নগরের শিশু

দ্রুত নগরায়ন ঘটছে যেসব দেশে তার শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ

Child labourer Faisal Hosain carries a basket on his head at Dhaka's Mirpur fish market.
UNICEF/UNI8542/Aminuzzaman

চ্যালেঞ্জ

২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মেগাসিটি হবে

সারা বিশ্বেই দ্রুত নগরায়ন ঘটছে এবং বাংলাদেশ সেই সব দেশের তালিকায় রয়েছে, যেগুলোতে শিগগিরই বৈশ্বিক নাগরিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাস হবে।  

১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে বর্ধনশীল মেগাসিটিগুলোর মধ্যে অন্যতম।

বাংলাদেশে শহরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৩ লাখ, যাদের প্রায় ৪০ শতাংশই শিশু। আগামী ৩০ বছরে শহরের বাসিন্দার সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। তখন প্রায় ১১ কোটি ২ লাখ মানুষের বসবাস হবে নগরে।

প্রতি বছর বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে। এই বাস্তবতার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে মানুষ তার গ্রামের ঘরবাড়ি এবং জীবন-জীবিকা হারিয়ে শহরে চলে আসে। এছাড়া গার্মেন্ট শিল্পের দ্রুত বিকাশের ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থানের সুযোগ নিতে অনেকে শহরে আসছে।

কিন্তু শহরের জীবনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

ঢাকার মিরপুরের দুয়ারিপাড়া বস্তি
UNICEF/UN044346/Sujan
ঢাকার মিরপুরের দুয়ারিপাড়া বস্তি

গ্রাম থেকে আসা এসব মানুষের একটা বড় অংশের ঠিকানা হয় বস্তি। ঢাকা শহরে পাঁচ হাজারের বেশি বস্তি রয়েছে, যেখানে আনুমানিক ৪০ লাখ মানুষের বসবাস।

২০১৩ সালে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)’ এর তথ্য অনুযায়ী, বস্তিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশই এক কক্ষে বসবাস করে।

বস্তি এলাকার শিশুদের জীবন খুবই কঠিন এবং অনেক সময় বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। এদের মধ্যে উচ্চ হারে অপুষ্টি, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, বাল্য বিয়ে, শিশু শ্রম ও হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে।

২০১৬ সালে পরিচালিত ‘চাইল্ড ওয়েল বিং সার্ভে’ এবং এমআইসিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বস্তির শিশুদের অবস্থা গ্রামের শিশুদের চেয়ে অনেক খারাপ।

বস্তিগুলোতে অবকাঠামো ও সেবার ঘাটতি রয়েছে এবং সব সময় সেখানে উচ্ছেদ আতঙ্ক থকে। কেননা বস্তিগুলো গড়ে উঠেছে সাধারণত নিচু এলাকায়। বস্তিতে বসবাসকারী শহরের এই দরিদ্র মানুষগুলো সব সময় বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

বাংলাদেশের প্রধান শহর ঢাকায় জমির পরিমাণ সীমিত। এর ওপর ইতোমধ্যে দুর্বল সেবা খাত ও ভঙ্গুর পরিবেশের ওপর চাপ ফেলছে দ্রুত নগরায়ন। বস্তিতে বসবাসকারী শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং তাদের পরিবারের মধ্যে কী কী সেবা তারা পাবে সে বিষয়ে জানাবোঝা, সচেতনতা এবং এসব সেবা দাবি করার মতো সামর্থ্য নেই।

দুর্বল বর্জ্য ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট পানি ও পরিবেশ দূষণ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। শহরের যেসব এলাকায় অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটছে, সেসব এলাকায় ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকছে অনেক বেশি।

যাত্রাবাড়ি বস্তিতে পরিবারের সাথে এই ঘরটিতে থাকে ১০ বছরের চুমকি।
UNICEF/UN01339/Mawa
যাত্রাবাড়ি বস্তিতে পরিবারের সাথে এই ঘরটিতে থাকে ১০ বছরের চুমকি।

বস্তিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশই এক কক্ষে বসবাস করে

অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত জনবহুল শহরগুলোতে লৈঙ্গিক সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে তেমন নজর দেওয়া হয় না। ছেলে ও মেয়েদের নগর জীবনের অভিজ্ঞতা হয় ভিন্ন ভিন্ন। হয়রানি, সহিংসতা ও আক্রমণাত্মক আচরণের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকির বাইরেও মেয়ে ও নারীরা প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনে অনেক ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নগর পরিবহন ব্যবস্থায় নারীদের যৌন হয়রানির ঝুঁকি রোধে এখনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এছাড়া স্কুল ও কর্মস্থলে মেয়ে শিক্ষার্থী ও নারী কর্মীদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থাও হয়ে ওঠেনি।

সামাজিক আচরণে দ্রুত নগরায়নের প্রভাব অত্যন্ত জটিল। ব্যক্তি ও পরিবারগুলোকে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে লড়াই করতে হওয়ায় তাদের নগর জীবনের অনেক বিষয়ের মোকাবেলা করতে হয়।

নানাভাবে এসব চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে পারে: চাকরির অনিশ্চয়তা, সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সেবার ক্ষেত্রে তুমুল প্রতিযোগিতা, গাদাগাদি করে বসবাস এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব।

সম্পর্ক ও পারিবারিক কাঠামোয় পরিবর্তন এবং ঐতিহ্যগত সহযোগিতামূলক ব্যবস্থায় ধস আরও মানসিক চাপ তৈরি করে। এর ফলশ্রুতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রীতি-নীতি ও আচরণে পরিবর্তন হয়ে থাকে।

ঢাকার উত্তর কাফরুলের একটি স্কুলে যাচ্ছে ৭ বছরের সুস্মিতা।
UNICEF/UN08397/Mawa
ঢাকার উত্তর কাফরুলের একটি স্কুলে যাচ্ছে ৭ বছরের সুস্মিতা।

হয়রানি, সহিংসতা ও আক্রমণাত্মক আচরণের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকির বাইরেও মেয়ে ও নারীরা প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনে অনেক ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়।

সমাধান

উন্নততর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকারকে সহযোগিতা করে ইউনিসেফ

শহরে মৌলিক সেবার বাইরে থাকা দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ইউনিসেফ শিশুদের জন্য নগর উন্নয়নের কর্মসূচি প্রণয়নে কৌশলগতভাবে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।

সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর কাছে কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও তহবিল দেওয়ার জন্য বলে আসছে ইউনিসেফ। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়নের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা ও সম্পদের বরাদ্দ দেওয়ার জন্যও বলা হচ্ছে।

জবাবদিহি নিশ্চিতের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের অনেক বিষয়ের বিদ্যমান অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় শহরের শিশুদের জন্য যাতে বরাদ্দ রাখা হয় সেজন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে উৎসাহিত করছে ইউনিসেফ।

ইউনিসেফের নগর কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয় সব বিষয়গুলোকে একত্রিত করে-স্বাস্থ্য থেকে সোশ্যাল পলিসি- শিশুর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের সব জরুরি প্রয়োজন শনাক্ত করে সেগুলো পূরণের দিকে নজর দেওয়া হয়।

মিরপুর বস্তির একটি স্বাস্থ কেন্দ্রে ওজন নেওয়া হচ্ছে ৪ মাসের সাদিয়ার।

সদ্যোজাত থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য:

স্বাস্থ্য, পুষ্টি, আর্লি চাইল্ডহুড সেবা এবং মা থেকে শিশুর শরীরে এইচআইভি যাওয়া প্রতিরোধ করা। সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান কর্মীদের দিয়ে অভিভাবকদের শিশুর জন্ম নিবন্ধন করানো।

গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকদের ছেলে-মেয়েসহ শহরের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার, স্কুলপূর্ব শিক্ষা ও প্রি-স্কুল সেন্টার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে ইউনিসেফ।

ইউনিসেফ বস্তিবাসীদের জন্য নিরাপদ পানি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।

করাইল বস্তির একটি ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীরা

ছয় থেকে ১০ বছরের শিশুদের জন্য:

শিশু শ্রম ও বাল্য বিয়ে বন্ধ এবং শিশুদের আবার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ করছে ইউনিসেফ। শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিচার বিভাগকে সহযোগিতা করছে সংস্থাটি।

ইউনিসেফের সাহায্যে পরিচালিত একটি কিশোর-কিশোরী ক্লাব।

১১ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের জন্য:

ইউনিসেফ কমিউনিটি ও স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরীদের জন্য ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা ও এইচআইভি সংক্রমণ রোধসহ স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা অন্তর্ভুক্ত করেছে।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আইন এবং জাতীয় শিশুশ্রম দূরীকরণ নীতিমালা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে ইউনিসেফ। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষমতায়নের কার্যক্রম গ্রহণে সরকারকে সহযোগিতার পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনের নিয়ামক ‍হিসেবে তাদের গড়ে তুলতেও সহযোগিতা করবে ইউনিসেফ।

নগর পরিকল্পনায় লৈঙ্গিক সমতা ও শিশু অধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তির জন্য বাস্তবসম্মত পদ্ধতি বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইউনিসেফ। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যক্রম তদারকি এবং নারী ও মেয়েদের নিরাপত্তা, চলাচল, মানসম্মত সেবা গ্রহণ ও জ্ঞান আহরণে প্রতিবন্ধকতা শনাক্তে ডেটা সিস্টেম ব্যবহার ও বিভিন্ন গবেষণা/সমীক্ষা পরিচালনায় সহযোগিতা এবং তার ফলাফল কাজে লাগানো হয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল আরবান প্রোগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারকে উৎসাহিত করছে ইউনিসেফ।

এই প্রোগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্থানীয় সরকারের বডিগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, যা শিশুবান্ধব শহর গড়ার উদ্যোগ সফল করবে বলে মনে করে ইউনিসেফ।

সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ শহর, জোন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কাঠামোর মাধ্যমে এলাকার নানা সমস্যা ও সেগুলো সমাধানের কৌশল বের করা, স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ, তদারকি এবং বিভিন্ন সেক্টরের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক জোরদারে দায়বদ্ধ থাকে।

বাংলাদেশে নগরায়নে পোশাক খাতের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে ‘শিশু অধিকার ও ব্যবসায়িক নীতিমালা’র ওপর ভিত্তি করে তহবিল সংগ্রহ এবং কারখানাভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য গার্মেন্ট মালিকপক্ষের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে ইউনিসেফ।

নারী কারখানা কর্মীদের স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ দিচ্ছেন একজন কমিউনিটি কর্মী।
UNICEF/UNI133312/Khan
নারী কারখানা কর্মীদের স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ দিচ্ছেন একজন কমিউনিটি কর্মী।

শহরের শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন ক্ষেত্রের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে অংশীদারিত্ব তৈরি করছে ইউনিসেফ

শিশুবান্ধব শহুরে পরিবেশ তৈরি এবং নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নাগরিকদের সুসম্পর্ক তৈরিতে সব বয়স, শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শহরের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তরুণ-তরুণী হওয়ায় এক্ষেত্রে শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণকে খুবই জরুরি মনে করে ইউনিসেফ।

কমিউনিটি উন্নয়ন কমিটি এবং বস্তি উন্নয়ন কমিটিগুলোর সামর্থ্য বৃদ্ধি করার মাধ্যমে নাগরিক অংশগ্রহণ জোরালো করতে নগর কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করে ইউনিসেফ।

এর মাধ্যমে কমিউনিটির সদস্যরা তাদের সমস্যা-উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন, সামাজিক সেবার ব্যবহার, ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা ও রীতি-নীতি পরিত্যাগ এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণে অপরিহার্য পারিবারিক আচরণ রপ্ত করতে পারে।

এই বিষয়ে আরও জানতে

চাইলদ ওয়েল বিয়িং