নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিন

গুণগত মান, সবার জন্য সমান সুযোগ ও টেকসই ব্যবস্থা

A student demonstrates proper handwashing techniques for his classmates and teachers at a school in Mirpur, Dhaka.
UNICEF/UNI157180/Khan

চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ

উন্মুক্ত জায়গায় মলত্যাগ বন্ধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। ২০১৩ সালে পরিচালিত ইউনিসেফের একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে একই টয়লেট একাধিক ব্যক্তি ও পরিবারের ব্যবহারের হার অনেক বেশি এবং শহরের বস্তিগুলোতেই তা সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে মৌলিক পরিচ্ছন্নতা বা হাইজিন সম্পর্কে মানুষের ধারণা খুব ভালো। তবে পরিচ্ছন্নতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঠিকমতো হাত ধোওয়ার অভ্যাস খুব একটা নেই।

ওই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ বলেছেন, গুরুত্বপূরণ সময়ে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নেন তারা।

ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো শহরেই রীতিসম্মত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা নেই। আর রাজধানীতেও প্রতি পাঁচ জনে মাত্র একজন এই ব্যবস্থার আওতায় আছেন।

প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে মাত্র দুটি পরিবার শিশুর মলমূত্র ঠিকমতো সরিয়ে ফেলে। অথচ মলমূত্রের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা না হলে অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে, এমনকি শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। মাটির গর্ত করে তৈরি করা প্রতি চারটি টয়লেটের মধ্যে একটি অস্বাস্থ্যকর এবং সেগুলোতে ঢাকনা না থাকায় তা পরিবেশ দূষিত করে।

পয়ঃনিষ্কাশনের সঙ্গে শিশুর ডায়রিয়া ও খর্বকায়ত্বের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অনুন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে ডায়রিয়া, অন্ত্রের প্রদাহ ও কৃমির মতো সমস্যা দেখা দেয়।

বাংলাদেশে শতকার ৮৪ ভাগ বিদ্যালয়ে টয়লেট থাকলেও সেগুলোর মাত্র ২৪ ভাগ উন্নত, ব্যবহারোপযোগী ও পরিচ্ছন্ন 

প্রতিবন্ধী শিশুদের ব্যবহার উপযোগী পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামোর অভাব রয়েছে।

ধনী-দরিদ্র ভেদে পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও লৈঙ্গিক ভিত্তিতেও এই ব্যবধান রয়েছে। ইউনিসেফের ২০১৩ সালের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ধনীদের তুলনায় দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের অনুন্নত স্যানিটেশন ব্যবহারের হার ১০ গুণ বেশি।

গ্রামের ৩৩ শতাংশ পরিবার শিশুদের মল নিরাপদ স্থানে অপসারণ করে। অপরদিকে শহরে এই হার ৬০ দশমিক ২ শতাংশ।

বাংলাদেশের মেয়েদের মধ্যে ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতার জ্ঞান ও চর্চায় ঘাটতি রয়েছে। ন্যাশনাল হাইজিন বেসলাইন সার্ভের তথ্য মতে, মাত্র ৩৬ শতাংশ কিশোরী তার প্রথম ঋতুস্রাবের সময় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকে। এতে দেখা যায়, মাত্র ১০ শতাংশ মেয়ে ঋতুকালে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে।

জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর মানুষ শহরমুখী হওয়া-এ সবের সমন্বিত প্রভাবে বাংলাদেশ পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এখানে ঘনঘন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। এতে টয়লেট উপচে নোংরা ছড়িয়ে খাবার পানির বিভিন্ন উৎস দূষিত হয়।

শহরের বস্তি, দ্বীপাঞ্চল, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকা এবং জলাভূমিতে টেকসই পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কম খরচের, জলবায়ু সহিষ্ণু পয়ঃনিষ্কাশন প্রযুক্তি অন্যতম।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যমত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতার ঘাটতির কারণে বছরে ৪২০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়। এই অর্থ বাংলাদেশের জিডিপির ৬ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। অপরদিকে বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে তার প্রায় ২ দশমিক ৩ গুণ বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে।

Students stand in front of a latrine facility built with support from UNICEF at Krishnopur High School, Rokonpur, Chapai Nawabganj.
UNICEF/UNI138969/Haque
চাঁপাই নবাবগঞ্জের রোকনপুরের কৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালেয়ের ছাত্রীরা ইউনিসেফের সহায়তায় নির্মিত টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে।

মাত্র ২২ শতাংশ স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই গোপনীয়তা রক্ষার সুযোগ

সমাধান

২০৩০ সাল নাগাদ সাত কোটি ২০ লাখ মানুষকে উন্নত স্যানিটেশন সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করছে ইউনিসেফ

শিশু, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের অধিকার রক্ষায় সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে ইউনিসেফ।

জরুরি পরিস্থিতিতে যখন শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে তখন তাদের নিরাপদ স্যানিটেশন ও হাইজিন সেবা দিতে কাজ করে এই জাতিসংঘ সংস্থা।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয় ইউনিসেফ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও হাইজিন সেবার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে ইউনিসেফ।

অনিরাপদভাবে আশপাশে মল ছড়ানো রোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও সবাই সমান সুযোগ পায়, এমন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্যানিটেশন ম্যানেজমেন্ট চেইনজুড়েই কাজ করে ইউনিসেফ।

হাইজিন বিষয়ে চার ক্ষেত্রে মানুষের অভ্যাস বদলের ওপর গুরুত্ব দেয় ইউনিসেফ। এগুলো হল- সাবান দিয়ে হাত ধোওয়া, নিরাপদ পানি, ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা আর মলমূত্রের নিরাপদ অপসারণ।

স্কুলগুলোতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলে শিক্ষার্থী ভর্তি, উপস্থিতি, লেখাপড়া শেষ করার হার এবং প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের দিক দিয়ে উন্নতি হয়।

স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে মায়ের সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো সুষ্ঠু পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলায় নবজাতকের মৃত্যু ৪৪ শতাংশ এবং শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের সেবাদাতাদের জন্যও মানসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং হাইজিন অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে নিরাপদ পানি সরবরাহ রোগীদের জীবাণু সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং তার জীবনমানের উন্নয়ন ঘটায়।

ইউনিসেফের কার্যক্রমে নারী ও মেয়েদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতার স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে পয়ঃনিষ্কাশনের পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং নারী ও মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা, লেখাপড়া শেষ করার হার, বিশেষ করে কিশোরীদের শিক্ষা সমাপনীর হার এবং বিয়ের বয়স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল আনে। 

ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকায় ক্লাসে তাদের উপস্থিতি ১০ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ে এবং ঋতুস্রাবের সময় সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ থাকলে উপস্থিতি বাড়ে ২০ শতাংশ পয়েন্ট।

অপুষ্টির অন্যতম কারণ ডায়রিয়া এবং অন্ত্রে প্রদাহজনিত রোগ এড়াতে স্যানিটেশন ও উন্নত হাইজিন ব্যবস্থা নিশ্চিতে সহযোগিতা করে ইউনিসেফ

মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি জাতীয় নীতি গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং অর্থায়নে মুখ্য ভূমিকা রাখে ইউনিসেফের কার্যক্রম।

জলবায়ু সহিষ্ণু প্রযুক্তির প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি এ খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে ইউনিসেফ। এটা সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সামাল ও অভিযোজনের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে।

উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য সমন্বিত মডেল সবার সামনে নিয়ে এসেছে ইউনিসেফ। খোলা জায়গায় মলত্যাগের অভ্যাস দূর করতে জনগণের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জলবায়ু সহিষ্ণু, নারী ও প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার উপযোগী পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য স্যানিটেশন বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নেও কাজ করে ইউনিসেফ।

টেকসই ও যে কোনো সংকট সামাল দেওয়ার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইউনিসেফ কমিউনিটি সদস্যদের তথ্য, সহায়তা ও সম্পদের যোগান দেয়।

ইউনিসেফ বিশ্বাস করে, কমিউনিটির সদস্যদের সম্পৃক্ত করা ও ক্ষমতায়ন এবং তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বিশেষত নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সেবা টেকসই করতে সহায়ক হবে।

নাগরিক সমাজের নানা সংগঠনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে মিলে কাজ করে ইউনিসেফ। বিভিন্ন সেবায় কমিউনিটির সদস্যদের সম্পৃক্ত করা, তাদের মধ্যে এসবকে নিজেদের মনে করার উপলব্ধি এনে দেওয়া, সামাজিক পরিবর্তন এবং পলিসি পরিবর্তনে তারা যেন সোচ্চার হন সে লক্ষ্যে এটা করা হয়।

এই বিষয়ে আরও জানতে