মৌসুমি বৃষ্টির কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখের বেশি শিশু

ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও পরিবারগুলোতে সহায়তা প্রদানে ইউনিসেফ জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা কার্যক্রম জোরদার করছে

18 জুলাই 2019
বন্যায় প্লাবিত এলাকায় কলা গাছের ভেলায় একটি শিশু
UNICEF/UN0328202/Chakma

কাঠমান্ডু/নিউইয়র্ক/ঢাকা, ১৮ জুলাই ২০১৯ – ভারী বর্ষণ, বন্যা ও ভূমিধসে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ– নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশে অন্তত ৯৩ জন শিশু নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ৫০ লাখ শিশুসহ ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জিন গফ বলেন, “মৌসুমে বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসের কারণে লাখ লাখ শিশুর জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় এই সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। শিশুরা যাতে নিরাপদে থাকে তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে ইউনিসেফ জরুরিভাবে সাড়া দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছে।“

ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও রেল লাইনের কারণে অনেক এলাকায় যাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে এবং এই পরিস্থিতিতে শিশুদের জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হল রোগের বিস্তার ঠেকাতে পরিষ্কার পানি, পরিচ্ছন্নতার উপকরণ, খাদ্য সামগ্রী এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের খেলাধুলার জন্য নিরাপদ স্থান।

ইউনিসেফ তার কার্যক্রম জোরদার করতে উল্লিখিত তিনটি দেশের সরকার ও মানবিক কার্যক্রমের সহযোগীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও তাদের পরিবারের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে।

ভারতে আসাম, বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অন্য রাজ্যগুলোর কিছু অংশে ৪৩ লাখেরও বেশি শিশুসহ ১ কোটিরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি যত খারাপ হবে এই সংখ্যা ততই বাড়তে থাকবে। শুধু আসামেই বন্যার পানিতে প্রায় ২ হাজার স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দেশটির একটি অংশ ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে দুর্ভোগ পোহালেও আরেকটি অংশ তীব্র তাপদাহ ও পানি সংকট মোকাবেলায় লড়ছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশটির প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে।

নেপালে ২৮ হাজার ৭০২ জন শিশুসহ আনুমানিক ৬৮ হাজার ৬৬৬ জন মানুষ অস্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ৪৭ জন শিশুসহ (১৫ জন মেয়ে শিশু ও ৩২ জন ছেলে শিশু) মোট ৮৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নেপাল সরকারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জন নিখোঁজ রয়েছে ও ৪১ জন আহত হয়েছে। নেপালের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১২ হাজার পরিবার অস্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত কমে আসায় এবং বন্যা পানির মাত্রা কমতে শুরু করায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার তাদের বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ স্থানে মৌসুমি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে মধ্য-উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলে। প্রায় ৭ লাখ ৫১০ জন শিশুসহ ২০ লাখেরও বেশি মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪১টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং ১ হাজার ৮৬৬টি প্রাথমিক ও কমিউনিটি বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারে চলতি মাসে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে, যেখানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাস।

গফ বলেন, “এই অঞ্চলে আমরা শিশু ও পরিবারগুলোর ওপর আবহাওয়াজনিত বিধ্বংসী প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলো চরম, অননুমেয় ও অনিশ্চিত আকার ধারণ করলে শিশুদেরই এজন্য সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হবে।“

যদিও বিরূপ আবহাওয়াজনিত একক কোনো ঘটনা সুনির্দিষ্টভাবে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে না, তবে মানুষের কর্মকাণ্ড কীভাবে বৈশ্বিক জলবায়ুকে প্রভাবিত করবে– এ বিষয়ে যেসব আভাস রয়েছে তার সঙ্গে উচ্চ তাপমাত্রা, অতি ভারী বৃষ্টি এবং ধীরে অগ্রসরমান বায়ু প্রবাহসহ চরম আবহাওয়ার ক্রমবর্ধমান মাত্রা ও তীব্রতার বিষয়গুলো অনেকটাই মিলে যায়।

এই ধরনের আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলো মৃত্যু ও ধ্বংসের কারণ হতে পারে এবং শিশুমৃত্যুর পেছনে বড় যে প্রভাবকগুলো রয়েছে যেমন– অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়ার মতো বিষয়গুলো বিস্তারেও ভূমিকা রাখতে পারে। আর আবহাওয়াজনিত এ ধরনের ঘটনার তীব্রতা ও মাত্রা বাড়তে থাকায় শিশুরা যে ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকবে তা এগুলো নিয়ন্ত্রণে এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে বৈশ্বিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে।

বন্যা শিশুদের বেঁচে থাকা ও বিকাশকে হুমকির মুখে ফেলে। এছাড়া আঘাত ও ডুবে মারা যাওয়াসহ এর সরাসরি প্রভাবও রয়েছে। তাত্ক্ষণিক এই ঝুঁকিগুলো ছাড়াও বন্যা নিরাপদ পানি সরবরাহের বাধাগ্রস্ত করে এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা শিশুদের সুস্থতাকে বিপদের মুখে ফেলে, বিশেষ করে যদি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব থাকে বা তা অপর্যাপ্ত হয়। এছাড়া বন্যা অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়, যা প্রয়োজনীয় স্থানে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানোকে কঠিন করে তোলে।

###

সম্পাদকদের জন্য নোট:

নেপালে ইউনিসেফের জরুরি ত্রাণ সরবরাহ প্রচেষ্টা কার্যক্রম শুরু এবং তা জোরদার করা অব্যাহত রাখতে সংস্থাটি সরকারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে সহ-নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে। জরুরি এই পরিস্থিতি মোকাবেলার অংশ হিসেবে ইউনিসেফ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ), স্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষা বিষয়ক পূর্ব নির্ধারিত উপকরণের চালান পাঠিয়েছে। বিতরণ করা উপকরণসমূহের মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ২০০ অ্যাকুয়া ট্যাবলেট বা পানি পরিশোধক ক্লোরিন ট্যাবলেট (৩৫ মিগ্রা), ২৮৪টি বালতি, ২৮৪ গ্যালন জ্বালানি তেল (জেরি ক্যান), ২৮৪টি পরিচ্ছন্নতার উপকরণ, ৮০০টি তেরপল ও ৩ ইন্টারএজেন্সি জরুরি স্বাস্থ্য কিট (আইইএইচকে)। একটি কিট ব্যবহার করতে পারে ১০ হাজার মানুষ।

বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যায় মানুষ, তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের কার্যক্রমে সহায়তা প্রদানে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে ইউনিসেফ। দূষিত নলকূপগুলোকে দূষণমুক্ত করার প্রচেষ্টায় ইউনিসেফের অবস্থান সর্বাগ্রে। প্রাথমিকভাবে ইউনিসেফ সরকারের সঙ্গে মজুদ করা ২৫ লাখ পানির পরিশোধন ট্যাবলেট (ডব্লিউপিটি) বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহে বিতরণ করতে শুরু করে। সরকারের বর্ধিত চাহিদা ও প্রয়োজনের নিরিখে ইউনিসেফ অতিরিক্ত ৫০ লাখ ডব্লিউপিটি সরবরাহ করেছে। ইউনিসেফ ও এর সহযোগীরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চলীয় ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে পরিচ্ছন্নতার উপকরণ, জ্বালানি তেলের গ্যালন (জেরি ক্যান) ও ব্লিচিং পাউডারও বিতরণ করছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী লোকেদের জন্যই উদ্বেগ বেশি, যারা পানিবেষ্ঠিত হয়ে আটকে আছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের অনেকের কাছে এখনও কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে, যেখানে গত সপ্তাহের ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তা মেরামতেই এখন জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বন্যার হুমকি কমে এলেও বাংলাদেশের অন্যত্র এক্ষেত্রে বিপদ কোনোভাবেই কমেনি। বন্যার পানির স্তর নেমে যাওয়া মাত্রই যেসব শিশুর পড়াশোনা বিঘ্নিত হয়েছে তাদের জন্য সুরক্ষামূলক পরিবেশে জরুরি স্কুলের ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশের জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করবে ইউনিসেফ। এছাড়াও ইউনিসফ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য জরুরি সুবিধা সংবলিত অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র ও স্কুল গড়ে তুলছে। এই সংস্থা ও এর সহযোগীরা নৌকার ব্যবস্থা করছে যাতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা স্কুলে যাতায়াত করতে পারে।

ভারতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তিন রাজ্য– আসাম, বিহার ও উত্তর প্রদেশে বহুমুখী পরিকল্পনা ও সমন্বয় সহায়তা প্রদানে রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ।

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

ফারিয়া সেলিম

ইউনিসেফ বাংলাদেশ

টেলিফোন: +8801817 586096

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি

শিশুদের জন্য ইউনিসেফের জলবায়ু বিষয়ক কার্যক্রম সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে এখানে

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার

 

ইউনিসেফকে আরও জানুন