বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর অর্ধেকেই প্রাথমিক পরিচ্ছন্নতা সেবা নেই – ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ

স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে নতুন এক বৈশ্বিক হিসাব রোগী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মাঝে রোগের বিস্তার ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলে ধরেছে

30 আগস্ট 2022
In Bangladesh, only 38 per cent of health care facilities had basic hygiene services, with significant differences between government and non-government facilities.
UNICEF/UN0391027/Himu

জেনেভা/নিউইয়র্ক/ঢাকা, ৩০ আগস্ট ২০২২ ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের সর্বশেষ জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রামের (জেএমপি) প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বব্যাপী অর্ধেক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে, যেখানে রোগীরা সেবা গ্রহণ করে সেখানে এবং টয়লেটে, পানি ও সাবানসহ প্রাথমিক পরিচ্ছন্নতা সেবা বা অ্যালকোহল-ভিত্তিক হাত পরিষ্কারক সামগ্রীর অভাব রয়েছে। প্রায় ৩৮৫ কোটি মানুষ এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করে, যেখানে তারা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। এদের মধ্যে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এমন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে সেবা গ্রহণ করে যেখানে কোনো ধরনের পরিচ্ছন্নতা সেবাই থাকে না।

ডব্লিউএইচওর পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ড. মারিয়া নেইরা বলেন, “স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পরিচ্ছন্নতা সেবা এবং তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো আপোষ হতে পারে না। মহামারী থেকে ঘুরে দাঁড়াতে, প্রতিরোধ ও প্রস্তুতির জন্য এগুলোর উন্নয়ন করা অপরিহার্য। অর্থাৎ নিরাপদ পানি, পরিষ্কার টয়লেট এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ওপর বিনিয়োগ ব্যাতীত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো নিরাপদ করা যাবে না। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) পরিষেবাগুলোকে জোরদার করার জন্য ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের সভায় সদস্য দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করতে এবং এই প্রচেষ্টাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে আমি আহ্বান করি।”

“প্রগ্রেস অন ওয়াশ ইন হেল্‌থ কেয়ার ফ্যাসিলিটিস ২০০০-২০২১:  স্পেশাল ফোকাস অন ওয়াশ এন্ড ইনফেকশন প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোল” শীর্ষক প্রতিবেদনটি, যা পরিচর্যার কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি টয়লেট ব্যবহারের সুযোগের বিষয়টি মূল্যায়ন করে, প্রথমবারের মতো পরিচ্ছন্নতা পরিষেবাগুলোর বিষয়ে এই বৈশ্বিক ভিত্তিরেখা তৈরি করেছে কেননা আগের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক দেশ তাদের হাসপাতাল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওয়াশ পরিষেবার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধির ক্ষেত্রে বর্তমানে ৪০টি দেশের উপাত্ত পাওয়া গেছে, যে দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে ২০২০ সালের ২১টি দেশ ও ২০১৯ সালের ১৪ দেশের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

নতুন এই বৈশ্বিক হিসাব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি পরিস্থিতির আরও স্বচ্ছ ও উদ্বেগজনক একটি চিত্র প্রকাশ করে। ৬৮ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সেবা প্রদানের স্থানে স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা এবং ৬৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের টয়লেটে পানি ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুবিধা ছিল। তবে মাত্র ৫১ শতাংশ কেন্দ্রে উভয় সুবিধাই ছিল এবং কার্যত এই কেন্দ্রগুলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবার মানদণ্ড পূরণ করে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী প্রতি ১১টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মধ্যে ১টিতে (৯ শতাংশ) উল্লেখিত দুটি সুবিধার কোনোটিই নেই।

বাংলাদেশে মাত্র ৩৮ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কেন্দ্রের ধরনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে: সরকারি কেন্দ্রগুলোর ৩২ শতাংশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবা ছিল, যেখানে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ৬৯ শতাংশে এই সুবিধা ছিল। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভৌগোলিক বৈষম্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ গ্রামীণ এলাকার (৬৭ শতাংশ) তুলনায় শহরাঞ্চলে (৯০ শতাংশ) বেশি।

ইউনিসেফের ওয়াশ ও ক্লাইমেট, এনভায়রনমেন্ট, এনারজি এন্ড ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন (সিইইডি) বিভাগের পরিচালক কেলি অ্যান নেইলর বলেন, “যদি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা স্বাস্থ্যবিধি মানার সুযোগ না পায়, তবে সেক্ষেত্রে রোগীরাই ভুক্তভোগী  হয়। নিরাপদ পানি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি ও স্যানিটেশন পরিষেবাবিহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো গর্ভবতী মা, নবজাতক ও শিশুদের জন্য একটি সম্ভাব্য মৃত্যু ফাঁদ। প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার নবজাতক সেপসিসের কারণে প্রাণ হারায়। এটি মর্মান্তিক কারণ এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য।”

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দূষিত হাত ও পরিবেশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে জীবাণুর সংক্রমণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের ছড়িয়ে পড়ায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। পানি ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ভিত্তিতে পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা মানসম্পন্ন যত্ন প্রদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে নিরাপদ প্রসবের জন্য।

আয়ের সীমার ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে ওয়াশ সুবিধার প্রাপ্যতা এখনও সমান নয়:

  • সাব-সাহারান আফ্রিকার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবায় পিছিয়ে আছে। যদিও এই অঞ্চলে সামগ্রিকভাবে তিন-চতুর্থাংশ (৭৩ শতাংশ) স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সেবা প্রাপ্তির স্থানে অ্যালকোহল-ভিত্তিক হ্যান্ড রাব বা পানি ও সাবান রয়েছে, তবে মাত্র এক তৃতীয়াংশ (৩৭ শতাংশ) কেন্দ্রের টয়লেটে পানি ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুবিধা রয়েছে। বেশির ভাগ হাসপাতালের (৮৭ শতাংশ) সেবা প্রাপ্তির স্থানে হাত পরিষ্কারের সুবিধা রয়েছে, যেখানে ৬৮ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এই সুবিধা রয়েছে।

  • স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে মাত্র ৫৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সবার জন্য সুরক্ষিত পানির ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিকভাবে ৭৮ শতাংশ কেন্দ্রে এই সুবিধা রয়েছে, যেখানে হাসপাতালগুলোর অবস্থা (৮৮ শতাংশ) ছোট আকারের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর (৭৭ শতাংশ) চেয়ে ভালো এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই হার ৯০ শতাংশ। বৈশ্বিকভাবে শহর এলাকায় প্রায় ৩ শতাংশ এবং গ্রামীণ এলাকার ১১ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পানির ব্যবস্থা নেই।

  • তথ্য পাওয়া গেছে– এমন দেশগুলোর মধ্যে, বৈশ্বিকভাবে প্রতি ১০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ১টিতে কোনো স্যানিটেশন পরিষেবা নেই। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কোনো স্যানিটেশন পরিষেবা না থাকার অনুপাত লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৩ শতাংশ থেকে সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত। স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে, প্রতি ৫টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাত্র ১টিতে (২১ শতাংশ) প্রাথমিক স্যানিটেশন পরিষেবা রয়েছে।

  • তথ্য আরও তুলে ধরে যে, অনেক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রাথমিক স্তরের পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসেবা বর্জ্যের নিরাপদ পৃথকীকরণ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থার নেই।

সুইডেনের স্টকহোমে চলমান “বিশ্ব পানি সপ্তাহে” প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হচ্ছে। ২৩ আগস্ট শুরু হওয়া বার্ষিক এই সম্মেলন ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে, যেখানে মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার নতুন উপায় অনুসন্ধান করা হচ্ছে, যেসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে কৃষি, প্রযুক্তি, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু অন্তর্ভুক্ত।

###

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

সারা আলহাত্তাব
ইউনিসেফ নিউইয়র্ক
টেলিফোন: +1 917 957 6536
ই-মেইল: salhattab@unicef.org
ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817586096
ই-মেইল: fselim@unicef.org

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্পর্কিত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের কার্যপরিধির ভেতরে থেকেই জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বৈশ্বিকভাবে নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ডব্লিউএইচও সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি তুলে ধরতে, বিশ্বকে নিরাপদ রাখতে এবং সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানে ছয়টি অঞ্চলজুড়ে দেড় শতাধিক কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৯৪টি সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে। ২০১৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আরও ১০০ কোটি মানুষকে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা, আরও ১০০ কোটি মানুষকে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা থেকে রক্ষা করা এবং আরও ১০০ কোটি মানুষকে আরও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা ও ভালো রাখা নিশ্চিত করা।

করোনাভাইরাস থেকে আপনার নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে কোভিড-১৯ এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সর্বশেষ পরামর্শের জন্য ভিজিট করুন: www.who.int এবং ডব্লিউএইচওকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook, Instagram, LinkedIn, TikTok, Pinterest, SnapchatYouTube-এ।

 

ইউনিসেফ সম্পর্কিত

বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে বিশ্বের কঠিনতম কিছু স্থানে কাজ করে ইউনিসেফ। ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব শিশুর জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে আমরা কাজ করি।

ইউনিসেফ এবং শিশুদের জন্য এর কাজ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org.

ইউনিসেফকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook, InstagramYouTube-এ।