মধ্য দিয়ে শেষ হয়। শিমুলী জয়ী দলকে আলিঙ্গন করে। তখনো তার মুখে হাসি। আগামীকাল আরেকটি ম্যাচ হবে, জয়লাভের আরেকটি সুযোগ আসবে। এখন সে একদিন জাতীয় দলের জার্সি পরে খেলার স্বপ্ন দেখে, যেমনটি তার প্রিয় খেলোয়াড় মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে। নেইমার তার দ্বিতীয় প্রিয় খেলোয়াড়। যদিও সে মজার ছলে বলে, “আমি তাকে সমর্থন করতে পারি না। কারণ আমি আর্জেন্টিনার কঠোর ভক্ত!’
সে পর্যন্ত শিমুলী অনুশীলন চালিয়ে যাবে, ফুটবল আর নিজের স্বপ্নকে ধরে রাখবে। ইউনিসেফ তার পাশে থাকবে এবং তার মতো মেয়েরা কখনো স্বপ্ন দেখা বাদ দেবে না তা নিশ্চিত করবে।
হয়ত এক দিন কড়াইলের পিছলা মাঠে দৌড়ানো সেই একই কাদামাখা জুতোগুলো তাকে জাতীয় স্টেডিয়ামের উজ্জ্বল আলোর নিচে জয় অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে।