ব্যবসায় শিশুবান্ধব উদ্যোগ

শিশুর অধিকার রক্ষা প্রত্যেকের দায়িত্ব

মা ও শিশু
UNICEF Bangladesh/2018/Mawa

চ্যালেঞ্জ

শিশুরা প্রতিটি ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং সেটা হতে পারে কর্মীর সন্তান হিসেবে, কর্মী নিজেই এবং ব্যবসায়ী পণ্য ও সেবার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ক্রেতা হিসেবে।

এর পরেও অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম এবং শিশুর অধিকারের মধ্যকার যোগসূত্রটা বুঝতে সক্ষম নয়। 

শিশু অধিকারের ওপর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের একটি উদাহরণ শিশু শ্রম। কিন্তু এর বাইরেও বহু পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে এবং সে জায়গাগুলোতে অগ্রগতি দরকার।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কর্মজীবী মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কর্মক্ষেত্রে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোতে সহায়তা এবং একজন মা ও তার চাকরির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় আরও অনেকভাবে সহায়তা করতে পারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের গতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পেছনে আছে তৈরী পোশাক (আরএমজি) খাতের সাফল্য। এই খাতে নিয়োজিত ৩০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপির ৭ শতাংশই আসছে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে এবং তা দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে।

এসব উন্নয়ন অবশ্য বাংলাদেশের জনসংখ্যার ধরনে পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ এখন শহরাঞ্চলে বসবাস করে।

শহরে কাজের সুযোগ পারিবারিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনছে। লোকজনের শহরমুখী হওয়ার একটা কারণও এটা। অনেক সময় শিশু সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের গ্রামে রেখে কাজের জন্য শহরে চলে আসছে মানুষ।

তুলনামূলকভাবে জোরালো আইন থাকলেও নারীদের মধ্যে মাতৃত্ব ও সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা খুব কম। নারীরা দেশের কর্মীবাহিনীর একটি বড় অংশের, কিন্তু বিদ্যমান নীতিতে তাদের সুরক্ষার জন্য বাস্তবভিত্তিক কর্মপন্থার ঘাটতি রয়েছে।

গ্রামের বাড়ি ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় কাজ করতে আসা এক দল নারী।
UNICEF/UNI142682/Noorani
গ্রামের বাড়ি ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় কাজ করতে আসা এক দল নারী। তারা কাজ নিয়েছেন মিরপুরের বিভিন্ন তৈরি-পোশাক কারখানায়। কর্মক্ষেত্রের কাছে ছোট এই ঘরটিতে তাদের সবার বাস।

অনেক শ্রমিক তীব্র ঘন বসতির শহুরে এলাকায় থাকছেন, যেখানে মৌলিক সেবাগুলো পাওয়াই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমিত আয় হওয়ায় শ্রমিক পরিবারের সাধারন চাহিদাগুলো পূরণ করা অনেক কঠিন

অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য তাদের কাজের ক্ষেত্রে পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে। তবে শ্রমিকদের বাস যেসব এলাকায়, সেখানে জীবনমানের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও অনেক কিছু করার রয়েছে।

রপ্তানিকেন্দ্রিক শিল্প কারখানায় উন্নতি ঘটলেও দেশীয় খাতের কারখানাগুলোতে তা একইভাবে হচ্ছে কি না সে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অগোচরে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ৫০টি চা উৎপাদনকারী দেশের একটি হলেও এসব বাগানের কর্মীদের মৌলিক সেবাগুলো পাওয়ার সুযোগের ঘাটতি রয়েছে।

চা বাগানের শ্রমিকরা সাধারণত বিভিন্ন প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। এখানকার শিশুরা বাংলাদেশে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা শিশুদের একাংশ।

এসব লোকজনের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য সহায়তা তাদের মালিকের কাছ থেকেও আসা উচিত। মালিকপক্ষের কার্যক্রমের বড় প্রভাব রয়েছে শিশুর অধিকার রক্ষা ও উন্নয়নে।

কর্মক্ষেত্রের কার্যক্রম ও শিশু অধিকারের মধ্যে একটা যোগসূত্র তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ শুধু শিশুদের জন্য একটি ‘উন্নত বিশ্ব’ সৃষ্টির দিকেই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠবে না, বরং পরিবারবান্ধব নীতির কারণে অনেক সুফলও বয়ে আনবে।

সমাধান

​​​​​​​শিশুবান্ধব নীতি শুধু শিশুদের জন্যই ভালো নয়, তা ব্যবসার জন্যও ভালো

CSR flow

গার্মেন্ট কারখানায় শিশুবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ছয় ধাপের কর্মসূচি নেওয়া হয়।

 


 

২০১২ সালে শিশু অধিকার ও ব্যবসায় নীতি তৈরী করে ইউনিসেফ।

এই ১০টি নীতি কর্মক্ষেত্র, বাজার এবং ব্যবসাকেন্দ্রিক পরিবেশ ও কমিউনিটিতে শিশুর অধিকার রক্ষায় ব্যবসায়ী উদ্যোগ যা করতে পারে তার সব ধরনের প্রভাবকে ধারণ করে।

সব খাতে মূল ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ডে শিশু অধিকারের বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করে ইউনিসেফ। এ দিক বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ড কেমন হবে তা নির্ধারণে ইউনিসেফ বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।

ব্যবসার জন্য ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহায়তার বিভিন্ন দিক নিচে তুলে ধরা হল -

ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ

টেকসই ব্যবসায়ী উদ্যোগ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী উদ্যোক্তা এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সাসটেইন্যাবিলিটি কর্মসূচির আওতায় কীভাবে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় সে বিষয়ে সিএসআর পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ইউনিসেফ। আগ্রহী হলে ইমেইল করুন: i.e. crbangladesh@unicef.org

তৈরি পোশাক খাত 

ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে দেশের নেতৃত্ব স্থানীয় ১০টি তৈরী পোষাক কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছে তাদের উৎপাদন কার্যক্রমে শিশু অধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কিছু তৈরী পোষাক ব্র্যান্ডও এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছে।

ইউনিসেফের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ফলশ্রুতিতে ১০টি তৈরী পোষাক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে শিশু অধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে।

      

বাল্যবিয়ে

গ্রামীণ ফোন ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ

শিশুদের মধ্যে নিরাপদ ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়েছে গ্রামীণ ফোন ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ।

এই অংশীদারিত্বের আওতায় অনলাইনে কীভাবে নিরাপদ থাকা যায় সে বিষয়ে শিশু, বাবা-মা, শিক্ষক ও সেবাদাতারা যাতে সজাগ থাকেন তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা হবে।

 

      

মাদার্স এট ওয়ার্ক কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মজীবি মায়েদের সহায়তা

কর্মজীবী মায়েদের জন্য বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য সহায়ক হয়।

কর্মজীবী মা ও তাদের শিশু;রে অধিকার রক্ষায় সহায়তার জন্য সরকার ও অন্যানী জাতীয় অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ‘মাদারস@ওয়ার্ক’ নামে একটি কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে ইউনিসেফ।

এই কর্মসূচির আওতায় কর্মজীবী মায়েদের জন্য সাতটি সুযোগ থাকতে হবে- সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা, এর জন্য সহায়ক কর্মপরিবেশ, শিশু সেবা কেন্দ্র, মাতৃত্বকালীন ছুটি, আর্থিক ও চিকিৎসা সুবিধা, চাকরির সুরক্ষা ও বৈষম্যহীনতা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা।

চা বাগানের শিশু

চা বাগানে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ চা ব্যবসায়ী সমিতি এবং বেশ কয়েকটি চা উৎপাদনকারী কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ। এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে চা বাগানের বাসিন্দাদের মৌলিক সামাজিক সেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।

ইন্টারনেটে শিশু

বৈশ্বিকভাবে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন শিশু। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের’ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন জগতের সঙ্গে শিশুদের সম্পৃক্ততা ক্রমশ বাড়ছে। ইন্টারনেট তথ্য পাওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম হলেও এখানে অনেক ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে অনলাইন নিরাপত্তার দিক দিয়ে।