সংঘাত ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৪ কোটি ১০ লাখ শিশুর জন্য ৩৯০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তার আবেদন ইউনিসেফের

গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা সেবাবিহীন অবস্থায় লাখ লাখ শিশু

29 জানুয়ারি 2019
রোহিঙ্গা শিশু
UNICEF Bangladesh/2018/Lemoyne

জেনেভা/নিউইয়র্ক/ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি ২০১৯-মানবিক সংকটে থাকা শিশুদের জন্য নিজেদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে ৩৯০ কোটি ডলারের অর্থ সহায়তার আবেদন জানিয়ে ইউনিসেফ আজ সতর্ক করেছে যে, লাখ লাখ শিশু গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা সেবা ছাড়াই সংঘাত ও দুর্যোগ আক্রান্ত দেশে বসবাস করছে, যা তাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও ভবিষ্যতকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

ইউনিসেফের 'হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাকশন ফর চিলড্রেনস'-এ সংস্থাটির ২০১৯ সালের আর্জি এবং বিশ্বব্যাপী ৫৯টি দেশে ৪ কোটি ১০ লাখ শিশুকে নিরাপদ পানি, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সেবা প্রাপ্তির সুযোগ প্রদানে প্রচেষ্টার বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে সর্বমোট যে পরিমাণ অর্থ সহায়তার আর্জি জানানো হয়েছে, তার মধ্যে সিরিয়া সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সুরক্ষা সেবা প্রদানের জন্য প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ ডলারসহ শিশু সুরক্ষা প্রকল্পের জন্য ৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েত্তা ফোর বলেন, "আজকে সংঘাত বা দুর্যোগের মধ্যে বসবাসকারী লাখ লাখ শিশু ভয়াবহ মাত্রার সহিংসতা, দুর্দশা ও আতঙ্কের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের প্রভাব বাড়াবাড়ি হতে পারে না। যখন শিশুদের নিরাপদ খেলার জায়গা থাকবে না, যখন তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে পারবে না, যখন তারা মানসিক সহায়তা পাবে না তখন তারা যুদ্ধের অদৃশ্য ক্ষত থেকে সেরে উঠবে না।"

ইউনিসেফের হিসাব অুনযায়ী, ৩ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি শিশু সুরক্ষা সেবা ছাড়াই সংঘাত ও দুর্যোগ আক্রান্ত পরিবেশে বসবাস করছে, যাদের মধ্যে ইয়েমেনে ৬৬ লাখ, সিরিয়ায় ৫৫ লাখ ও ডমিনিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআরসি) ৪০ লাখ শিশু রয়েছে।

শোষণ, অবহেলা, নির্যাতন, আতঙ্ক ও সহিংসতা প্রতিরোধে উদ্যোগ গ্রহণসহ সব প্রচেষ্টাই শিশু সুরক্ষা সেবার অন্তর্ভুক্ত। শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য সম্ভাব্য বিপদসমূহ চিহ্নিত করা এবং তা কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ইউনিসেফ পানি,পয়ঃনিষ্কাশন এবং পরিচ্ছন্ন,শিক্ষা এবং কার্যক্রমের অন্য ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রে পরিচালিত মানবিক প্রকল্পগুলোর কেন্দ্রে যাতে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি থাকে তা নিশ্চিত করতেও কাজ করে।

তবে তহবিল সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি বিবাদমান পক্ষগুলোর ক্রমবর্ধমান অবজ্ঞা এবং মানবিক সহায়তা প্রাপ্তির সুযোগ অস্বীকারের অর্থ হচ্ছে, শিশুদের সুরক্ষায় সাহায্য সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ভয়াবহ রকমের সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, ডিআরসিতে ২০১৮ সালে শিশু সুরক্ষা প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের মাত্র এক তৃতীয়াংশই ইউনিসেফ পায়; সিরিয়ার শিশুদের সুরক্ষার জন্য মেলেনি প্রয়োজনীয় তহবিলের এক-পঞ্চমাংশ।

ইউনিসেফের জরুরি প্রকল্প বিষয়ক পরিচালক ম্যানুয়েল ফন্টেইন বলেন, "এই শিশুদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাৎপর্যপূর্ণ ও টেকসই আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড ছাড়া অনেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। জরুরি অবস্থায় শিশুদের সুরক্ষায় সহায়তা প্রদানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত।"

মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ৪ লাখ শিশুসহ ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নিয়েছে।  শরণার্থী অন্তঃপ্রবাহের এই বিপুল ব্যাপ্তি ও দ্রুত গতি থাকা সত্তেও ইউনিসেফ ১২ লাখেরও বেশী শরণার্থী ও আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জীবন রক্ষাকারি সেবা প্রদান করে।  এর আওতায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পায়, ২০ হাজার শিশু যাদের বয়স ৫ বছরের নিচে এবং চরম অপুষ্টির স্বীকার তারা চিকিৎসা পায় এবং ১২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশী জনসংখ্যা যাদের বয়স ১ বছরের বেশী তারা কলেরার টীকা পায়। এসব কিছুর জন্য দাতা সংস্থাগুলোর উদার সহায়তাকে ধন্যবাদ।   

২০১৯ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জীবনরক্ষাকারী ও মানবিক-উন্নয়ন চাহিদা মেটাতে দাতাদের কাছে ১৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার চেয়েছে ইউনিসেফ। এসব চাহিদার মধ্যে রয়েছে অপরিহার্য পুষ্টি, স্বাস্থ্য, ওয়াশ, সুরক্ষা ও শিক্ষা সেবা প্রাপ্তির সুযোগ। দেশটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির উচ্চ মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগ/মহামারীর জন্য পূর্বপ্রস্তুতি এবং তা মোকাবেলায় দেশজুড়ে মানবিক ব্যবস্থার সক্ষমতায় সহায়তা দেওয়া হবে।

২০১৯ সালে শিশু অধিকার বিষয়ক কনভেনশনের ৩০ বছর পূর্তি এবং জেনেভা কনভেনশনের ৭০ বছর পূর্তি হবে, তারপরও গত তিন দশকের মধ্যে আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক দেশ অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিকভাবে বিবাদে লিপ্ত, যা লাখ লাখ শিশুর নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য হুমকিস্বরূপ।

বিশ্বজুড়ে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বসবাসরত শিশুদের সুরক্ষা প্রদানে বিশ্ব ব্যর্থ হচ্ছে, যা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনছে-একমাস আগে ইউনিসেফ একথা বলার পর শিশুদের সংস্থাটি বিশ্বের কাছে এই অর্থ সহায়তা চাইল। যেসব শিশু অব্যাহতভাবে সহিসংতা বা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বসবাস করছে, বিশেষ করে খুব ছোট বয়সে, তারা সবচেয়ে ভয়াবহ চাপের মধ্যে বসবাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি এমন এক অবস্থা, যা সঠিক সহায়তা ব্যাতীত তাদের জ্ঞানের প্রসার এবং সামাজিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে জীবনব্যাপী নেতিবাচক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। যুদ্ধ, স্থানচ্যুতি এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাসহ অন্যান্য আতঙ্কজনক ঘটনায় বিপর্যস্ত কিছু শিশুকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং তাদের মানসিক অবস্থার উত্তরণে সহায়তা করতে বিশেষায়িত সেবা প্রয়োজন।

পৃথক পাঁচটি বৃহত্তম আবেদন হচ্ছে মিসর, জর্ডান, লেবানন, ইরাক ও তুরস্কে সিরিয়ার শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য (৯০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার); ইয়েমেনের জন্য (৫৪ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলার); ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর জন্য (৩২ কোটি ৬১ লাখ মার্কিন ডলার); সিরিয়ার জন্য (৩১ কোটি ৯৮ লাখ মার্কিন ডলার) এবং দক্ষিণ সুদানের জন্য (১৭ কোটি ৯২ লাখ মার্কিন ডলার)।

###

সম্পাদকদের জন্য নোট:

সবমিলিয়ে সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে ইউনিসেফ লক্ষ্য হচ্ছে:

  • ৪০ লাখ শিশু ও তাদের প্রতিপালনকারীদের মানসিক সহায়তা সেবা প্রাপ্তির সুযোগ প্রদান;
  • প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে নিরাপদ পানি প্রাপ্তির সুযোগ প্রদান;
  • ১ কোটি ১ লাখ শিশুকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা;
  • ১ কোটি ৩ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া;
  • তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ৪২ লাখ শিশুকে চিকিৎসা প্রদান।

২০১৮ সালের প্রথম ১০ মাসে ইউনিসেফের সহায়তার ফলে:

  • ৩১ লাখ শিশু ও তাদের প্রতিপালনকারীরা মানসিক সহায়তা সেবা পেয়েছে;
  • ৩ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ নিরাপদ পানি ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছে;
  • ৫৯ লাখ শিশু কোনো এক ধরনের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে;
  • ৪৭ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে;
  • তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ২৬ লাখ শিশুকে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।


ছবি ও মাল্টিমিডিয়া উপকরণ এখান থেকে ডাউনলোড করা যাবে: https://weshare.unicef.org/Package/2AMZIFI7QW8B


হিউম্যানিট্যারিয়ান অ্যাকশন ফর চিলড্রেন ২০১৯ এবং পৃথক আবেদনগুলো পাওয়া যাবে এখানে: https://www.unicef.org/appeals/

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

জ্যা-জ্যাক সিমন
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801713 043478
ই-মেইল: [email protected]
ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817586096
ই-মেইল: [email protected]

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার