শিশু অধিকার বিষয়ে সচেতনতা

ইতিবাচক পরিবর্তনের দূত হয়ে উঠতে শিশুদেরকে সাহায্য করা

সমাজের পরিবর্তনে শিশুরা
UNICEF Bangladesh/2015/Sujan

চ্যালেঞ্জ

শিশুদের মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজন অন্তর্ভূক্তিমূলক গণমাধ্যম

শিশুদের দাবি-দাওয়া মেটানো শুধু বাধ্যতার কাজ নয়, এর অর্থনৈতিক অর্থও রয়েছে। যেসব দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, তারা শিশুদের পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছে। প্রকৃতপক্ষে, শিশুদের জন্য বিনিয়োগ না করার ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি, তা শিশুদের অধিকার পূরণ করার ব্যয়ের চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি।

শিশুদের ভোটাধিকার না থাকায় তারা এমন মানুষদেরউপর নির্ভর করে যারা তাদের অধিকারকে সম্মান করা, সংরক্ষণ করা ও পূরণকরতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এই মানুষগুলো হলেন:সকল পর্যায়ের নেতা, সংসদ সদস্য, কাউন্সিলর, সরকারি চাকুরিজীবী, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ধর্মীয় নেতা, বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সমাজকর্মী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও অন্য অনেকে।

শিশুরা তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনা। কিন্তু তারা তাদের অধিকার রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের উপর নির্ভর করে

সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তারা আইন ও নীতি প্রণয়নে, এসব আইন ও নীতিসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দেয়া এবং তারা যে জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের পক্ষে তদারকি করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

শিশুরা বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষক, সমাজকর্মী, ধর্মীয় নেতা, স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম পেশাজীবি এমন ব্যক্তিবর্গের উপরও নির্ভর করে যারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ।

গণমাধ্যম সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে এবং শিশুদেরকেও তাদের চিন্তার বিন্যাসে সহায়তা করে।

এটা প্রমাণিত যে, শিশুরা মিডিয়ার ভোক্তা কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সব সময় তাদের সক্রিয় ভূমিকা থাকেনা। মূলধারার মিডিয়ায় শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে, মিডিয়া প্রোগ্রাম তৈরিতে তাদেরকে প্রভাবিত করতে হবে এবং এতে করে মিডিয়াতে তাদের কথা বলার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি ন্যায়সঙ্গত সামাজিক উন্নয়নে তাদের খুঁটি শক্তিশালী হবে।

তবে, কিছু কারণে শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ মিডিয়াতে তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এর কারণগুলো হলো: সামর্থ্যরে ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, জ্ঞানের ঘাটতি অর্থাৎ শিশুদের যথাযথ, নৈতিক ও উৎপাদনশীল কাজে অংশগ্রহণ করানোর জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব।

বাংলাদেশে ‘সংবাদ সাক্ষরতা’ তুলনামূলকভাবে নতুন ধারণা। পাঠকরা যখন কোনো তথ্য বা সংবাদকে নৈতিকতা ও যৌক্তিক দিক থেকে মূল্যায়নের বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হবে তখন তারা সংবাদটির দায়িত্বশীলতা ও সত্যতার বিষয়টি দাবী করতে সক্ষম হবে।

শিশুদের বিষয়গুলি গণমাধ্যমে মাত্র ৩ শতাংশের কম প্রতিফলিত হয়। এই তিন শতাংশের মধ্যেও, এক শতাংশের কম পূর্ণাঙ্গ ও গভীর বিষয়গুলি তুলে ধরে গণমাধ্যম

Women watch TV in a slum hut

সংবাদের গুণগত মান নির্ণয়ের মূল বিচারকহলো পাঠকরা। তাদের কাছে প্রত্যাশা করা হয় যে, সংবাদটি সত্যতা ও নৈতিকতার মানদন্ডের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে কিনা সেটা পাঠক মূল্যায়ন করবে। এটা করার জন্য তাদের নিজেদেরও সংবাদ চেতনা এবং সংবাদের নৈতিকতার মান সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।

ইন্টারনেট সুবিধা গ্রহণ করার জন্য শিশুদের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। কারন, ১৫-১৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠি যারা বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠির ৮ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের মধ্যে প্রায় ৩.৩ শতাংশ  নিয়মিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের ভালো দিক থাকলেও, শিশুদেও জন্য এতে বেশ কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। কিছু কিছু অনলাইন ঝুঁকি তাদের শুধু ক্ষতিই করবে না, বরং তাদেরকে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে ফেলবে, যেমন, যৌনউত্তেজনা নিয়ে বড় হওয়া বা যৌনতায় জড়িয়ে যাওয়া ও যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া; কিশোর-কিশোরীদের আপত্তিকর ছবি তৈরি ও বন্টন করা; শিশু পাচার করা; শিশুদের দৈহিক ও মানসিকভাবে অপব্যবহার করা; নেশাজাতীয় দ্রব্যের অবৈধ বিক্রি ও বন্টন; প্রতিহিংসামূলক পর্নোগ্রাফী, হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক আচরণ।

Adolescent girl TV

টেলেভিশন 

ক্যাবল ও স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের ‍বৃদ্ধি সত্ত্বেও, গ্রামাঞ্চলে সরকারি বিটিভির দর্শক সংখ্যা সবচাইতে বেশী

মিনা কার্টুন রেকর্ডিং এর একটি দৃশ্য।

রেডিও 

শহর এলাকাগুলোতে ১৫ থেকে ২৪ বয়সীদের মধ্যে রেডিও শোনার প্রবণতা বেশী

 

সূত্রঃ জাতীয় গণমাধ্যম জরিপ ২০১৫   

গ্রামের ছেলের হাতে মোবাইল ফোন

মোবাইল ফোন 

এ সেবা ছড়িয়ে আছে প্রায় পুরোদেশে, কিন্তু পুরুষ ও নারীদের ব্যাবহারের ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে, ৮১.৭ শতাংশ ও ৪৮.১ শতাংশ

সমাধান

শিশুদের জন্য জরুরী এমন বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া

ইউনিসেফ সাংসদ, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অধিকার বিষয়ক সংগঠনের সাথে শিশু অধিকারের প্রচার ও প্রসারে কাজ করে।

২০১৬ সাল থেকে ইউনিসেফ জাতীয় সংসদের শিশু অধিকার সম্পর্কিত সংসদীয় ককাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। শিশু অধিকার সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস নির্দলীয়, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি গ্রুপ যা বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লেখিত শিশু অধিকার রক্ষা ও শিশু সুরক্ষার জন্য কাজ করে।

Child journalist from Mymensingh
ঢাকায় এক প্রদর্শণীতে নিজের প্রকাশিত কাজের সামনে দাঁড়িয়ে ময়মনসিংহের ১৪-বছর-বয়সের শিশু সাংবাদিক আতিকা।

ইউনিসেফ শিশুদের সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণকে সহায়তা দেয়, কারণ শিশু সাংবাদিকরা তাদের সাথী ও কমিউনিটির কথা বলে

 

শিশুদের সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরী হচ্ছে এমন এক ধারার কিশোর-কিশোরী যারা তাদের অধিকারের বিষয়গুলি অতোপ্রতভাবে জানে।

এ কাজটি করার জন্য ইউনিসেফ গণমাধ্যম ও সশীল সমাজের বিবিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব করেছে। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও বাংলাদেশে শর্ট ফ্লিম ফোরাম। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ও এক্ষেত্রে ইউনিসেফের একটি প্রধান অংশীদার।

কিশোর-কিশোরীদের পরিবর্তনের দূত হিসাবে সংগঠিত করা ইউনিসেফর গুরুত্বপূর্ণ কাজ

এই কাজটি ৫ কোটি মানুষকে শিশুদের পক্ষে পদক্ষেপ নিয়ে ১০০ কোটি মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়ার ইউনিসেফের যে বৈশ্বিক এজেন্ডা, তার পরিপূরক।

Adolescents as agents of change

ইন্টানেট প্রযুক্তিকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে, বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে ইউনিসেফ। ইউনিসেফ ও সরকারের আইসিটি বিভাগ নিম্নলিখিত কাজগুলো করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে:

  • ডিজিটাল সিকুরিটি অ্যাক্ট - ২১০৬-এর রুলের খসড়া তৈরীতে কারিগরী সহায়তা দেয়া
  • অনলাইন সুরক্ষা বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরীতে যৌথ প্রচারাভিযান চালানো
  • শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা নির্ণয়ে বিদ্যমান হাতিয়ারগুলোর সাথে শিশু হেল্পলাইন ও ইউ-রিপোর্টকে যুক্ত করা

ইউনিসেফ গত কয়েক বছর থেকে শিশুদের জন্য গণমাধ্যমে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশে নৈতিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে কাজ করছে। গণমাধ্যম মালিক, গেইটকিপার ও বার্তাকক্ষের ব্যবস্থাপক ও প্রতিবেদকের সাথে এ বিষয়ে মতবিনিময় চলছে।

প্রশিক্ষণ ও ফেলোশীপ কার্যক্রম প্রতিবেদকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় ইউনিসেফ গণমাধ্যমে প্রতিবেদনে নৈতিকতা শীর্ষক গাইডলাইন তৈরী করে, যা গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকরা িএকটি কার্যকর উদ্যোগ হিসাবে বিবেচনা করছে।

শিশুদের ‘সংবাদ স্বাক্ষরতা’র প্রয়োজন উপলব্ধি করে গড়ে উঠেছে এক্সপ্লোরিং ইয়ং গাইড: নিউজ লিটেরেসী এ্যান্ড এথিক্স ইন চাইল রিপোর্টিং নামক প্রকল্প, যা শিশুদের মধ্যে সংবাদ স্বাক্ষরতা গড়ে তোলার পাশাপাশি, শিশুদেরকে দ্বায়িত্বশীল ও নৈতিক মানদন্ড বজায় রেখে প্রতিবেদন তৈরীতে সহায়তা করছে।

একটি গবেষণা প্রকাশের পাশাপাশি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১০,০০০ কিশোর-কিশোরীকে সংবাদ স্বাক্ষরতা ও শিশু বিষয়ক নৈতিক সংবাদ প্রতিবেদন সম্পর্কে ১৯২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছেলে-মেয়েদের অংশগ্রহণে ১২টি বিতর্ক প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়।

বিভিন্ন পাঠক শ্রেণীকে আকৃষ্ট করা জন্য বিশেষ পৃষ্ঠা প্রকাশ করে সংবাদপত্রগুলো। শিশুদের উপর বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রে বিশেষ পাতা প্রকাশের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা সম্ভব।

এ বিষয়ে আরও জানতে