জলবায়ু সংকটজনিত প্রভাবের শিকার হওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের শিশু - ইউনিসেফ

এ ধরনের প্রথম এই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের শিশুরা তাপপ্রবাহ ও বন্যার মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির ক্ষেত্রে অত্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে

20 আগস্ট 2021
Flood in Bangladesh
UNICEF/UN0328140/Kiron

কাঠমান্ডু/ঢাকা ২০ আগস্ট ২০২১আজ প্রকাশিত ইউনিসেফের নতুন এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বসবাসকারী শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, যা তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এছাড়াও বৈশ্বিক পর্যায়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৫টি দেশের মধ্যে রয়েছে নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।

“জলবায়ু সংকট কার্যত শিশু অধিকারের সংকট: শিশুদের জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিসিআরআই) প্রবর্তন” শীর্ষক প্রতিবেদনের এই সূচকটি ইউনিসেফের প্রথম শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক। শিশুদের ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ু ও পরিবেশগত আঘাতের সম্মুখীন হওয়ার বিষয়টির পাশাপাশি তাদের অপরিহার্য পরিষেবা প্রাপ্তির সুযোগের ভিত্তিতে তারা এসব আঘাতের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ ঝুঁকিতে রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনে দেশগুলোকে ক্রমানুসারে স্থান দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভারত – দক্ষিণ এশিয়ার এই চার দেশে শিশুরা জলবায়ু সংকটের প্রভাবসমূহের শিকার হওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। এই চার দেশের অবস্থান যথাক্রমে ১৪, ১৫, ১৫ ও ২৬ নম্বরে। নেপালের অবস্থান ৫১, শ্রীলঙ্কা আছে ৬১তম স্থানে। ভুটান আছে ১১১তম অবস্থানে, যেখানে শিশুরা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিতে আছে। প্রায় ১০০ কোটি শিশু “অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত করা ৩৩টি দেশে বসবাস করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জর্জ লারিয়া-আদজেই বলেন, “প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার লাখ লাখ শিশুর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এই অঞ্চলে খরা, বন্যা, বায়ু দূষণ ও নদী ভাঙনের কারণে লাখ লাখ শিশু গৃহহীন ও ক্ষুধার্ত এবং কোনো স্বাস্থ্যসেবা ও পানিবিহীন অবস্থায় রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও কোভিড-১৯ মহামারি একত্রে দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকট তৈরি করেছে। এখনই পদক্ষেপ গ্রহণের সময় – আমরা যদি পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করি, তাহলে পরিবর্তনশীল জলবায়ু এবং অবনতিশীল পরিবেশের প্রভাব থেকে তাদের ভবিষ্যতকে আমরা রক্ষা করতে পারি।“

শিশুদের জলবায়ু ঝুঁকি সূচক, ইউনিসেফ ২০২১

দেশের নাম

সিসিআরআই র‌্যাঙ্ক

জলবায়ু পরিবেশগত আঘাত

জলবায়ু পরিবরতনের ফলে শিশুর ঝুঁকি

মাথাপিছু নির্গমন (এমটি)

পাকিস্তান

১৪

৮.৭

৬.৪

০.৯৮

আফগানিস্তান

১৫

৭.৩

৭.৯

০.২০

বাংলাদেশ

১৫

৯.১

৫.১

০.৫১

ভারত

২৬

৯.০

৪.৬

১.৮০

নেপাল

৫১

৭.৫

৪.২

০.৪৩

শ্রীলঙ্কা

৬১

৭.০

৩.৩

১.০০

ভুটান

১১১

৪.৩

৩.৩

১.৮৩

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই শিশুরা নদীবাহিত বন্যা ও বায়ু দূষণের কারণে ক্রমাগত বিপদের মধ্যে রয়েছে। তবে এটিও উঠে এসেছে যে, শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করা হলে তা জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শিশুদের সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ৬০ কোটিরও বেশি শিশুর বসবাস এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর বসবাসও এই অঞ্চলে। বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত কারণে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো রয়েছে। তাপপ্রবাহ, ঝড়, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও খরার মতো চরম জলবায়ু-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো প্রতি বছর এই অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এবং আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী লাখ লাখ শিশুর ভবিষ্যতকে ক্রমাগত ঝুঁকিতে ফেলেছে। আরও খারাপ দিকটি হচ্ছে – তারা একটি বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে, যা অর্জিত যে কোনো অগ্রগতিকে উল্টে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যেখানে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয় সেখানেই যে শিশুরা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় জলবায়ু-চালিত প্রভাব মোকাবিলা করে তা সঠিক নয়। দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশসহ “অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত ৩৩টি দেশ সম্মিলিত ভাবে বৈশ্বিক কার্বন -ডাই -অক্সাইড নির্গমনের মাত্র ৯ শতাংশ নির্গমন করে। অন্যদিকে, মাত্র ১০টি দেশ সম্মিলিত ভাবে বৈশ্বিক নির্গমনের ৭০ শতাংশ নির্গমন করে

লারিয়া-আদজেই যোগ করেন, “বিশ্বজুড়ে আমরা যে ভয়ঙ্কর পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো দেখছি তা কয়েকজনে মাধ্যমে ঘটছে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এর পরিণাম ভোগ করতে হচ্ছে অনেককে। আমাদের অবশ্যই জরুরি ভিত্তিতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমিয়ে আনতে হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহত্তর স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলার জন্য একটি কমিউনিটি হিসেবে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সম্মিলিতভাবে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ১৮০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৪ বছরের নিচে। তারাই এই পরিবরতনের মূলে আছে।”

গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমাতে প্রয়োজনীয় জরুরি পদক্ষেপ না নিলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ভুগতে থাকবে। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শারীরিক ওজনের প্রতি ইউনিট বেশি খাবার ও পানির প্রয়োজন হয়, চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনায় তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম এবং রাসায়নিক, তাপমাত্রা পরিবর্তন ও রোগের প্রতি অনেক বেশি মাত্রায় তারা সংবেদনশীল।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণ জনগোষ্ঠী এ বিষয়টি নিয়ে দারুণ কাজ করছে। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের ঝুঁকি ২৩ বছর বয়সী তাহসিনকে পদক্ষেপ নিতে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কাজে ধাবিত করেছে। নিজের প্রতিষ্ঠিত যুব সংগঠনের মাধ্যমে তাহসিন এবং সারাদেশ থেকে আসা ৪০০ শিশু এবং তরুণ জনসমাগমের স্থানগুলো পরিষ্কার করছে। তারা তাদের সংগ্রহ করা প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকারী কেন্দ্রগুলোতে বিক্রি করছে এবং বৃক্ষ রোপন করছে। পাকিস্তানে ১৪ বছর বয়সী জাইমাল তার দেশকে প্লাস্টিক দূষণ থেকে পরিষ্কার রাখতে বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ উৎপাদন শুরু করে। ভারতে তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা দিবি সারাদেশ ভ্রমণ করছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর গাভিতা একটি পানি বাজেটিং অ্যাপ তৈরি করেছে।

ইউনিসেফ সরকার, ব্যবসা খাত ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে:

(১) শিশুদের জন্য মূল পরিষেবাগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থিতিস্থাপকতার পেছনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে।

(২) গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে। ২০৩০ সাল নাগাদ উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা যাতে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য দেশগুলোকে তাদের নির্গমন কমপক্ষে ৪৫ শতাংশ (২০১০ সালের মাত্রার তুলনায়) কমাতে হবে।

(৩) শিশুদের জলবায়ুবিষয়ক শিক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব দক্ষতা শেখাতে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য এবং প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

(৪) কপ২৬-সহ সকল জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনা এবং সিদ্ধান্তে তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করতে।

(৫) কোভিড-১৯ মহামারি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া যাতে পরিবেশবান্ধব, স্বল্প-কার্বন নির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় তা নিশ্চিত করতে, যাতে জলবায়ু সংকট মোকাবেলার সামর্থ্যের প্রশ্নে ভবিষ্যত প্রজন্মকে আপোষ করতে না হয়।

#####

সম্পাদকদের জন্য নোট:

প্রতিবেদন

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট

ডেটা ফর চিলড্রেন কোলাবরেটিভসহ বেশ কিছু অংশীদারের সহযোগিতার ভিত্তিতে সিসিআরআই গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী তরুণদের কাছে আরও সহজলভ্য করার জন্য ইউনিসেফ তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ক্লাইমেট কার্ডিনালসের সঙ্গেও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছে, যে সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত গবেষণা এবং তথ্য অনুবাদ করে যাতে এগুলো যত বেশি সম্ভব তরুণ এবং নেতাদের কাছে পৌঁছানো যায়।

মালদ্বীপ সম্পর্কিত: বৈশ্বিক তথ্যের অভাবে প্রতিবেদনে মালদ্বীপকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে মালদ্বীপ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ঝুঁকি এবং শিশু, মহিলা ও অন্যান্য ঝুঁকির মুখে থাকা সম্প্রদায়ের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুদের জন্য ইউনিসেফের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org/rosa এবং ইউনিসেফ রোসা-কে অনুসরণ করুন TwitterFacebook-এ।

ইউনিসেফ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রচারাভিযান “ওয়ান প্লানেট, ওয়ান লাভ, ওয়ান ইয়ুথ“ সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য ক্লিক করুন এখানে

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

সাবরিনা সিধু
ইউনিসেফ (নিউইয়র্ক)
টেলিফোন: +19174761537
ই-মেইল: ssidhu@unicef.org
প্রবারণ মাহাত
ইউনিসেফ দক্ষিণ এশিয়া
টেলিফোন: +977 9802048256
ই-মেইল: pmahat@unicef.org

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার