বিশ্বে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একটি শিশুর মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়

অন্যান্য সংক্রমণের তুলনায় প্রতিরোধযোগ্য নিউমোনিয়ায় অধিক সংখ্যক শিশুর মৃত্যু হয়

13 নভেম্বর 2019
নিমোনিয়া মানচিত্র
ইউনিসেফ

ঢাকা/লন্ডন/নিউইয়র্ক/বার্সেলোনা (নভেম্বর ১২, ২০১৯) নতুন একটি বিশ্লেষণ অনুসারে, গত বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ৮ লাখেরও বেশি শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়, অর্থাৎ প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে মৃত্যু হয় একটি শিশুর।

দুই বছরের কম বয়সী যত শিশু মারা গেছে তাদের বেশিরভাগই জীবনের প্রথম মাসেই মৃত্যুবরণ করেছে।[1]

ছড়িয়ে পড়া এই মহামারী সম্পর্কে সতর্ক করে স্বাস্থ্য ও শিশু বিষয়ক ছয়টি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা বৈশ্বিক পদক্ষেপের জন্য আজ আবেদন শুরু করছে। [2]

এই গ্রুপটি আগামী জানুয়ারিতে স্পেনে শৈশবকালীন নিউমোনিয়ার বৈশ্বিক ফোরাম-এ বিশ্ব নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন:

নিরাময়যোগ্য এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিউমোনিয়াতে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২২শ' শিশু মারা যায়। এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জোরালো বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি এবং বাড়তি বিনিয়োগ জরুরী। যেখানে শিশুরা আছে সেখানে কেবলমাত্র সাশ্রয়ী সুরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই আমরা সত্যিকারভাবে লাখ জীবন বাঁচাতে সক্ষম হবো।

chart

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের কারণে নিউমোনিয়া হয় এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ফুসফুস পুঁজ ও তরলে ভরে ওঠায় তাদের শ্বাস নেওয়ার জন্য রীতিমতো লড়াই করতে হয়।

২০১৮ সালে অন্য যে কোনো রোগের তুলনায় এই রোগে অনেক বেশি সংখ্যক পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়। ওই বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪ লাখ ৩৭ হাজার শিশু ডায়রিয়ার এবং ২ লাখ ৭২ হাজার শিশু ম্যালেরিয়ায় মারা যায়।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রধান নির্বাহী কেভিন ওয়াটকিনস বলেন:

এটি একটি বিসৃত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য মহামারী, যা মোকাবেলায় বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। টিকা, সাশ্রয়ী অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত অক্সিজেন-চিকিৎসার অভাবে লাখ শিশু মারা যাচ্ছে। নিউমোনিয়া সংকট হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অবহেলা ও অসমর্থনীয় বৈষম্যের লক্ষণ।

নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশুর মৃত্যুর জন্য পাঁচটি দেশ দায়ী। দেশগুলো হলো, নাইজেরিয়া (১ লাখ ৬২ হাজার), ভারত (১ লাখ ২৭ হাজার), পাকিস্তান (৫৮ হাজার), গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (৪০ হাজার) ও ইথিওপিয়া (৩২ হাজার)।[3]

এইচআইভির মতো অন্যান্য সংক্রমণ বা অপুষ্টির কারণে যেসব শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং যেসব শিশু উচ্চমাত্রার বায়ু দূষণ ও অনিরাপদ পানির এলাকায় বসবাস করে তারা অনেক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই রোগটি টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং সঠিকভাবে নির্ণয় করা গেলে স্বল্প ব্যয়ের অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সহজেই চিকিৎসা করা যায়।

কিন্তু কোটি শিশুকে এখনও টিকা দেওয়া হচ্ছে না – এবং প্রতি তিনটি শিশুর একটির মধ্যে লক্ষণগুলো উপস্থিত থাকলেও তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পায় না। [4]

মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অক্সিজেন-চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে, যা দরিদ্রতম দেশগুলোতে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের কমবয়সী ১২ হাজারেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় একজনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে মৃত্যুবরণ করা শিশুদের ১৩ শতাংশেরই মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়।

২০১৯ সালে পাঁচ বছরের কমবয়সীদের মৃত্যুহার প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মগ্রহণ করা শিশুর মধ্যে ৪০। বৈষম্য, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অভাবে ২০১৯ সালে দরিদ্রতম পরিবারগুলোতে যেখানে প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মগ্রহণ করা শিশুর মধ্যে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়, সেখানে ধনীতম পরিবারগুলোতে প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মগ্রহণকারী শিশুর মধ্যে মৃত্যু হয় মাত্র ২৮ জনের।

যদিও বাংলাদেশে এক বছর বয়সী শিশুদের ৯৭ শতাংশেরও বেশি পিভিসি৩ (PVC3), ডিটিপি৩ ( DTP3) ও এইআইবি৩ (Hib3)-এর আওতাভুক্ত, তারপরও দেশটি ২০১৬ সালে তার জনগণের প্রত্যেকের স্বাস্থ্যসেবার পেছনে মাত্র ৬ ডলার করে খরচ করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সর্বনিম্ন সীমা ৮৬ ডলারের চেয়ে অনেক কম।[5]

ভ্যাক্সিন অ্যালায়েন্স জিএভিআই-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সেথ বার্কলে বলেন:

এই প্রতিরোধযোগ্য, নিরাময়যোগ্য এবং সহজ-নির্ণয় সক্ষম রোগটিই যে এখনও বিশ্বে ছোট শিশুদের সবচেয়ে বড় ঘাতক হিসেবে রয়ে গেছে, সেটা সত্যিই অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা গত দশকে দারুণ অগ্রগতি অর্জন করেছি, বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর লাখ শিশু এখন জীবনদায়ী নিউমোকোকাল টিকা পাচ্ছে। জিএভিআই’র সহায়তায় স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে নিউমোকোকাল টিকার আওতা এখন বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি, তবে প্রতিটি শিশু যাতে জীবনদানকারী এই টিকা গ্রহণের সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও আমাদের অনেক কাজ বাকি।”

নিউমোনিয়া মোকাবেলা করার জন্য যে তহবিল পাওয়া গেছে তা অন্যান্য রোগের তুলনায় অনেক কম। যদিও বর্তমানে বিশ্বে মৃত্যুবরণ করা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১৫ শতাংশই নিউমোনিয়ায় মারা যায়, তা সত্ত্বেও বৈশ্বিকভাবে সংক্রমণজনিত রোগ নিয়ে গবেষণা ব্যয়ের মাত্র ৩ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয় নিউমোনিয়া গবেষণার জন্য।

এভরি ব্রেথ কাউন্টসের সমন্বয়ক লিথ গ্রিনস্লেড বলেন:

কয়েক দশক ধরে শিশুদের শীর্ষস্থানীয় ঘাতক হচ্ছে এ উপেক্ষিত রোগ এবং বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুরা এর মাশুল দিয়েছে। নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং এই শিশুদের বাঁচানোর জন্য সরকার, জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলোর সম্মিলিতভাবে কাজ করার সময় এসেছে।

এই সংস্থাগুলো যৌথভাবে নিম্নলিলখিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়:

  • সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সরকারের প্রতি, যাতে তারা নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু কমাতে নিউমোনিয়া নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে; এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবার জন্য একটি বিস্তৃত কৌশলের অংশ হিসেবে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তির সুবিধা উন্নত করে;
  • ধনী দেশসমূহ, আন্তর্জাতিক দাতা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি, যাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ টিকাগুলোর ব্যয় কমিয়ে এবং ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স জিএভিআই-এর ঘাটতি সফলতার সঙ্গে পূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে টিকাদানের পরিধি বাড়ায়; এবং নিউমোনিয়া মোকাবেলায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য তহবিল বাড়ায়

--সমাপ্ত--

কনটেন্ট ও কেস স্টাডিগুলো পাওয়া যাবে এখানে। 

সম্পাদকদের জন্য নোট:

[১] ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে তৈরি করা ডব্লিউএইও এবং মেটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড এপিডেমিওলজি এস্টিমেশন গ্রুপের (এমসিইই) অন্তবর্তীকালীন হিসাবের ওপর ভিত্তি করে ইউনিসেফের এই বিশ্লেষণ

[২] আইএসগ্লোবাল, সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ, এভরি ব্রেথ কাউন্টস, ইউনিটএইড ও ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স জিএভিআই যৌথভাবে নিউমোনিয়া মোকাবেলার জন্য উচ্চ প্রাদুর্ভাবের দেশ ও আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। লা কাইশা ফাউন্ডেশন, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন ও ইউএসএইডের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে এই গ্রুপটি আগামী ২৯-৩১ জানুয়ারি স্পেনে শৈশবকালীন নিউমোনিয়া বিষয়ক বৈশ্বিক ফোরাম-এর আয়োজন করবে।

[৩] ২০১৮ সালে নিউমোনিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষ ১৫টি দেশ হচ্ছে:

দেশের নাম

২০১৮ সালে নিউমোনিয়াকারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর সংখ্যা

নাইজেরিয়া

১৬২,০০০

ভারত

১২৭,০০০

পাকিস্তান

৫৮,০০০

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী কঙ্গো

৪০,০০০

ইথিওপিয়া

৩২,০০০

ইন্দোনেশিয়া

১৯,০০০

চীন

১৮,০০০

চাদ

১৮,০০০

অ্যাঙ্গোলা

১৬,০০০

সংযুক্ত প্রজাতন্ত্রী তানজানিয়া

১৫,০০০

সোমালিয়া

১৫,০০০

নাইজার

১৩,০০০

মালি

১৩,০০০

বাংলাদেশ

১২,০০০

সুদান

১১,০০০

বৈশ্বিক

৮০২,০০০

সূত্র: ডব্লিউএইও এবং মেটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড এপিডেমিওলজি এস্টিমেশন গ্রুপের (এমসিইই) অন্তবর্তীকালীন হিসাবের ওপর ভিত্তি করে ইউনিসেফের বিশ্লেষণ

[৪] ২০১৮ সালে ৭ কোটি ১০ লাখ শিশু সুপারিশকৃত তিন ডোজ নিউমোকোক্যাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (পিসিভি) গ্রহণ করেনি, যা তাদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে ফেলেছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এমনটা ধারণা করার পরও বৈশ্বিকভাবে ৩২ শতাংশ শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয় না। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর দরিদ্রতম শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে।

[৫] ফাইটিং ফর ব্রেথ ইন বাংলাদেশ, সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ, এভরি ব্রেথ কাউন্টস কোয়ালিশন, ২০১৯

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

রুয়াইরিধ ভিল্লার

সেভ দ্য চিলড্রেন (লন্ডন)

টেলিফোন: +44(0)2070126841

টেলিফোন: +44(0)7831650409

সাবরিনা সিধু

ইউনিসেফ (নিউইয়র্ক)

টেলিফোন: +19174761537

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার