নতুন স্কুল বছর শুরু হওয়ায় বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরগুলোয় থাকা ১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু স্কুলে ফিরেছে

24 জানুয়ারি 2019
রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়া
UNICEF Bangladesh/2018/Sokol

কক্সবাজার, বাংলাদেশ, ২৪ জানুয়ারি ২০১৯ – নতুন স্কুল বছর শুরু হওয়ায় বাংলাদেশে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসরত ১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু এখন ইউনিসেফের সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে।

মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা শিশুদের শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ প্রদানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১ হাজার ৬০০টি শিক্ষা কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কমিউনিটির ব্যাপক প্রচেষ্টার পর, এখন শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত আরও হাজার হাজার শিশুর শিক্ষাগ্রহণের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।

লক্ষ্য হচ্ছে ৫ হাজার শিক্ষক ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী পরিচালিত আড়াই হাজার শিক্ষা কেন্দ্রের বর্ধিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এবছর শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৬০ হাজার শিশুকে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ দেওয়া।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডুয়ার্ড বেগবেদার বলেন,'রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের যে মাত্রা তাতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা শুধু জরুরি চাহিদাগুলো মেটানোর প্রতি নজর দিতে সক্ষম হই এবং প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারিনি।  প্রতিটি শিশু যে শিক্ষাগ্রহণ করছে তার মান বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি এবছর আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংখ্যক শিশুর কাছে পৌঁছাতে আমাদের সেবাগুলো জোরদার করছি।'

আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসরত শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ইউনিসেফ সুদূর প্রসারিত ও বিস্তৃত একগুচ্ছ উদ্যোগের যে ঘোষণা দিয়েছে, আরও শিক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের এই প্রচেষ্টা তারই অংশ।

মিয়ানমারে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা ১১ বছর বয়সী মিনারা বাংলাদেশে আসার পর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ যেসব শিক্ষা কেন্দ্রে সে যেত সেগুলো ছিল কর্দমাক্ত এবং সেখানে প্রচণ্ড গরম লাগতো। মিনারা বলে,'আমি এখন প্রায় এক মাস ধরে ক্লাস করছি।'

কুতুপালং ক্যাম্পে ইউনিসেফের সহযোগী 'কোডেক' পরিচালিত নিজের নতুন শ্রেণিকক্ষটি ভালো করে দেখে সে বলে,'এটা অনেক ভালো। এখানে মেঝেতে কাদা নেই।'

১২ বছর বয়সী মোতালেব অন্ধ।  স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া শারীরিকভাবে অক্ষম প্রায় ৬০০ শিশুর একজন সে। গত বছর তার শিক্ষক তাকে ক্লাসে যাওয়ার অনুমতি দিতে তার মাকে রাজি করায়। ক্লাসে ফেরার পর থেকে তার মানসিক অবস্থা বেশ ভালো হয়েছে। সে অনেক বেশি বহির্মুখী এবং তার কবিতা ভালো লাগে।

বিস্তৃত শিক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার মানও বাড়ানো হচ্ছে। নতুন ও বিদ্যমান শিক্ষকরা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অংশগ্রহণ করছেন।

ইউনিসেফ কক্সবাজারের শিক্ষা কর্মকর্তা ইফফাত ফারহানা বলেন, 'বন্দুকের গুলিতে ক্ষত ও চরম সহিংসতা থেকে অনেক শিশু মানসিক প্রচণ্ড আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে, যা তাদের চলাফেরা ও সেবা গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা অনেক শিশুর মাঝে মিশ্র শিক্ষার দক্ষতা, শারীরিক অক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তির বৈকল্য ও কথা বলতে সমস্যা হওয়ার মতো বিষয়গুলো দেখি। এই শিশুদের প্রত্যেকের শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।  ইউনিসেফ আশা করছে,আরও বেশি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন ও শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ, বেড়ে ওঠা এবং নিজেদের সম্ভাবনা বুঝতে সহায়তা করতে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছা যাবে।

এছাড়া কিশোর-কিশোরীদের জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে ইউনিসেফ।

বর্তমানে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের ৯৭ শতাংশই কোনো ধরনের শিক্ষা পায় না। এই বয়সী গ্রুপটি অনেক বেশি মাত্রায় শিশুবিয়ে, শিশুশ্রম, মানবপাচার, শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে।

গত বছর প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, জরুরি পদক্ষেপ ছাড়া কিশোর-কিশোরীরা 'হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে' পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

বেগবেদার বলেন, 'এই ধরনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকেন্দ্রিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইউনিসেফ সেইসব শিশুকে শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করছে, যাদের কাছে পৌঁছানো সবচেয়ে কঠিন এবং যাদের অনেকেই মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।  আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই শিশুরা যাতে তাদের ভবিষ্যতকে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করা।'

 

সম্পাদকদের জন্য নোট:

এক হিসাব অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ লাখ শিশু আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বসবাস করছে, যাদের মধ্যে ৩ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩ লাখ।

২০১৭ সালের শেষ দিকে মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে, শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে উন্নীত করেছে।

ইউনিসেফ ও জাতিসংঘের অন্য সংস্থা এবং এনজিওগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শিক্ষাগত সেবা প্রদানকারী কেন্দ্রগুলোকে 'শিক্ষা কেন্দ্র' হিসেবে অভিহিত করে।

২০১৮ সালের আগস্টে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা কিশোর-কিশোরীরা 'হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে' পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে আরও বলা হয়, বিশেষ করে কিশোরীদের নিয়ে উদ্বেগ অনেক বেশি।

আশ্রয়কেন্দ্রে গড়ে তোলা শ্রেণিকক্ষে রোহিঙ্গা শিশুরা ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষা শেখার পাশাপাশি প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞান, সংখ্যা গণনা ও জীবন বাঁচানো দক্ষতাসমূহ শিখে। 

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

জ্যা-জ্যাক সিমন

ইউনিসেফ বাংলাদেশ

টেলিফোন: +8801713 043478

ফারিয়া সেলিম

ইউনিসেফ বাংলাদেশ

টেলিফোন: +8801817 586096

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার

 

ইউনিসেফকে আরও জানুন