কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে ৪৫ হাজারের বেশি শিশুকে আটকাবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে; যা প্রমাণ করে শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা সম্ভব – ইউনিসেফ

শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন সামনে রেখে প্রকাশিত ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে বিশ্বজুড়ে ২ লাখ ৬১ হাজারেরও বেশি শিশু আটক থাকার তথ্য উল্লেখ করে সব শিশুর বন্দিত্বের অবসান ঘটাতে শিশু অপরাধের বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে

15 নভেম্বর 2021
Two boys smiling
ইউনিসেফ/বাংলাদেশ/২০২১/রনি

নিউইয়র্ক/ঢাকা, ১৫ নভেম্বর ২০২১ – আজ প্রকাশিত ইউনিসেফের নতুন তথ্য অনুসারে, কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি শিশুকে আটকাবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তারা নিরাপদে পরিবারে বা উপযুক্ত সেবাদাতার কাছে ফিরে গেছে।

কোভিড-এর সময়ে শিশুদের বন্দিত্ব’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আবদ্ধ ও জনাকীর্ণ স্থানগুলোতে থাকা শিশুদের কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে ইউনিসেফ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং অবিলম্বে এই শিশুদের মুক্তি দিতে আহ্বান জানানোর পর অন্তত ৮৪টি দেশের সরকার এবং আটককারী কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে হাজার হাজার শিশুকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এই সমীক্ষা নতুন দুটি বিশ্লেষণের একটি যা প্রতিবছর স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হাজার হাজার শিশুর অবস্থা তুলে ধরেছে । দুটি প্রতিবেদনই শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন সামনে রেখে প্রকাশ করা হয়।

এ বিষয়ে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে জেনে এসেছি যে, শিশুদের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে বিচার ব্যবস্থা যথাযথভাবে  সক্ষম নয় – কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ওই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। আমরা সেই দেশগুলোকে সাধুবাদ জানাই, যারা আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিশুদের আটকাবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছে। গুরুতর অসুস্থ করে দিতে পারতো এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিয়ে এই দেশগুলো গণপ্রতিরোধ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বয়স-উপযুক্ত বিচার সম্পাদনে সক্ষম হয়েছে। এটি আবারো প্রমাণ করে যে, শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা সম্ভব, যা আমরা আগে থেকেই জানতাম।”

বিচার পূর্ব এবং পরবর্তী আটকাবস্থা , অভিবাসনজনিত আটকাবস্থা , সশস্ত্র সংঘাত বা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত আটকাবস্থা বা বন্দি বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকাসহ আটক থাকা শিশুরা প্রায়ই আবদ্ধ ও জনাকীর্ণ স্থানে আটক থাকে। তারা পর্যাপ্ত পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত সেবা পায় না এবং তারা অবহেলা, শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। অনেক শিশু আইনজীবী ও পারিবারিক যত্ন পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাদের আটকাবস্থার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।

কোভিড-১৯ শিশুদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এর কারণে আদালত বন্ধ হয়ে যায় এবং অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক ও বৈচারিক সেবা ব্যাহত হয়। তথ্যপ্রমাণ বলছে, পথশিশুসহ অনেক শিশুকে মহামারীর সময়ে জারি হওয়া কারফিউ আদেশ লঙ্ঘন বা চলাচলের বিধিনিষেধ ভঙ্গ করার অপরাধে আটক করা হয়।

বাংলাদেশে, মহামারীর কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাসে শিশু আদালতের কার্যক্রম সহ আদালতের সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত হলে আটককৃত শিশুদের সংখ্যা  সাময়িকভাবে কেন্দ্রের ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বেড়ে যায়। ২০২০ সালের মে থেকে, ৫,৩০০-এর বেশি শিশু - বিশ্বব্যাপী সংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ - ভার্চুয়াল শিশু আদালতের মাধ্যমে শিশু-কিশোর সংশোধন বা উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো থেকে মুক্তি পেয়েছে। বাংলাদেশে আইনের দৃষ্টিতে আইনগত দায় গ্রহণের বয়স ৯ বছর, বৈশ্বিক সুপারিশ অনুযায়ী যা ১৪ বছর হওয়া উচিত।

ইউনিসেফ মুক্তিপ্রাপ্ত শিশুদের তাদের পরিবারের সাথে পুনর্মিলন এবং স্বাস্থ্যসেবা, মনোসামাজিক সহায়তা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং শিক্ষার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য পরিষেবা সহজতর করে নিরাপদ পুনঃএকত্রীকরণে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশের সমাজসেবা বিভাগের সাথে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে শুধুমাত্র একটি শিশুকে পুনরায় অপরাধের জন্য আটক কেন্দ্রে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা এই পুনঃএকত্রীকরণে প্রবেশন কর্মকর্তা  এবং সমাজকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে।

“মহামারী চলাকালীন ভার্চুয়াল আদালত শুরু করার মাধ্যমে, বাংলাদেশ শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে অনুকরণীয় ভূমিকা পালন করেছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের আটকে রাখা হয় তা তাদের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়, এবং মহামারির সময় অতিরিক্ত ভিড় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি  আরও জটিল করে তোলে," বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি মি. শেলডোন ইয়েট বলেন। “আমরা সরকারকে মহামারীর পরও শিশুদের জন্য ভার্চুয়াল আদালত চালু রাখার আহ্বান জানাই। এটি সাশ্রয়ী, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে এবং আদালত প্রাঙ্গণের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে শিশুদের রক্ষা করে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার এবং পুনরায় অপরাধ করার নিম্ন হার শিশুদের বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুদের আটকে রাখলে আমরা কেও-ই উপকৃত হই না।“

ইউনিসেফের দ্বিতীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার শিশুকে আটক আছে, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত হয়েছে বা যারা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ‘বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত শিশুদের সংখ্যার হিসাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ২০০৭ সালের পর এ ধরনের প্রথম বিশ্লেষণ, যেখানে সতর্ক করে বলা হয়েছে, অনেক দেশের তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ এবং প্রশাসনিক উপাত্ত ব্যবস্থা অনুন্নত, যার অর্থ হচ্ছে ওই সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারে।

শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এবং নিরাপদে সব শিশুর আটকবস্থার অবসান ঘটাতে ইউনিসেফ সরকার ও সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে:

  • বিচার ও কল্যাণ ব্যবস্থায় শিশুদের জন্য, বিশেষ করে সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুদের জন্য আইনি অধিকার বিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে বিনিয়োগ করতে।
  • সব শিশুর জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, প্রতিনিধিত্ব ও সেবাপ্রাপ্তি বাড়াতে।
  • শিশু অপরাধের প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উপযুক্ত বিকল্পের সুযোগ তৈরিতে অগ্রাধিকার দিতে।
  • অপরাধমূলক কার্যক্রমের আইনগত দায় গ্রহণের বয়স বাড়াতে আইনের সংস্কার করার মাধ্যমে শিশুদের আটকের অবসান ঘটাতে।
  • শিশু এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল বিচার প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করাসহ যৌন সহিংসতা, নিগ্রহ বা শোষণের শিকার শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে।
  • বিশেষায়িত শিশু-বান্ধব আদালত এবং ভার্চুয়াল ও ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিষ্ঠা করতে।

ফোর বলেন, “কোনো শিশুর আটক থাকার বিষয়টি ব্যর্থ ব্যবস্থার পরিচায়ক এবং সেই ব্যর্থতা পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকগুণে বেড়ে যায়। শিশুদের সুরক্ষা ও সহায়তার জন্য থাকা বিচার ব্যবস্থা প্রায়শই তাদের দুর্দশা বাড়ায়। নীতিনির্ধারক, আইন চর্চাকারী, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ এবং শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী এ সপ্তাহে বিশ্ব সম্মেলনে একত্রিত হতে যাচ্ছে। শিশুদের বন্দিত্বের অবসান ঘটাতে আমাদের অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

###

সম্পাদকদের জন্য নোট:

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ডাউনলোড করা যাবে এখান থেকে

প্রতিবেদন দুটি ডাউনলোড করুন এখান থেকে:

কোভিড-এর সময়ে শিশুদের বন্দিত্ব

বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত শিশুদের সংখ্যার হিসাব

‘কোভিড-এর সময়ে শিশুদের বন্দিত্ব’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য উপাত্ত নেওয়া হয়েছে ১৫৭টি দেশে ইউনিসেফের কার্যালয়ের নেটওয়ার্কের মধ্যে পরিচালিত সংস্থাটির একটি জরিপ থেকে। কর্মসূচির আওতাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ১৩৮টি দেশের সবগুলো এবং উচ্চ আয়ের ১৯টি দেশ রয়েছে, যেসব দেশ বিশ্বের মোট শিশু জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশের আবাসস্থল।

‘বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত শিশুদের সংখ্যার হিসাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হয় ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে গবেষণা এবং দেশগুলোর কাছে সরাসরি তথ্য নেওয়ার মাধ্যমে। উপাত্তের উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে বিচার মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয় বা সামাজিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো বিচার ব্যবস্থা দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নথিপত্র; কার্যকর থাকা ওয়েবসাইট বা জাতীয় পরিসংখ্যান বিষয়ক দপ্তরসমূহের দেওয়া জাতীয় পরিসংখ্যানগত প্রতিবেদন; ইউরোস্ট্যাট (EuroStat), ট্রান্সমোনি (TransMonEE)- এর মতো কেন্দ্রীভূত ডেটাবেজ।

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8809604107077
ই-মেইল: fselim@unicef.org
হেলেন উইলি
ইউনিসেফ নিউইয়র্ক
টেলিফোন: +19172442215
ই-মেইল: hwylie@unicef.org

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org/bangladesh

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার