বাল্যবিয়ে বন্ধে জাতীয় মাল্টিমিডিয়া প্রচারাভিযান

বাল্য়বিয়ে একটি মেয়েকে সুরক্ষা দেয় না বরং তার কাছ থেকে শৈশব ও জীবনের সুযোগগুলো কেড়ে নেয়

বাল্যবিয়ের বন্ধের প্রচারাভিযান
ইউনিসেফ বাংলাদেশ

বিশ্বের যেসব দেশে শিশুবিয়ের হার উচ্চ; বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। শিশুবিয়ের প্রথা দেশের অনেক অঞ্চলে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। শিশুবিয়ের পেছনে বেশ কিছু সামাজিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় এবং ঐতিহ্য কাজ করে। বাংলাদেশে যেসব কারণ শিশুবিয়ের ঝুঁকি বাড়ায় তার মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, মেয়েদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে ভয় এবং সামাজিক রীতিনীতি ও বিশ্বাসের জটিল সংকট।

সামাজিক প্রথা তথ্যের প্রকৃতি, ব্যক্তিগত মিথস্ক্রিয়া ও যোগাযোগের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর অনুভূত বা বাস্তব সামাজিক চাপের কারণে এগুলো টিকে থাকে। সামাজিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি কমাতে প্রত্যেক ব্যক্তি তাদের কার্যক্রমে এসব রীতিনীতি মেনে চলে। সামাজিক প্রথার প্রকৃতির কারণে যখন তারা ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত হয়, যেমনটা হয় শিশুবিয়ের ক্ষেত্রে, তখন তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে ও পরিবর্তন আনতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো কার্যকর যোগাযোগ। তথ্য প্রচার ও সংলাপের ওপর ভিত্তি করে কৌশলগত প্রচার মাধ্যম ও যোগাযোগ এই প্রথা এবং রীতিনীতিগুলোর প্রভাব ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ দিতে পারে। প্রত্যাশিত স্বাভাবিকতার একটি নতুন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। পাশাপাশি জনগণের অসহিষ্ণুতাকে বাড়িয়ে দিয়ে অনুভূত সামাজিক চাপ, বিশ্বাস ও প্রত্যাশাসমূহকে চিহ্নিত করে। ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই শুরু হওয়া জাতীয় মাল্টিমিডিয়া প্রচারাভিযান এই লক্ষ্য অর্জনে একটি পদক্ষেপ।

এই প্রচারাভিযান শিশুবিয়ে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেছে, কারণ এটি:

  • ক্ষতিকারক: শিশুবিয়ে একটি মেয়েকে সুরক্ষা দেয় না বা তার জন্য কোনো সুফল বয়ে আনা না। বরং তার কাছ থেকে শৈশব ও জীবনের সুযোগগুলো কেড়ে নেয়। এটি কোনও সম্প্রদায় বা সমাজের জন্য সুফল বয়ে আনে না। অথচ একজন শিক্ষিত যুবা দেশের জন্য একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে।
  • অবৈধ: শিশুবিয়ে অবৈধ। এ সংক্রান্ত আইন খুবই স্পষ্ট এবং এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও অবহেলা অজুহাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
  • সেকেলে: প্রতিনিয়িত লোকজন শিশুবিয়ে থেকে দূরে সরছে। কারণ এর প্রয়োজন নেই এবং একটি সমাজের জন্য এটি ক্ষতিকর।

একটি সার্বজনীন ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা হিসেবে এই প্রচারাভিযান প্রতিরোধের কথা বলে।

প্রচারাভিযানটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি শিশুবিয়ে প্রতিরোধ ও সক্রিয় প্রত্যাখানকে প্রত্যেকের দায়িত্ববোধে পরিণত করে। এটি ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং এই ধারণা প্রচার করার চেষ্টা করে যে; যখন প্রত্যেকের কর্মকাণ্ড একত্রিত করা হয়, তখন তারা একটি সমষ্টিগত আন্দোলন তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনে অবদান রাখে।

প্রত্যেকেরই একটি ভূমিকা রয়েছে এবং তারা যা করতে পারে:

  • গবেষণা: শিশুবিয়ের প্রভাব এবং ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে আরও জানুন।
  • বিরত থাকুন: আপনার পরিবার, প্রতিবেশী ও বৃহত্তর সম্প্রদায়ের মধ্যে শিশুবিয়েতে অংশগ্রহণ বা উপস্থিত থাকা থেকে বিরত থাকুন
  • প্রতিরোধ করুন: শিশুবিয়ে আয়োজনে বা এতে সহায়তার জন্য আপনাকে সম্পৃক্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করুন
  • আওয়াজ তুলুন: আপনার পরিবার, প্রতিবেশী বা বৃহত্তর সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে বা আয়োজন করা হচ্ছে- এমন যেকোনো শিশুবিয়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন
  • সমাবেশ: শিশুবিয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সক্রিয় থাকুন এবং আপনার পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী, বৃহত্তর সম্প্রদায় ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত থাকুন
  • প্রতিবেদন: আপনার পরিবার, প্রতিবেশী বা বৃহত্তর সম্প্রদায়ের মধ্যে হতে যাচ্ছে- এমন শিশুবিয়ের ঘটনাবলী সম্পর্কে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন

প্রচারাভিযানের থিম: ‘আওয়াজ তোলো’

প্রত্যেকে যাতে একত্রে আওয়াজ তুলতে পারে এবং শিশুবিয়ের ঘটনা জানাতে পারে সেজন্য এই প্রচারাভিযান মনোযোগ আকর্ষণ ও প্রতিবাদ জোরালো করার প্রতীক হিসেবে প্রচলিত ‘ঢোল’ বা ড্রাম ব্যবহার করে একটি ধ্বনিস্পন্দ বা ছন্দের প্রস্তাব দেয়। এর লক্ষ্য হচ্ছে একটি সহজ, অংশগ্রহণমূলক এবং অত্যন্ত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ যা শিশুবিয়ের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং কার্যক্রমকে প্রতিফলিত করে।

শিশুবিয়ে রুখতে হলে, আওয়াজ তোলো তালে তালে
UNICEF Bangladesh

শিশুবিয়ে রুখতে হলে, আওয়াজ তোলো তালে তালে

প্রচারাভিযানের সম্পদসমূহ

  • গণমাধ্যম
    o ৫টি টিভি স্পট: এশিয়াটিক জেডব্লিউটি নির্মিত
    o ৫টি রেডিও স্পট: বাংলাদেশ বেতার নির্মিত
    o ২৬ পর্বের টিভি ধারাবাহিক নাটক (৬ মাসের জন্য চালাতে): এশিয়াটিক জেডব্লিউটি নির্মিত
    o ৯২৬ পর্বের রেডিও ধারাবাহিক নাটক (৬ মাসের জন্য চালাতে): বাংলাদেশ বেতার নির্মিত
    o ৯০ মিনিটের ডকু-ড্রামা [মোবাইল ফিল্ম শোতে দেখানো হবে]: এশিয়াটিক জেডব্লিউটি নির্মিত
    o সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন
  • ঘটনাবলী
    o জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠান শুরু করা
    o চারটি অনুষ্ঠান উপ-জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন করা
  • আউটডোর
    o ৫টি পোস্টার
    o ফেস্টুন
    o বিলবোর্ড
    o দেয়াল লিখন
  • সামাজিক/ডিজিটাল গণমাধ্যম
    o o এই প্রচারাভিযানের প্রচারণা চালাতে ফেসবুক, ইউটিউব ও মোবাইল ম্যাসেজিংয়ের মতো ডিজিটাল গণমাধ্যম ব্যবহার করা হবে এবং কিশোর-কিশোরী ও তাদের বাবা-মায়ের জন্য একটি ইন্টারেকটিভ প্লাটফরম তৈরি করা হবে

এই প্রচারাভিযান ইউনিসেফের ‘শিশু অধিকারের জন্য অনুকূল পরিবেশ’ শীর্ষক প্রকল্প এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে গড়ে তোলা হয়েছে। মূল সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএ। কানাডা সরকার তহবিলের যোগান দিয়েছে। প্রচারাভিযানটি তৈরি করেছে এশিয়াটিক জেডব্লিউটি। অন্য সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়।