প্রাথমিক শিক্ষার মান ও ধারাবাহিকতা

বিদ্যালয়ে শিশুদের ধরে রাখতে শিক্ষা ব্যাবস্থায় জবাবদিহিতা

Primary school boys at Rangamati
UNICEFBangladesh/2014/Mawa

চ্যালেঞ্জ

প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী ৪৬ লাখ শিশু রয়েছে পড়ালেখার বাইরে

প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে-মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি এবং সমতা তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। সফলতার দিকগুলো হল - সব শিশুর প্রাথমিকে ভর্তি হওয়া, শ্রেণিকক্ষে লৈঙ্গিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং অতি উচ্চ হারে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শেষ করা।

কিন্তু প্রাথমিক স্তরে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা শিক্ষার মান। নিম্নমানের কারণে শিশুরা উপযুক্ত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় এবং এক পর্যায়ে ঝরে পড়ে।     

পূর্ণ যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, অপুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা- এ সবই শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বহু বিদ্যালয়ে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি। এর কারনে শতকরা ৮০ ভাগ প্রতিষ্ঠানই দিনে দুই শিফট চালায়। শিক্ষকদের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান, তাদের ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

২০১৩ সালের ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট অনুসারে, পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন গণিত ও বাংলায় উপযুক্ত দক্ষতা অর্জন করেছে।

২০১১ সালে প্রাথমিক শেষ করা প্রতি দুইজন ছেলে শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনেরও কম এবং প্রতি তিনজন মেয়ের মধ্যে একজনেরও কম কার্যত লেখাপড়া শিখেছে।

কিন্তু প্রাথমিকে ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ হলেও মাত্র ৬৭ শতাংশ বা তার চেয়ে কম হারে শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের যোগ্যতা অর্জন করে। আর উচ্চ শিক্ষায় পৌঁছায় মাত্র ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী।

ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঝরে পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি চতুর্থ শ্রেণিতে, যে শ্রেণিটি প্রকৃতপক্ষে প্রাথমিক সমাপনীর প্রস্তুতি পর্ব। যে শিশুরা শিক্ষায় দুর্বল তাদের জন্য প্রয়োজন শ্রেণিকক্ষে বাড়তি সহযোগিতা।

হাজারীবাগের ট্যানারির আশেপাশের এলাকার শিশুরা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের পাশে স্তূপ করে রাখা আবর্জনার ওপর খেলছে।
UNICEF/UNI9940/Noorani
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের পাশে স্তূপ করে রাখা ট্যানারির আবর্জনার ওপর খেলছে হাজারীবাগ এলাকার শিশুরা।

স্কুলে যাওয়ার উপযুক্ত প্রায় ৬২ লাখ শিশু এখনও শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। তাদের বেশীরভাগের বাস শহরের বস্তি বা দুর্গম অঞ্চলে। এদের মধ্যে ৪৬ লাখ শিশুই প্রাথমিক স্কুলে যাওয়ার বয়সী

আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাগ্রহণে দুর্বলতা। সেকারণেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় পর্যায় থেকে ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও বিভিন্ন খাত দেখিয়ে অভিভাবকের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় করা বন্ধ করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা উপজেলাগুলোতে ৪৫ শতাংশ শিশুই স্কুলের বাইরে রয়েছে। কর্মজীবী শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং দুর্যোগকবলিত প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরা প্রায়ই শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার পেছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি ক্ষতিকর সামাজিক রীতি-নীতিরও ভূমিকা রয়েছে। প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে একজন শিক্ষার বাইরে চলে যায় মূলত বাল্যবিয়ে ও শিশু শ্রমের কারণে। 

শহরের ছেলে-মেয়েদেরই স্কুলে ভর্তির হার বেশি হলেও লেখাপড়ার বাইরে থাকা ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মধ্যেই খুব বেশি। এটাই বাংলাদেশের রাজধানীতে শিশু শ্রমের উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।

নিরাপত্তার ঘাটতি এবং জনসমাগম স্থলে (পাবলিক প্লেস) যৌন হয়রানি ও যৌন নিপীড়নের ব্যাপকতার কারণেও মেয়েরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে।

মেয়ে ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ও পানির ব্যবস্থা, ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা মেনে চলার সুযোগ-সুবিধা না থাকাটা মেয়েদের শ্রেণিকক্ষে পারফরম্যান্স এবং উপস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।


 

২০১৪ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে ধ্বংস হয়ে যায় বড়গুনার পশ্চিম শারিক্ষালী সরকারি প্রাইমারি স্কুল
UNICEF/UNI170762/Kiron
২০১৪ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে ধ্বংস হয়ে যায় বড়গুনার পশ্চিম শারিক্ষালী সরকারি প্রাইমারি স্কুল। সে জায়গাতেই ইউনিসেফের সাহায্যে তৈরি হয় দুর্যোগ পরবর্তী অবস্থায় পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই স্কুল।

সমাধান

ইউনিসেফ মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা, বাদ পড়া কমানো ও উত্তোরণের হার বাড়াতে কাজ করছে

সব পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে শিক্ষা আইন পাস করার লক্ষে কাজ করছে ইউনিসেফ। প্রস্তাবিত এই আইনটি হয়ে গেলে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। 

প্রাথমিক শিক্ষা বর্তমানের পঞ্চম থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যাতে নিয়ে যাওয়া হয় সেই ব্যবস্থার জন্যও চেষ্টা চালাচ্ছে ইউনিসেফ। প্রাথমিক শিক্ষার সীমা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত গেলে প্রান্তিক শিশুরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।

অবস্থার পরিবর্তনে বিদ্যালয়ের কার্যকারিতা, শিশুর উপযুক্ত শিক্ষণ পদ্ধতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিশুরা কী রকম শিখছে তার মূল্যায়ন এবং ঝরে পড়াদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার কাজ করছে ইউনিসেফ।

মান উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ যাতে হয় সেজন্য শিশুর মাধ্যমিকে উত্তরণ নিশ্চিত করতে কৌশলগত প্রচারণা চালানো হয়। আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক এবং সেকেন্ড চান্স শিক্ষায় সহায়তা অব্যাহত রেখেছে ইউনিসেফ।

প্রতিবন্ধী এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার প্রসারে অন্যান্য অংশীদারদের নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করে ইউনিসেফ।

প্রান্তিক শিশুদের কাছে পৌঁছাতে ইউনিসেফ শিশুবান্ধব বিদ্যালয়, নারী-পুরুষের বিষয়গুলো মাথায় রেখে বিভিন্ন ব্যবস্থা করা এবং শিশুর সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে তাকে শেখানোর পদ্ধতি প্রবর্তনে কাজ করছে।

জবাবদিহিতা বাড়াতে ইউনিসেফ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং উন্নততর পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য ডেটার ব্যবহার উৎসাহিত করে।

জরুরি বা সাধারণ, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, সেকেন্ড চান্স লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা দেয় ইউনিসেফ।

বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনেতের প্রভাবে আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

দুর্যোগের সময় লেখাপড়ায় যে ক্ষতি ও বিঘ্ন ঘটে তা পুষিয়ে দিতে জরুরি পরিস্থিতিতে লেখাপড়ার একটি রূপরেখা (ফ্রেমওয়ার্ক) তৈরি করেছে  ইউনিসেফ।

ইউনিসেফ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি সংশোধন এবং টিচার্স ট্রেইনিং প্যাকেজে কারিগরি সহায়তার অংশ হিসেবে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জরুরি শিক্ষা বিষয়ক পরিচ্ছদ যোগ করবে।

বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্নতার অনুশীলন শিক্ষার ওপর কী প্রভাব ফেলে তা বের করতে গবেষণা চালাবে ইউনিসেফ।

 

এই বিষয়ে আরও জানতে

ইউনিসেফ বাংলাদেশ কান্ট্রি প্রোগ্রাম ফর ২০১৭-২০২০: কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্ট এ্যান্ড ‍স্ট্র্যাটেজি নোটস