সামাজিক প্রতিকূলতার মাঝে মেয়ে ফুটবলারদের সন্ধান

মেয়ে/নারী ফুটবল খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ পরিবার থেকে আসা

আকরাম হোসেন
প্রিয়া দত্ত, গোপালগঞ্জের মেয়ে ফুটবলার
UNICEF Bangladesh/2019/Mawa

31 জুলাই 2019

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলগুলো তাদের ধারাবাহিক জয়ের মাধ্যমে জাতির জন্য গর্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, রক্ষণশীল এই সমাজে দলগুলো গঠন করা মোটেও সহজ ছিল না। 

মেয়ে/নারী ফুটবল খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ পরিবার থেকে আসা। খেলাধুলা শুরু করতে এবং চালিয়ে যেতে তাদেরকে বাল্যবিবাহের মতো পারিবারিক প্রতিরোধ এবং সামাজিক অশুভ বিষয়গুলোর বিরূদ্ধে লড়তে হয়।

মেয়ে ফুটবলাদের ক্ষমতায়ন এবং তাদের সহযোগীতা করতে ইউনিসেফ অনুর্দ্ধ ১৬ জাতীয় মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ ও জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ ২০১৯ এর জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশানের অংশীদার হয়েছে।

সামাজিক অনুপ্রেরণা ও প্রচার

সম্ভাব্য ফুটবলারদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের বাবা-মাকে উদ্ধুদ্ধ করতে জেলা পর্যায়ে কোচ নিয়োগ করা হয়েছে। মেয়েদেরকে খেলাধুলায় অংশ নেবার জন্য উদ্ধুদ্ধ করতে গ্রামীণ অঞ্চলে কখনো কখনো লাউডস্পিকারে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।

গোপালগঞ্জ জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান মানি বলেন, “যখন আমরা গ্রামে গিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের মেয়েদের ফুটবলের দক্ষতা ও আগ্রহ সম্পর্কে কথা বলেছি তখন তাদের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, এটি তাদের মেয়েদের পড়াশোনা নষ্ট করবে।”

তিনি আরো বলেন যে, “এমনকি প্রশিক্ষণের সময় কয়েকজন বাবা-মা এসে ঘোষণা করেন যে, তারা তাদের মেয়ের জন্য বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। তারপরে, আমরা বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্য আমাদের সকল প্রচেষ্টা চালিয়েছি।”

গত মাসের শেষদিকে এই অঞ্চলের ছয়টি জেলা নিয়ে গোপালগঞ্জে অনুষ্ঠিত তিনদিনের চ্যাম্পিয়নশীপে বাছাইয়ের প্রাথমিক পর্বের মূল সংগঠক ছিলেন আবদুল।

আবদুল বলেন, “জেলা পর্যায়ে এখন যে দলগুলো খেলছে, আমরা প্রাথমিকভাবে সেই দলগুলোর জন্য খেলোয়ার নির্বাচন করেছিলাম এবং ফিটনেসের জন্য মেয়েদের মেডিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছিলাম।” 

গোপালগঞ্জ মেয়ে ফুটবল দলের ষ্ট্রাইকার প্রিয়া দত্ত
UNICEF Bangladesh/2019/Mawa
গোপালগঞ্জ মেয়ে ফুটবল দলের ষ্ট্রাইকার প্রিয়া দত্ত অনুশীলন করছে।

সম্ভাব্য ভবিষ্যত তারকা অনুসন্ধান

দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে ঘিরে রংপুর, রাজশাহী, যশোহর, খাগড়াছড়ি এবং মংমনসিংহে একই ধরনের খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশানের মিডিয়া প্রধান আহসান আহমেদ অমিত বলেন, এই চ্যাম্পিয়নশীপে মোট ৩৯টি জেলা দল অংশ নিয়েছিলো। 

তিনি বলেন, “প্রতিটি মাঠে আমাদের ফেডারেশানের কোচ এবং প্রতিনিধি ছিলেন। আঞ্চলিক কোচের সাথে তারাও সতক©ভাবে খেলাগুলো পয©বেক্ষণ করেছেন। তারা সম্ভাব্য ভবিষ্যতের তারকাদের সন্ধানে রয়েছেন। এইসব বাছাই চ্যাম্পিয়নশীপ শেষে আমরা ছয়টি চ্যাম্পিয়ন দল এবং দু’টি রানার আপ দল পাবো।”

এসব দল প্রতিটি গ্রুপে চারটি করে দলে ভাগ হয়ে দু’টি গ্রুপে রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে খেলবে। তারা ফেডারেশানের কারিগরি কমিটি, কোচ এবং বিচারকদের দ্বারা পরিচালিত একটি বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে।

“এভাবেই আমরা অনূর্ধ-১২, ১৪, ১৫ এবং ১৮ দল গঠন করেছি। প্রতিভা বাছাই কম©সূচি’র চূড়ান্ত রাউন্ড শেষে আমরা সম্ভাব্য অনেক ফুটবলার পাবো”-চ্যাম্পিয়নশিপে আয়োজক দলের খেলোয়াড়রা যখন তাদের বিজয় উদযাপন করছিল ঠিক সে সময় গোপালগঞ্জের শেখ মনি স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি কথাগুলো বলছিলেন।

বিভিন্ন ম্যাচে সেরা পারফরমেন্সের ভিত্তিতে কোচেরা প্রাথমিকভাবে ছয়জন মেয়ের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন।

মেয়েদের বড় স্বপ্ন দেখা শুরু

গোপালগঞ্জ দলের ষ্ট্রাইকার প্রিয়া দত্ত তাদেরই একজন। কাঠমিস্ত্রি বাবা যিনি তার চারজনের পরিবারের সবাইকে ঠিকমতো খেতে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, এমন পরিবারের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে বলে যে, “জাতীয় দলের জন্য খেলাই হলো আমার মূল লক্ষ্য।”

বাগেরহাট দলের কোচ অমিত রায় বলেন, “অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে এসেছে। এই উদ্যোগ তাদের জন্য সুযোগের দ্বার খুলে দিবে। একদিন তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জাতীয় মহিলা দলের জন্য খেলবে।”

এদের মতো মেয়েদের কারনেই দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপের অনূর্ধ-১৪, অনূর্ধ-১৬, অনূর্ধ-১৮’তে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশী মহিলা ফুটবল দল এখন এশিয়ার সেরা আটটি ফুটবল দলের মধ্যে একটি।”

আহসান দাবী করে বলেন যে, “অসাধারণ দক্ষতার জন্য মেয়ে ফুটবলারদের ধন্যবাদ। মেয়েরা যে ফুটবল খেলছে এটি আর এখন কোনো অদ্ভুত ঘটনা নয়। মানুষের দৃষ্টি এখন মূলত: মেয়ে ফুটবলারদের দিকেই। গ্রামের কিছু কিছু বাবা-মাও এখন চায় যেন তাদের মেয় সন্তানরা খেলায় অংশ নেয়।”