নিরাপদ পানি পানের সুযোগ তৈরী করা

গুণগতমান, সবার জন্য সহজলভ্য ও টেকসই ব্যবস্থা

Girl collects water in pot at Sunamganj
UNICEF/UNI63649/Noorani

চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বাাধিক আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস

বিশুদ্ধ পানি সব ধরনের মানবাধিকারের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।

সবার জন্য উন্নত উৎসের পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ৯৭ শতাংশের বেশি মানুষের উন্নত উৎসের পানি পাওয়ার সুযোগ আছে, জানা যায় ২০১৩ সালের একটি জরিপে

তবে পুরোপুরি নিরাপদ পানি পানের সুযোগ এখনও সীমিত, মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

২০০০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে আর্সেনিক যুক্ত পানি পানকারীর হার ২৬ দশমিক ৬ থেকে কমে ১২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এরপরেও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস বাংলাদেশে।

অগ্রগতি সত্ত্বেও এক কোটি ৯৪ লাখ মানুষ এখনও সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। এছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহ দূষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে।

বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

মলের জীবাণু রয়েছে এমন উৎসের পানি পান করছে ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ। এক্ষেত্রে স্বল্প শিক্ষিত নগরবাসী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ২০১৩ সালের জরিপে বলা হয়েছে।

শহরাঞ্চলের এসব পরিবারে যে পানি খাওয়া হয় তার এক তৃতীয়াংশেই উচ্চমাত্রার ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়া থাকে, যা ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, উৎস থেকে বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহের সময় এতে আরও বেশি ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া চলে যায়।

প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটি, অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া দূষিত উৎসের পানি পান করে।  আবার ঘরের কল বা টিউব-ওয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকায় বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যা হয়ে দাড়ায় নয় কোটি ৯০ লাখ।

Children collect water at Kharikkhyong Govt School in Bangladesh
UNICEF/UNI170323/Mawa
পার্বত্য চট্টগ্রামের খারিক্ষয়ন সরকারী বিদ্যালয়ে ছাত্ররা পানি সংগ্রহ করছে।

পাহাড়ি এলাকা, শহরের বস্তি, দ্বীপাঞ্চল, উপকূলীয় ও জলাভূমিতে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এসব জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য পানির উৎস পাওয়া কঠিন

সারা দেশের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিনের অবস্থা ভালো না হওয়ায় সেগুলো থেকেও জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং তা নবজাতক ও মাতৃ মৃত্যু হার কমানোর অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে যত নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে তার প্রায় ২০ শতাংশই হয়েছে জীবাণু সংক্রমণের কারণে।

এছাড়া ঘনঘন বন্যা, ভূমিধ্বস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে শৌচাগার উপচে ময়লা ছড়িয়ে পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যায় মানুষ নগরমুখী হওয়ার কারণে এসবের সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশে পরিবেশগত দুর্যোগ ঘটে।

শিল্পবর্জ্য, সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং জমিতে লবণাক্ত পানির কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণও বাংলাদেশে পানির গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অঞ্চলভেদেও পানির মানে উল্লেখযোগ্য অসমতার প্রমাণ পেয়েছে ইউনিসেফ।যেমন রংপুর বিভাগে ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়ামুক্ত পানি পান করে। সেখানে সিলেটে এ হার মাত্র ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ।

ধনী-দরিদ্র ভেদেও মানসম্পন্ন পানি পাওয়ার সুযোগে তফাৎ রয়েছে। ধনীরা নিজেদের বাড়িতেই খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করে। অপরদিকে সরকারি বা অন্য কোনো উৎস থেকে পানি আনতে দরিদ্র মানুষরা আলাদা করে সময় আর শ্রম দিতে বাধ্য হয়। 

ইউনিসেফের ২০১৩ সালের একটি জরিপে পানির সংগ্রহে নারী-পুরুষের ভূমিকার ভিন্নতা দেখা গেছে। ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ নারী পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহ করেন। অপরদিকে এই দায়িত্ব পালন করেন মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ।

নিরাপদ খাবার পানি এবং স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার অভাব  শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, সুরক্ষাসহ অন্যান্য বিষয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

Woman wades through floodwaters
UNICEF/UNI170747/Paul

ঘনঘন বন্যা, ভূমিধ্বস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে

সমাধান

আর্সেনিক মুক্ত ইউনিয়ন ও উপজেলার উদাহরন ব্যবহার করে ইউনিসেফ সমন্বিত মডেল উপস্থাপন করে

সবার জন্য নিরাপদ খাবার পানির টেকসই ব্যবস্থার জন্য ইউনিসেফ তিনটি পর্যায়ে কাজ করে: পানির উৎস, পানি পৌঁছানোর সেবা এবং পানি খাত।

শিশু, বিশেষ করে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অধিকার রক্ষায় সরকার ও সহযোগীদের সঙ্গে মিলে কাজ করে ইউনিসেফ। জরুরি পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ পানি সরবরাহেও কাজ করা হয়।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয় ইউনিসেফ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পানি সরবরাহ কার্যক্রম জোরদারে ইউনিসেফ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে সহযোগিতা দিচ্ছে ইউনিসেফ। এতে করে শিক্ষার্থীদের ভর্তি, উপস্থিতি এবং লেখাপড়া শেষ করা ও শিক্ষা অর্জনে অগ্রগতি আসছে। ইউনিসেফের একই কার্যক্রমে প্রারম্ভিক শৈশব সেন্টারগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

স্বাস্থ্য সেবায় ইউনিসেফ নবজাতক ও মায়েদের সুপেয় পানি প্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধার প্রতি বিশেষ নজর দেয়। কারণ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ধাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি করে এবং মা ও শিশুর মৃত্যুর হার কমায়।

নিরাপদ পানি এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের সেবাদাতাদের জন্যও অপরিহার্য। নিরাপদ পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং উন্নত হাইজিন রোগীদের জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা এবং তার জীবনমানের উন্নয়ন ঘটায়।

২০৩০ সাল নাগাদ দুই কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানি প্রাপ্তির টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ

ইউনিসেফের কার্যক্রমে নারী ও মেয়েদের প্রতি নজর দেওয়ার পাশাপাশি ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতার স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়। মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির সরবরাহে এই পর্বে লেখাপড়া শেষ করার হার, বিশেষ করে কিশোরীদের শিক্ষা সমাপনীর হার এবং বিয়ের বয়স বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

অপুষ্টির অন্যতম কারণ ডায়রিয়া এবং অন্ত্রে প্রদাহজনিত রোগ এড়াতেও সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনে সহযোগিতা দেয় ইউনিসেফ।

দুর্গম অঞ্চলে কম ব্যয়ে সেবা দেওয়ার জন্য সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে ইউনিসেফ। যেমন ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে ইউনিসেফের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বস্তিগুলোতে বৈধ পানির সংযোগ দেওয়া সহজ হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকার জমিতে লবণাক্ততা ঢোকা বন্ধে সমাধান বের করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ। এছাড়া জলবায়ু সহিষ্ণু প্রযুক্তির প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতা করার পাশাপাশি এ খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে ইউনিসেফ।

সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, অভিযোজন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সামলে নেওয়ার কার্যক্রমেও সমন্বয় করা হয়।

নিরাপদ পানি নিশ্চিতের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার লক্ষ্যে আর্সেনিকমুক্ত ইউনিয়ন ও উপজেলাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনে এক্ষেত্রে সমন্বিত মডেল তুলে ধরেছে ইউনিসেফ। কমিউনিটিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা প্রণয়ন, কার্যক্রম পরিচালনা এবং সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে নারীর অংশগ্রহণ কীভাবে টেকসই ও ফলপ্রসূ করা দরকার, তা ইউনিসেফের কর্মসূচিতে তুলে ধরা হয়।

টেকসই ও যে কোনো সংকট সামাল দেওয়ার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কমিউনিটি সদস্যদের তথ্য, সহায়তা ও সম্পদের যোগান দেওয়া হয়। 

ইউনিসেফ মনে করে, কমিউনিটির সদস্যদের সম্পৃক্ত করা ও ক্ষমতায়ন এবং তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বিশেষত নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সেবা টেকসই করতে সহায়ক হবে।

নাগরিক সমাজের নানা সংগঠনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে মিলে কাজ করে ইউনিসেফ। বিভিন্ন সেবায় কমিউনিটির সদস্যদের সম্পৃক্ত করা, তাদের মধ্যে এসবকে নিজেদের মনে করার উপলব্ধি এনে দেওয়া, সামাজিক পরিবর্তন এবং পলিসি পরিবর্তনে তারা যেন সোচ্চার হন সে লক্ষ্যে এটা করা হয়।