পার্বত্য চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ

সুবিধাবঞ্চিত কমিউনিটির শিশুদের কাছে মৌলিক সেবা পৌঁছানো

​​বান্দরবান জেলার একটি নদীর চরে খেলছে শিশুরা
UNICEF/ UNI185825/Mawa

চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ভূ-খণ্ড পাহাড় ও উপত্যকায় পূর্ণ। এখানে মৌলিক সেবা পৌঁছানো একটি চ্যালেঞ্জ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৬ লাখ মানুষের বসবাস। এই অঞ্চল বাংলাদেশের মোট ভূ-খণ্ডের ১০ শতাংশ হলেও এখানে বাস করে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ।

বাসিন্দাদের প্রায় অর্ধেক ১৩টি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্য। অনেক প্রজন্ম ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করে আসছে ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো। বাকি প্রায় ৫৩ শতাংশ বাঙালি। আলাদা আলাদা বসতি তৈরি করে বাস করে এখানকার মানুষ। এসব বসতিকে বলা হয় এক একটি ‘পাড়া’।

ব্যতিক্রমী বাসিন্দা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং সংস্কৃতি ও রীতি-নীতিতে বৈচিত্র্য থেকে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর কারণেই নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দারা। প্রাক শৈশব বিকাশ ও যত্ন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চর্চা রয়েছে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোতে।

গর্ভবতী মায়ের অন্তত চার বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হয়। খাগড়াছড়িতে মাত্র ১৭ শতাংশ মা জরুরি এই ভিজিটের জন্য চিকিৎসকের কাছে যান, রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের তথ্য অনুযায়ী

এখানে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস জাতীয় পর্যায়ের তুলনায় ভালো। তবে সম্প্রদায় ভিন্নতায় এ বিষয়ে জ্ঞান ও সচেতনতার তফাৎ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ম্রো সম্প্রদায়ে শিশুদের দুই মাস বয়স থেকেই মায়ের দুধের পাশাপাশি তাদের দাদি/নানিদের মুখে চাবানো ভাত খাওয়ানো হয়।

শিশুর সম্পূরক খাবারের বিষয়ে বাংলাদেশের বাবা-মায়েদের মধ্যে সাধারণত খুব একটা সচেতনতা নেই। সেই তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ছোট শিশুদের খাবারের বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা আরও কম। এটা শিশুদের খর্বাকায় হওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আর খর্বাকৃতি হয় তীব্র অপুষ্টির কারণে। খর্বকায় শিশুরা তাদের বয়সের তুলনায় লম্বায় খাটো। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪৯ শতাংশের মতো শিশু খর্বকায়, যে হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি

পার্বত্য চট্টগ্রামে খুব স্বল্প সংখ্যক ছেলে-মেয়ের পুষ্টির ঘাটতি পূরণকারী খাবার পাওয়ার সুযোগ আছে। রাঙ্গামাটিতে কারও আইরন-ফলিক এসিড (আইএফএ) গ্রহণের রেকর্ড নেই। খাগড়াছড়িতে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো, সেখানে ইউনিসেফের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত পাড়া সেন্টার থেকে এগুলো দেওয়া হয়।

দেশের অন্যান্য জায়গায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন ৩২ শতাংশ ল্যাট্টিন সনাতন পদ্ধতির, যা ব্যাপক মাত্রায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। জাতীয় পর্যায়ে খোলা জায়গায় মল ত্যাগের হার যেখানে ৫ শতাংশ সেখানে বান্দরবানে তা ২৩ শতাংশ। 

চাকমা পরিবারের মা ও শিশু

জেলাগুলোর অধিকাংশ এলাকা ‘মিডিয়া ডার্ক’ হওয়ায়, অর্থাৎ সেখানে টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্র খুব কম লোকের কাছে যাওয়ায় জরুরি বার্তাগুলো পৌঁছানোও একটি চ্যালেঞ্জ।

বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক স্টেশন থাকলেও সব উপজেলায় তা প্রচারিত হয় না। নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ভাষায় কথা বলায় সেখানে যোগাযোগের একক কোনো ভাষাও নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীদের শ্রমসাধ্য কাজ, সন্তান লালন-পালন এবং গৃহস্থালির অতিরিক্ত চাপ নিতে হয় যেমন, বন থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও অনেক দূর থেকে পানি আনার মতো কাজ। এর উপর গোষ্ঠীগুলোর নারীদের অনেকে অপুষ্টি ভোগে এবং ক্ষতিকর সামাজিক রীতি-নীতির কারণে তারা স্বাস্থ্য সেবাও গ্রহণ করে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলাই জাতীয় গড় উন্নয়নের চেয়ে পেছনে থাকছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন সহায়তা ফ্রেমওয়ার্ক-ইউএনডিএএফ চিহ্নিত সবচেয়ে পশ্চাদপদ বাংলাদেশের ২০টি জেলার তালিকায় নীচের সারিতে আছে এই জেলাগুলো

সমাধান

৫,০০০ পাড়া সেন্টারের মাধ্যমে তিনটি জেলায় মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ইউনিসেফ

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের বলিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগীদের অন্যতম ইউনিসেফ।

এই সংস্থা আশির দশক থেকে সমন্বিত কমিউনিটি উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে আসছে। এর আওতায় ওই এলাকায় শিশুর উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি-পয়ঃনিষ্কাশন, হাইজিন এবং উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এরপর ১৯৯৬ সালে এই প্রকল্পের আওতায় নতুন মডেলে মৌলিক সেবা প্রদান শুরু করা হয়। প্রত্যন্ত পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বসতি বা ‘পাড়া’ ঘিরে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

মায়েদের আয়রন ট্যাবলেট সম্বন্ধে জানাচ্ছে একজন পাড়া কর্মী

শিশুর জীবনের প্রথম ১০০০ দিন: পাড়া সেন্টার থেকে গর্ভকালীন মায়েদের সেবা, প্রতিষেধক ও নবজাতকের সেবা দেওয়া হয়। অপরিণত শিশুদের প্রতি নেওয়া হয় বিশেষ যত্ন। এখানে ক্যাঙ্গারু মাতৃ সেবা, শাল দুধ খাওয়ানো এবং শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশুর যথাযথ বৃদ্ধি হচ্ছে কি না তা দেখার পাশাপাশি তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সঠিক পরিচর্যা এবং হাইজিন বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। জন্ম নিবন্ধন জনপ্রিয় করতেও কাজ করেন পাড়াকর্মীরা।


 

রাঙ্গামাটিতে একটি প্রি-প্রাইমারি স্কুল

প্রাক প্রথমিক শিক্ষা ও সুরক্ষা: পাড়া সেন্টার থেকে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতিষেধক ও কৃমিনাশক প্রদান, শিশুদের হাত ধোঁয়া ও টয়লেট ব্যবহারের অভ্যাস করানো এবং অসুস্থ শিশুদের সেবা দেওয়া হয়। শিশুকে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগানো এবং তাদের সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ বিষয়ে বাবা-মাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।


 

জ্যৈষ্ঠ পাড়া কর্মী রিতিশ্রী চাকমা

সেবাদাতাদের জন্য সেবা: পারস্পারিক সহায়তা, সামাজিক সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান, শিশুর বিকাশ সম্পর্কে ধারণা, ইতিবাচক কর্মকাণ্ড, পুষ্টি নিয়ে পরামর্শ এবং পানি নিরাপত্তা ও নিরাপদ টয়লেট ব্যবহারের মতো হাইজিন কর্মকাণ্ড নিয়েও কাজ করা হয় এই প্রকল্পের আওতায়।


 

   

পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি শিশু

পরিবারের সহায়তা: শিশুর বিকাশে বাবা-মায়ের ইতিবাচক ভূমিকা জোরদারের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক শিশু সেবা উন্নত করা, অধিক সংখ্যক শিশুর মৌলিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে পাড়া সেন্টার। এলাকার বাসিন্দাদের নগদ অর্থ স্থানান্তরসহ সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বলয়ও তৈরি করে।


 

    

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় পাঁচ হাজার পাড়া সেন্টারের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের মৌলিক সেবাগুলো দিয়ে আসছে ইউনিসেফ। ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে এই পাড়া সেন্টার নেটওয়ার্ক কার্যকর ভূমিকা পালন করে এবং ওই এলাকার বাসিন্দারাও সেগুলো খুব ভালোভাবে গ্রহণ করে।

এই সফলতার কারণেই কঠিন পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা পাড়া সেন্টারগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরিতে প্রধান অর্থদাতা হয়ে ওঠে সরকার।

এই দৃষ্টান্তকে সামনে রেখেই ২০১৭ সালে ওই এলাকায় স্থায়ীভাবে সামাজিক সেবাগুলো প্রদানের লক্ষ্যে নতুন পন্থায় কাজ শুরু করে সরকার ও ইউনিসেফ। 

টেকশই স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ
টেকসই পাড়া কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ

সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো মার জন্য পুষ্টি সেবা এবং অসুস্থ নবজাতকের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য পাড়া কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী ও এনজিও কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে ইউনিসেফ।

পাড়া সেন্টারের মাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরার স্ট্র্যাটেজিতে আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট বা ইসিডি প্যাকেজ ব্যবহার করা হয়।

বৈশ্বিক অগ্রাধিকার হিসেবে মর্যাদা পাওয়া ইসিডিতে ২০৩০ সাল নাগাদ শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষায় এক গুচ্ছ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

জাতীয় পর্যায়ে সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, জাতীয় শিশু নীতি এবং আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট পলিসিতে জীবনের শুরুর দিকে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য বিনিয়োগে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে।