বিশ্বজুড়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি, বলছে ইউনিসেফের সবচেয়ে ব্যাপক পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ

ইউনিসেফের নতুন প্রতিবেদন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ সামগ্রিক কল্যাণের বিভিন্ন সূচকে বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন শারীরিকভাবে অক্ষম শিশু যে বঞ্চনার শিকার হয় তার গভীরতা তুলে ধরেছে।

10 নভেম্বর 2021
A girl with visual disability typing on a keyboard
ইউনিসেফ/ইউএন০৫৪৭৪৮৮/মাওয়া
ভোলার চরফ্যাশনের নীলকমল ইউনিয়নের দশম শ্রেণির ছাত্রী ১৭ বছর বয়সী নুপুর নিয়মিত কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যায় এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। শারীরিকভাবে একাধিক অক্ষমতা থাকা শিশুদের মাঝে স্কুলে না যাওয়ার হার বেশি এবং শারীরিক অক্ষমতার প্রবলতা বিবেচনায় নেওয়া হলে বৈষম্যের মাত্রা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিলক্ষিত হয়।

নিউইয়র্ক, ১০ নভেম্বর ২০২১ – ইউনিসেফের নতুন এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুর সামগ্রিক কল্যাণ বিষয়ক বেশিরভাগ সূচকে শারীরিকভাবে অক্ষম নয়- এমন শিশুদের তুলনায় শারীরিকভাবে অক্ষম শিশুরা অপেক্ষাকৃত বেশি সুবিধাবঞ্চিত।

এ বিষয়ে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই যা জানি এই নতুন গবেষণা সেটিকে নিশ্চিত করেছে যে, শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরা তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে একাধিক এবং প্রায়শই জটিল বাধার সম্মুখীন হয়। পড়াশোনা করার সুযোগ থেকে শুরু করে বাড়িতে তাকে পড়ানো পর্যন্ত, শারীরিকভাবে অক্ষম শিশুদের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি বা জানার সুযোগ প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম। তাই প্রায়শই, শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরা সহজেই পিছিয়ে পড়ে।”

প্রতিবেদনে ৪২টি দেশের আন্তর্জাতিকভাবে তুলনীয় উপাত্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এতে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা, সহিংসতা ও শোষণ থেকে সুরক্ষা এবং শিক্ষা পর্যন্ত শিশুদের সার্বিক মঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্কিত ৬০টিরও বেশি সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এসব সূচক কার্যকরী অসুবিধার ধরন ও তীব্রতা, শিশুর লিঙ্গ, অর্থনৈতিক অবস্থা ও দেশ দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণ করতে যেসব বাধার সম্মুখীন হয় এবং এগুলো কীভাবে প্রায়শই তাদের জন্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিণতি বয়ে আনে তা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী নয় এমন শিশুদের তুলনায় শারীরিকভাবে অক্ষম শিশুদের:

  • প্রারম্ভিক উদ্দীপনা ও সহানুভূতিশীল সেবা পাওয়ার সম্ভাবনা ২৪ শতাংশ কম;
  • প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা ও গুণতে শেখার দক্ষতা অর্জনের সম্ভাবনা ৪২ শতাংশ কম;
  • শীর্ণকায় হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ বেশি এবং খর্বকায় হওয়ার সম্ভাবনা ৩৪ শতাংশ বেশি;
  • তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫৩ শতাংশ বেশি;
  • কখনোই বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়ার সম্ভাবনা ৪৯ শতাংশ বেশি;
  • প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে না পারার সম্ভাবনা ৪৭ শতাংশ বেশি, নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে না পারার সম্ভাবনা ৩৩ শতাংশ বেশি এবং উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে না পারার সম্ভাবনা ২৭ শতাংশ বেশি;
  • অসুখী বোধ করার সম্ভাবনা ৫১ শতাংশ বেশি;
  • বৈষম্যের শিকার হচ্ছে – এরকম মনে করার সম্ভাবনা ৪১ শতাংশ বেশি;
  • কঠিন শারীরিক শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা ৩২ শতাংশ বেশি।

অবশ্য শারীরিক প্রতিবন্ধীদের অভিজ্ঞতায় ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। বিশ্লেষণটি দেখায় যে, শারীরিক অক্ষমতার ধরনের ওপর নির্ভর করে শিশুদের বসবাসের স্থান এবং তাদের সেবা প্রাপ্তির ধরনে ব্যাপক ঝুঁকি ও নেতিবাচক ফল লক্ষ্য করা যায়। এটি বৈষম্য মোকাবিলায় লক্ষ্যকেন্দ্রিক সমাধান খুঁজে বের করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

প্রতিবেদনে উঠে আসা বেশ কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ একটি। শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে সবপক্ষের ব্যাপক সম্মতি সত্ত্বেও শারীরিকভাবে অক্ষম শিশুরা এখনো পিছিয়ে থাকছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যোগাযোগ করতে এবং নিজেদের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হয়– এমন শিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, তা সেটা শিক্ষার যে পর্যায়েই হোক। একাধিক শারীরিক অক্ষমতা থাকা শিশুদের মাঝে বিদ্যালয়ে যেতে না পারার হার আরও বেশি এবং শারীরিক অক্ষমতার প্রবলতা বিবেচনায় নিলে বৈষম্যের মাত্রাও তীব্র।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য ইউনিসেফের ইয়ুথ অ্যাডভোকেট বুলগেরিয়ার ২০ বছর বয়সী মারিয়া আলেক্সান্দ্রোভা বলেন, “অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাকে বিলাসিতা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের এমনভাবে সামাজিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে যেটা কোনো শিশুর ক্ষেত্রেই হওয়া উচিত নয়। শারীরিক প্রতিবন্ধী একজন নারী হিসেবে আমার জীবনের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে। এটা খেয়াল রাখতে হবে যে, কোনো শিশু, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুরা যাতে তাদের মৌলিক মানবাধিকারের জন্য একা লড়াই না করে। শারীরিকভাবে অক্ষম শিশুরা যাতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সমান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করতে আমাদের সরকার,অংশীজন ও এনজিওগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।”

ইউনিসেফ শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার আদায়ে সহায়তা করতে বৈশ্বিক ও স্থানীয় পর্যায়ে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে। শিশুদের জীবনকে প্রভাবিত করে– এমন যে কোনো বিষয়ে শারীরিকভাবে অক্ষম শিশুসহ সব শিশুর অবশ্যই মতামত থাকতে হবে এবং শিশুদের মাঝে থাকা সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে এবং তাদের অধিকার আদায় করার সুযোগ প্রদান করতে হবে। ইউনিসেফ সব দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে:

  • শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের সমান সুযোগ প্রদান করুন। শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের সমাজ থেকে আলাদা করে দেয়– এমন শারীরিক, যোগাযোগগত এবং আচরণগত বাধা দূর করতে সরকারকে অবশ্যই শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে হবে এবং জন্ম নিবন্ধন; অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পানি সেবা; সমতাভিত্তিক শিক্ষা; এবং সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহারের সুযোগ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের অবশ্যই কমিউনিটিতে বিদ্যমান সামাজিক নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা ও বৈষম্য দূর করতে কাজ করতে হবে।

  • শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিষেবা এবং সমতাভিত্তিক মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের সময় শিশু ও তাদের পরিবারের সুনির্দিষ্ট চাহিদার পাশাপাশি শারীরিক অক্ষমতার বিস্তার বিবেচনায় নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে সহানুভূতিশীল যত্ন ও পরিবার-বান্ধব নীতিমালা, মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা এবং শোষণ ও অবহেলা থেকে সুরক্ষা।

শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের যাতে বাদ দেওয়া না হয়, তাদের সঙ্গে যাতে পরামর্শ করা হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যাতে তাদের মতামত যাতে বিবেচনায় নেওয়া হয় তা নিশ্চিত করতে বিশ্লেষণটি বিশ্বব্যাপী তাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জনের অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর উপায় সন্ধান করে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের সংখ্যার নতুন বৈশ্বিক হিসাব পূর্ববর্তী হিসাবের চেয়ে বেশি এবং এই হিসাব শারীরিক অক্ষমতার আরও অর্থপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিষয়গুলো মাথায় রেখে করা হয়েছে, যা উদ্বেগ ও হতাশার লক্ষণের পাশাপাশি কার্যকারিতার পথে বাধাগুলো বিবেচনায় নেয়।

ফোর বলেন, “বাদ পড়া প্রায়শই অদৃশ্যতার পরিণতি। দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধী  শিশুদের সংখ্যা সম্পর্কে আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত ছিল না। যখন আমরা এই শিশুদের গণনার মধ্যে নিতে, তাদের সমস্যা বিবেচনায় নিতে এবং তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে ব্যর্থ হই, তখন আমরা তাদের মাঝে থাকা বিশাল সম্ভাবনার বিকাশেও ব্যর্থ হই।”

###

সম্পাদকদের জন্য নোট:

উচ্চ রেজ্যুলেশনের সংস্করণটি ডাউনলোড করুন এখান থেকে

মাল্টিমিডিয়া উপকরণ পাওয়া যাবে এখানে

সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি পাওয়া যাবে এখানে

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

টেস ইনগ্রাম
ইউনিসেফ নিউ ইয়র্ক
টেলিফোন: +1 347 593 2593
ই-মেইল: tingram@unicef.org
ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817586096
ই-মেইল: fselim@unicef.org

ইউনিসেফ সম্পর্কে

বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে বিশ্বের কঠিনতম কিছু স্থানে কাজ করে ইউনিসেফ। ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব, শিশুর জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে আমরা কাজ করি।

ইউনিসেফ এবং এর কাজ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org

ইউনিসেফকে অনুসরণ করুন TwitterFacebookInstagramYouTube-এ।