শিশুর প্রতি আচরণে পরিবর্তন    

সুস্থ, সৃজনশীল শৈশবের জন্য প্রয়োজন আলোকিত সমাজ

সমাজে শিক্ষার আলো আনবে শিশু
UNICEF/UNI111877/Mojumder

চ্যালেঞ্জ

নির্দিষ্ট কিছু পারিবারিক আচরণ জন্মের আগে থেকে শুরু করে শৈশব পেরোনোর আগ পর্যন্ত শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে

মানুষের আচরণ বৈচিত্র্যপূর্ণ। কোনো বিষয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য সে বিষয়ে সামাজিক আচরণের কারণগুলোর দিকে নজর দিতে হয়।

বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে যে সব আচরণ শিশুর অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা পর্যন্ত সে সব আচরণের সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা নানা সামাজিক রীতি-নীতি, লৈঙ্গিক প্রথা, আইন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকারিতার ঘাটতি এবং অত্যাবশ্যকীয় সেবা পৌঁছানোর প্রতিবন্ধকতা-এসব কিছু মিলেই শিশুর অধিকার, উন্নয়ন এবং সমাজে তাদের অংশগ্রহণে বাধা তৈরি করে।

কিছু নির্দিষ্ট পারিবারিক আচরণ জন্মের আগে থেকে শুরু করে শৈশব পেরোনোর আগ পর্যন্ত শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে জরুরি তথ্য দিয়ে সচেতনতা তৈরিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বায়ন ও সামাজিক বৈষম্য।

এদেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশই বস্তিতে বসবাস করায় দ্রুত নগরায়ন মৌলিক সেবার ওপর আর চাপ তৈরি করছে। বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় সবাই সুবিধা না পাওয়ায় বহু পরিবার শিশুদের চাহিদা মেটাতে পারে না। এসব শিশুর অধিকার, বিকাশ ও সুরক্ষা নিয়ে কোনো কথাও তারা বলতে পারে না।অনেক ক্ষেত্রে শিশুর জন্য যে সব সেবা রয়েছে সে বিষয়গুলো সম্পর্কেও তারা জানে না।

গণমাধ্যমের অপ্রতুলতার কারণেও কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে।বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এখনও ‘মিডিয়া-ডার্ক’ এলাকায় অর্থাৎ তারা টিভি, রেডিও ও ইন্টারনেটের বাইরে রয়ে গেছে।

ওই সব পরিবারের শিশুদের কাছে পৌঁছাতে সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে ব্যাপকভাবে কমিউনিটিভিত্তিক যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।

অপ্রতুল জ্ঞান, মনগড়া গল্প, ভুল ধারণা, বৈরী মনোভাব ও অন্যের ক্ষতি করার মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য সেখানে কার্যকর তথ্য, অংশগ্রহণের মঞ্চ এবং উপযুক্ত নীতি নিয়ে যেতে হবে।

মাঠ পর্যায়ে কাজের ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন না করলে সবাইকে জীবন রক্ষাকারী সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না।

সাভারের পোড়াবাড়িতে ইউনিসেফের সাহায্যে পরিচালিত একটি স্কুলের ছাত্ররা
UNICEF/UN031131/
সাভারের পোড়াবাড়িতে ইউনিসেফের সাহায্যে পরিচালিত একটি স্কুলের ছাত্ররা

লিঙ্গের ভিত্তিতে যখন সামাজিক প্রথা ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস নির্ধারিত হয়, তখন পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা দেয়

সমাধান

শিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সহায়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক আচরণ চিহ্নিত করেছে ইউনিসেফ

শৈশবের সব পর্যায়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে ইউনিসেফ সামাজিক আচরণের একটা রূপরেখা তৈরি করেছে, যেখানে পরিবার ও সমাজে তাদের সম্পৃক্তির বিষয়ও এসেছে।

গবেষণা সহযোগী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সামনের কাতারের সরকারি কর্মী এবং টিভি, জাতীয় ও কমিউনিটি রেডিও, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সহযোগিতা এবং তাদের সুবিধা ব্যবহার করে এসব বক্তব্য তৈরি করে তা প্রচার করা হয়।

শিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সহায়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক আচরণ চিহ্নিত করেছে ইউনিসেফ।এ বিষয়গুলো শৈশবের পুরোটাজুড়ে, প্রয়োজনমাফিক প্রাপ্তবয়স্কদের স্বভাব পাল্টানোর অনুঘটকের ভূমিকা রাখে।

নবজাতকের জীবন রক্ষা

তৃণমূল পর্যায়ে গর্ভধারণকালে মায়ের চারটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি হাসপাতালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সন্তাস প্রসব নিশ্চিতে কাজ করে ইউনিসেফ। সদ্যোজাতের আবশ্যিক যত্ন কীভাবে নিতে হয় সেই নির্দেশনাও পৌঁছে দিই আমরা।

জীবন রক্ষায় পরিচ্ছন্নতা

মৌলিক পরিচ্ছন্নতার জ্ঞান বাংলাদেশের মানুষের বেশ মাত্রায় থাকলেও ঠিকভাবে হাত ধোওয়ার চর্চায় বেশ পিছিয়ে। অথচ এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এর উপরই নির্ভর করে কোনো উন্নতি হবে কি না।

তাই ইউনিসেফ চারটি জরুরি সময়ে সাবান দিয়ে হাত ধোওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ক্রমাগত বলে যাচ্ছে: ক. টয়লেটের পর, খ. বাচ্চা পায়খানা করলে তাকে পরিষ্কার করানোর পর, গ. খাবারের আগে এবং ঘ. শিশুকে খাওয়ানোর আগে।

শিশুর সঠিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে

বাড়ন্ত সময়ে আবশ্যিক পুষ্টির অভাবে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ থেকে এই সমস্যা দূর করতে জন্মের প্রথম ছয় মাস যেন শিশুকে ব্যাপকভাকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয় তা নিশ্চিতে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে ইউনিসেফ।

ছয় মাস পরে বুকের দুধের সঙ্গে ফল, শাকসব্জি আর প্রাণিজ আমিষ অর্থাৎ ডিম, মাংস খাওয়াতে মা ও পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

সময়মতো জন্ম নিবন্ধন

জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যেই শিশুর জন্ম নিবন্ধন সেরে সনদটি সংরক্ষণ করে রাখতে বাবা, মা এবং যৌথ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বোঝায় ইউনিসেফ।

শৈশবের পরিচর্যা ও বিকাশ

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য বাড়িতে শিক্ষনীয় পরিবেশ তৈরি, শারীরিক নির্যাতন বন্ধ, অন্তত তিনটি খেলনা দেওয়া, তাদের সঙ্গে কথা বলা ও খেলাধুলা করা, ভালো আচরণের প্রশংসা করতে মা, বাবা ও অন্যদের উৎসাহিত করে ইউনিসেফ।

তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে শিশুকে ইসিসিডি-আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট কেন্দ্রে ভর্তি করানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়।

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা

ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, ছয় বা তার বেশি বয়সী শিশুকে যেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে তার লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়া হয় সেজন্য বাবা-মাকে উৎসাহিত করে ইউনিসেফ। একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার গুরুত্ব ও অন্যান্য মৌলিক বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।

শিশুর ওপর সহিংসতা রোধ

স্কুল ও বাসায় যাতে শিশুর সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ করা হয় তা নিশ্চিতে সরকার, শিক্ষক ও বাবা-মায়েদের সঙ্গে আলোচনা করে ইউনিসেফ।শিশুর সুরক্ষায় চালু হওয়া ন্যাশনাল চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবহার করতেও উৎসাহিত করা হয়।

শিশু শ্রম ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে শিশু ও শৈশব নিয়ে বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেও কাজ করা হয়।

বাল্য বিয়ের অবসান

বয়স ১৮ হওয়ার আগে যে মেয়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিয়ে এবং সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত হয় না সে বিষয়টি কিশোর ও কিশোরী, তাদের অভিভাবক এবং কমিউনিটি সদস্যদের অবহিত করা হয়।

শিশুর বিয়ে আয়োজন এবং তাতে অংশগ্রহণ না করতে লোকজনদের উৎসাহিত করে ইউনিসেফ।ক্ষতিকর এই কাজের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কমিউনিটি সদস্যরা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন সে বিষয়গুলোও তাদের সামনে তুলে ধরা হয়।বাল্য বিয়ে ঠেকাতে  হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ফোন করে জানাতে বলা হয় তাদের।

কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষার সুযোগ

লেখাপড়া অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে ছেলে-মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে তদের বাবা-মা এবং কমিউনিটি সদস্যদের বোঝায় ইউনিসেফ। পাশাপাশি তারা যাতে ঝামেলাহীনভাবে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারে তার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতেও কাজ করা হয়।জীবনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ তাদের দেওয়া হয়।

বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য সেবা

কিশোর-কিশোরীদের ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা, যথাযথ পুষ্টি, এইচআইভি/এইডস থেকে সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করতে ইউনিসেফ এসব ছেলে-মেয়ে, তাদের বাবা-মা,  সমাজের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্বাস্থ্য কর্মী এবং অন্যান্য সেবা দাতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ইউনিসেফ। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবার দাবি তুলতেও উৎসাহিত করে।

জাতীয় উন্নয়নে কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণ

নিজস্ব পরিচয় সৃষ্টি আর পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে যুব সমাজের ভূমিকায় গতি সঞ্চারের কথা মাথায় রেখে ইউনিসেফ কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণ আর ক্ষমতায়নের মঞ্চ তৈরিতে কাজ করে।

এই বিষয়ে আরও জানতে

ন।আ।