আন্তঃপ্রজন্মগত যুগান্তকারী এক জরিপ বলছে, বয়স্কদের তুলনায় বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বেশি এবং তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপের ব্যাপারেও বেশি আগ্রহী

ক্রমবর্ধমান সংকট সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে তরুণ জনগোষ্ঠী তাদের আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় অধিকমাত্রায় বিশ্বাস করে যে, বিশ্ব আরও ভালো একটি স্থান হয়ে উঠছে – বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ইউনিসেফ-গ্যালাপের আন্তর্জাতিক জরিপ

18 নভেম্বর 2021
A girl talking
ইউনিসেফ/ইউএন০৫৪০৭৭৭/মাওয়া
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক’-এ তরুণ জলবায়ু কর্মীরা। বাংলাদেশ সেই দেশগুলির মধ্যে একটি যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে যারা সচেতন তাদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ যারা সরকার থেকে অর্থপূর্ণ জলবায়ু পদক্ষেপ আশা করে।

নিউইয়র্ক/ঢাকা, ১৮ নভেম্বর ২০২১ – বিশ্ব শিশু দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত ইউনিসেফ ও গ্যালাপের নতুন এক আন্তর্জাতিক জরিপ বলছে, বাংলাদেশে বয়স্কদের তুলনায় তরুণ জনগোষ্ঠীর মাঝে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতার হার বেশি।

বাংলাদেশি শিশু ও তরুণের মধ্যে যারা বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি তাদের সরকারের কাছে আরও দৃঢ়তার সঙ্গে পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও একমত।

এই চিত্র উঠে এসেছে ‘দ্য চেঞ্জিং চাইল্ডহুড’ শীর্ষক জরিপে। এটি বিশ্ব সম্পর্কে একাধিক প্রজন্মের কাছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমান সময়ে একজন শিশু হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন সে বিষয়ে নিয়ে করা এটা প্রথম জরিপ। এই জরিপের জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব অঞ্চল এবং আয় সীমার ২১টি দেশের বয়সভিত্তিক দুটি গ্রুপের (১৫-২৪ বছর বয়সী এবং ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী) ২১ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়।

জরিপে উঠে এসেছে, বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর তুলনায় শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মাঝে এই বিশ্বাস প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি যে, প্রতিটি প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব আরও ভালো বসবাসের জায়গা হয়ে উঠছে এবং শৈশবকালীন অবস্থার উন্নতি হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে যে, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও শারীরিক নিরাপত্তা আজকের শিশুদের জন্য তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়ে ভালো। তবে তাদের এমন আশাবাদ সত্ত্বেও তরুণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন, সামাজিক মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য সম্পর্কে সন্দিহান এবং হতাশা ও উদ্বেগের অনুভূতির সঙ্গে যুঝছে। বয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় তারা নিজেদেরকে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে দেখে এবং কোভিড-১৯ মহামারীর মতো হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণে অনেক বেশি আগ্রহী।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “আজকের বিশ্বে হতাশার কোনো অভাব নেই। যেমন, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, দারিদ্র্য ও অসমতা, ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদ হতাশার কারণ হতে পারে। তবে এখানে আশাবাদী হওয়ারও একটি কারণ আছে – শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী বয়স্কদের বিবর্ণ দৃষ্টিতে আজকের বিশ্বকে দেখতে চায় না। বিশ্বের তরুণ জনগোষ্ঠী তাদের পুরোনো প্রজন্মের তুলনায় আশাবাদী, অনেক বেশি বিশ্বমুখী এবং বিশ্বকে একটি ভালো স্থানে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আজকের তরুণ জনগোষ্ঠীর মাঝে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তবে তারা নিজেদেরকে এক্ষেত্রে সমাধানের অংশ হিসেবে দেখে।”

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি মি. শেলডন ইয়েট বলেন, “জলবায়ু বিষয়ক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত ও স্পষ্ট। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন এবং আরও বেশি কিছু করা যে প্রয়োজন সে বিষয়ে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সোচ্চার। বিশ্ব সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যান্য দেশের সমবয়সীদের তুলনায় কিছু বিষয়ে ভিন্নতা থাকতে পারে, তবে তাদের স্বপ্ন মুলতঃ একই – একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

যেসব দেশে জরিপ চালানো হয়েছে সেসব দেশে, রাজনৈতিক নেতাদের জন্য শিশুদের কথা শোনা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ – এমন বিশ্বাসকারী তরুণের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়।

“তরুণদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। জরিপে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে, তা হলো- তরুণদের কথা বলার জন্য, তাদের উদ্বেগ প্রকাশের জন্য এবং প্রত্যাশার কথা জানানোর জন্য তাদেরকে আরও জায়গা তৈরি করে দিতে হবে,” যোগ করেন শেলডন ইয়েট।

বিশ্ব সম্পর্কে বাংলাদেশি তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জরিপে অন্তর্ভুক্ত অন্য দেশগুলোতে তাদের সমবয়সীদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ যেসব দিক উঠে এসেছে সেগুলো হলো:

  • যারা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন তাদের মধ্যে, নাইজেরিয়া (৯৪ শতাংশ) ও জিম্বাবুয়ের (৯১ শতাংশ) পাশাপাশি বাংলাদেশ (৯১ শতাংশ) শীর্ষ স্থানীয় দেশগুলোর একটি, যেখানে তরুণরা চায় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নিক। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন তরুণদের মধ্যে গড়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তরুণ বিশ্বাস করে যে, এটি মোকাবিলায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।  
  • রাজনৈতিক নেতাদের জন্য শিশুদের কথা শোনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ– এমন মতপ্রকাশকারী তরুণের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়।
  • বাংলাদেশ শীর্ষ চারটি দেশের মধ্যে রয়েছে যেখানে তরুণরা বিশ্বাস করে যে, শিশুদের অর্থনৈতিক অবস্থা তাদের মা-বাবার চেয়ে ভালো হবে। অন্যদিকে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তরুণদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বাস খুবই কম।
  • তরুণ জনগোষ্ঠীর ৮১ শতাংশ বিশ্বাস করে যে, শিক্ষার অবস্থা আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত হয়েছে, যা বাংলাদেশকে শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে স্থান করে দিয়েছে।
  • বাংলাদেশি তরুণদের ১৯ শতাংশ জানান, তারা প্রায়শই উদ্বেগ ও শঙ্কা বোধ করেন এবং ১৪ শতাংশ বলেন, তারা প্রায়শই বিষণ্ণ বোধ করেন বা কিছু করার প্রতি কম আগ্রহ বোধ করেন।
  • বাংলাদেশের তরুণরা সঠিক তথ্যের উৎস হিসেবে সরকার, বিজ্ঞানী, ধর্মীয় সংগঠন এবং জাতীয় গণমাধ্যমের ওপর বয়স্কদের তুলনায় কম আস্থাশীল।
  • বয়স্কদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি তরুণ-তরুণী প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করার কথা জানায়, যা উল্লেখযোগ্যমাত্রায় প্রজন্মগত পার্থক্যের দিক থেকে বাংলাদেশকে তৃতীয় স্থানে জায়গা করে দিয়েছে।
  • বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫ শতাংশ জানায় যে, ‘এলজিবিটিকিউ+’ ব্যক্তিদের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা ‘কিছুটা’ বা ‘খুব’ গুরুত্বপূর্ণ। এই হার জরিপের আওতাভুক্ত দেশগুলোর গড় হারের চেয়ে বেশি। জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে গড়ে ৭১ শতাংশ তরুণ এ বিষয়ে সহমত প্রকাশ করে।

গ্যালাপের সিনিয়র পার্টনার জো ডালি বলেন, “তরুণদের মনে কী আছে তা আমরা জানতে পারব না যদি আমরা তাদের জিজ্ঞাসা না করি। ইউনিসেফের জরিপ পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে শোনা এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার গুরুত্বকে জোরালো করে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকবে; আমাদের সন্তানদের জন্য একটি উন্নত বিশ্ব রেখে যাওয়া নিশ্চিত করতে বয়স্ক প্রজন্মের জন্য তাদের ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “এই গবেষণা প্রজন্মগত বিভাজনের একটি সংক্ষিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি চিত্রিত করলেও এতে একটি পরিষ্কার চিত্র উঠে এসেছে। তা হলো, শিশু ও তরুণরা তাদের মা-বাবার চেয়ে অনেক সহজে ২১ শতকের চেতনাকে মূর্ত করে তোলে। ইউনিসেফ যখন আগামী মাসে তার ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং বিশ্ব শিশু দিবসকে সামনে রেখে, তরুণ জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণ ও তাদের জীবন কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে সে বিষয়ে সরাসরি তাদের কথা শোনা গুরুত্বপূর্ণ।”

প্রতি বছর ২০ নভেম্বর পালিত হওয়া বিশ্ব শিশু দিবসের লক্ষ্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত লাখ লাখ শিশুর জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ-বিষয়ক যেকোনো আলোচনায় তাদের বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা।

###

সম্পাদকদের জন্য নোট:

হাই-রেস ছবি ডাউনলোড করুন এখানে।

রিপোর্ট ডাউনলোড করুন এখানে

জরিপের ফল প্রকাশের পাশাপাশি ইউনিসেফ জরিপ ও প্রকল্প প্রতিবেদনের পুরো উপাত্ত সংবলিত একটি নতুন ইন্টারঅ্যাকটিভ প্লাটফরমও (http://changingchildhood.unicef.org/) চালু করছে।

দ্য চেঞ্জিং চাইল্ডহুড প্রজেক্ট  জরিপটি পরিচালিত হয় আজকের দিনে একজন শিশু হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন সে সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে একাধিক প্রজন্মের মানুষের মতামত জানতে চাওয়া প্রথম জরিপ হিসেবে। এই প্রকল্পের আওতায় ইউনিসেফ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যবর্তী সময়ে ২১টি দেশে ২১ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ও শিশুর ওপর জরিপ চালানোর জন্য গ্যালাপের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে।

যেসব দেশে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে সেগুলো হলো: আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, লেবানন, মালি, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জিম্বাবুয়ে।

জরিপের আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে ছিল গ্রামীণ এলাকাসহ পুরো দেশ এবং নমুনা কাঠামো টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ আছে এমন পুরো বেসামরিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতিটি বয়স ও শ্রেনীর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।

বাংলাদেশে এক হাজারের বেশি টেলিফোন জরিপ পরিচালিত হয়; এসব সাক্ষাৎকারের প্রায় অর্ধেক ছিল ১৫-২৪ বছর বয়সীর সঙ্গে এবং অর্ধেক ছিল ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সঙ্গে।

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8809604107077
ই-মেইল: fselim@unicef.org
হেলেন উইলি
ইউনিসেফ নিউইয়র্ক
টেলিফোন: +19172442215
ই-মেইল: hwylie@unicef.org

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org/bangladesh

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার

গ্যালাপ সম্পর্কে

নেতা ও সংস্থাগুলোকে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়তা করতে গ্যালাপ বিশ্লেষণ ও পরামর্শ প্রদান করে। বিশ্বজুড়ে যোগাযোগের সঙ্গে ৮০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতার সম্মিলন ঘটিয়ে গ্যালাপ কর্মী, গ্রাহক, শিক্ষার্থী এবং নাগরিকদের মনোভাব ও আচরণ সম্পর্কে বিশ্বের অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি জানে।