অল্পবয়সী শিশুদের খাবারে গত এক দশকে কোনো উন্নতি দেখা যায়নি, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তা 'আরও খারাপ হতে পারে' – ইউনিসেফ

শিশুরা যখন শক্ত খাবারে অভ্যস্ত হতে শুরু করে, সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রতি ৩ শিশুর মধ্যে মাত্র ১ জনকে ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট – এমন বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ানো হয়

22 সেপ্টেম্বর 2021
A baby enjoying meal
UNICEF/UN0517685/Mawa

নিউইয়র্ক/ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ – আজ ইউনিসেফ প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২ বছরের কম বয়সী শিশুরা তাদের সুস্বাস্থ্য ও ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য বা পুষ্টি পাচ্ছে না, যা তাদের বিকাশকে অপূরণীয় ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে ৬-২৩ মাস বয়সী প্রতি তিন শিশুর মধ্যে মাত্র একজনকে ন্যূনতম সংখ্যক সুপারিশকৃত খাদ্য দেওয়া হচ্ছে। যদিও গত এক দশকে অগ্রগতি হয়েছে, সমতার ব্যবধান রয়েই গেছে: ধনী পরিবারের ৪৮ শতাংশ শিশুর তুলনায় দরিদ্র পরিবারে মাত্র ২২ শতাংশ শিশুর ন্যূনতম খাদ্য বৈচিত্র্য পূরণ হয়। কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও, বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী ৩৬ শতাংশ শিশু অপুষ্টির (খর্বাকৃতি, রুগ্নতা বা অতিরিক্ত ওজনের) শিকার হয়।

চলতি সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘ খাদ্য সম্মেলনের আগে প্রকাশিত ফেড টু ফেইল? দ্যা ক্রাইসিস অব চিলড্রেন্স ডায়েটস ইন আর্লি লাইফ  শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, অসমতা, সংঘাত, জলবায়ু-সঙ্ক্রান্ত দুর্যোগ এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্বে সবচেয়ে কমবয়সীদের মাঝে বিদ্যমান পুষ্টি সংকটকে প্রকট করে চলেছে। আর এই ক্ষেত্রে গত দশ বছরে খুব সামান্যই উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলো একদমই স্পষ্ট, যেমন – যে সময়টাতে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে, তখনই লাখ লাখ অল্প বয়সী শিশুকে এমন খাবার খাওয়ানো হয় যার ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। জীবনের প্রথম দুই বছরে অপর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ শিশুদের দ্রুত বর্ধনশীল শরীর ও মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে, যা তাদের স্কুলে পড়াশোনা, চাকরির সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করে। যদিও আমরা বছরের পর বছর ধরে এটি জানি, তা সত্ত্বেও শিশুদের সঠিক পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। তাছাড়া চলমান কোভিড-১৯ মহামারিজনিত বিঘ্নের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”

প্রতিবেদনে ৯১টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র অর্ধেককে প্রতিদিন প্রস্তাবিত খাবার ন্যূনতম সংখ্যকবার খাওয়ানো হচ্ছে। ওই শিশুদের মাত্র এক তৃতীয়াংশ তাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যকবার সঠিকমানের খাদ্য পাচ্ছে। বিদ্যমান ধারার উপাত্ত নিয়ে ৫০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে, শিশুদের অপর্যাপ্ত খাওয়ানোর এই ধরন গত এক দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারি অপরিহার্য সেবাগুলো ব্যাহত করে চলেছে এবং অধিকসংখ্যক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে – একথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারগুলো কীভাবে তাদের শিশুদের খাওয়ায় তার ওপরেও প্রভাব ফেলছে মহামারি।

নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাসের কারণে সৃষ্ট ক্ষত শিশুদের সারাজীবন বহন করতে হয়। জীবনের শুরুর দিকে বৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য শাকসবজি, ফল, ডিম, মাছ ও মাংসে বিদ্যমান প্রয়োজনীয় পুষ্টি পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়ানো না হলে তা শিশুদের মস্তিষ্কের দুর্বল বিকাশ, দুর্বল শিক্ষা ফলাফল, কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, অধিকমাত্রায় সংক্রমণ এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে।

নিম্নমানের খাবার গ্রহণের ফলে খর্বাকৃতি, শীর্ণকায়, অনুপুষ্টির ঘাটতি এবং অতিরিক্ত ওজন ও স্থুলতার মতো অপুষ্টিজনিত সবগুলো সমস্যার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। কেননা জীবনের অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় এই বয়সেই তাদের শরীরের প্রতি কেজি ওজনের অনুপাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা বেশি থাকে।

ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, শিশুর পুষ্টিগত চাহিদার ক্রমবর্ধমান গতির সঙ্গে তাদের খাবার তাল মেলাতে ব্যর্থ হওয়ায় বৈশ্বিকভাবে ৫ বছরের কম বয়সী রুগ্নতার শিকার হওয়া শিশুদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশির, বা ২ কোটি ৩০ লাখ শিশুর, বয়স ২ বছরেরও কম। আর একই কারণে ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশুদের মাঝে খর্বাকৃতির সমস্যা দ্রুত বাড়ছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বা দরিদ্র পরিবারের ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের শহরাঞ্চলে বসবাসকারী বা ধনী পরিবারের সমবয়সীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি মাত্রায় নিম্নমানের খাবার খাওয়ানো হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে প্রস্তাবিত খাবার ন্যূনতম সংখ্যকবার খাওয়ানো হয়েছে – এমন শিশুদের অনুপাত গ্রামাঞ্চলের (২৩ শতাংশ) তুলনায় শহরাঞ্চলে (৩৯ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি ছিল।

“আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে যেন সকল শিশু তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা, বিকাশ এবং শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাদ্য থেকে উপকৃত হতে পারে। খাদ্য ব্যবস্থা শিশুদের জন্য পুষ্টিকর, নিরাপদ, বয়স উপযোগী এবং সাশ্রয়ী খাবার নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।“, বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টোমো হোযুমি বলেন।

"জাতিসংঘের খাদ্য সিস্টেম সম্মেলন এবং প্রবৃদ্ধির জন্য পুষ্টি সামিট শিশুদের পুষ্টির উন্নতির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনরব্যাক্ত করে বিগত দশকগুলোর অগ্রগতি আরো এগিয়ে নেয়ার ভালো সুযোগ।", তিনি বলেন।

প্রত্যেক শিশুকে পুষ্টিকর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্য সরবরাহের জন্য প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় বদল আনতে সরকার, দাতা, সুশীল সমাজের সংগঠন এবং উন্নয়ন কর্মীদের হাতে হাত রেখে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ওইসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে:

  • উৎপাদন, বিতরণ এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রয়কে উৎসাহিত করার মাধ্যমে ফল, শাকসবজি, ডিম, মাছ, মাংস এবং শক্তিবৃদ্ধিকারী খাবারসহ পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা এবং সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করা।
  • অস্বাস্থ্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাত ও অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং কোমল পানীয় থেকে ছোট শিশুদের রক্ষা করতে এবং শিশু ও পরিবারকে লক্ষ্য করে ক্ষতিকর বিপণন চর্চার অবসান ঘটাতে জাতীয় মান ও আইন বাস্তবায়ন করা।
  • ডিজিটাল মিডিয়াসহ একাধিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সহজে বোধগম্য ও সুসংহত তথ্যের মাধ্যমে বাবা-মা ও শিশুদের বুঝিয়ে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করা।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিনিয়োগের মাধ্যমে অগ্রগতি সম্ভব। সব ধরনের অপুষ্টি প্রতিরোধে, নিজেদের সম্ভাবনা অনুযায়ী বৃদ্ধি, বিকাশ ও শিক্ষার জন্য শিশুদের প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার থেকে সব শিশু যাতে উপকৃত হয় তা নিশ্চিত করতে সব অঞ্চলে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ফোর বলেন, “শিশুরা শুধু ক্যালোরির ওপর ভর করে বেঁচে থাকতে বা সুস্বাস্থ্য অর্জন করতে পারে না। আর শুধু সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন ও মানবিক অংশীদার এবং পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়ে আমরা খাদ্য ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারি এবং প্রতিটি শিশু যাতে পুষ্টিকর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্য পায় সে ব্যবস্থা করতে পারি। জাতিসংঘের আসন্ন খাদ্য সম্মেলন বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবস্থার জন্য মঞ্চ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যা সব শিশুর চাহিদা পূরণ করবে।”

#####

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ডাউনলোড করা যাবে এখান থেকে

সম্পাদকদের জন্য নোট

এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত ছোট শিশুদের খাবারের বর্তমান অবস্থা, প্রবণতা ও বৈষম্যের পরিমাণগত উপাত্ত ইউনিসেফের বৈশ্বিক ডেটাবেজ থেকে নেওয়া হয়েছে, যেখানে কেবল আন্তর্জাতিকভাবে তুলনীয় এবং পরিসংখ্যানগতভাবে সঠিক উপাত্তই রয়েছে। ইউনিসেফের বৈশ্বিক ডাটাবেজগুলোতে ১৩৫টি দেশ ও অঞ্চলে পরিচালিত ৬০৭টি জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপের তথ্য রয়েছে, যা বৈশ্বিকভাবে ২ বছরের কম বয়সী ৯০ শতাংশের বেশি শিশুর প্রতিনিধিত্ব করে।

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

হেলেন উইলি
ইউনিসেফ নিউইয়র্ক
টেলিফোন: +19172442215
ই-মেইল: hwylie@unicef.org
ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8809604107077
ই-মেইল: fselim@unicef.org

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার

জাতিসংঘের খাদ্য সম্মেলন ২০২১ সম্পর্কিত

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য কার্যক্রমের দশকের অংশ হিসেবে ২০২০ সালের অক্টোবরে বিশ্ব খাদ্য দিবসে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘের খাদ্য সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনের লক্ষ্য হলো ক্ষুধা, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে খাদ্য ব্যবস্থার আন্তঃসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের সবগুলোতে অগ্রগতি অর্জন করা।

জাতিসংঘের খাদ্য সম্মেলন ২০২১ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: https://www.un.org/food-systems-summit