শিশু অধিকার সনদ ফোরামে শিশুরা সংখ্যালঘু অধিকারকে তুলে ধরেছে

বাংলাদেশের শিশু অধিকারের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতে শিশু অধিকারকে আরো সুরক্ষিত করার উপায় নিয়ে আলোচনা

এড্রিয়েন ব্লানচার্ড
শিশু অধিকার সনদ ফোরামে আলোচনা
UNICEF Bangladesh/2019/Rahat

20 আগস্ট 2019

“এখানে উপস্থিত থাকা এবং মারমা সম্প্রদায় ও আমাদের সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ,” চট্রগ্রামে অনুষ্ঠিত প্রথম শিশু অধিকার সনদ ৩০ ফোরামের অংশগ্রহণকারি হিসাবে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার সময় উর্মি নামে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ১৬ বছর বয়সী এক মেয়ে এসব কথা বলেন। 

পাবর্ত্য চট্রগ্রামের তিনটি জেলার একটি হলো বান্দরবান এবং বান্দরবানেই উর্মির বাড়ি। উর্মি আরো বলে, “আমাদের এধরনের আলোচনার কোনো সুযোগ নাই। শিশুদেরকে এসব আলোচনায় অন্তর্ভূক্ত করা হয় না। সুতরাং, এখানে উপস্থিত থাকতে পেরে এবং আমার সমবয়সীদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আলোচনা করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।”

শিশুদেরকে অধিকার সম্পর্কে বলার সুযোগ

শিশু অধিকার সনদের (সিআরসি) ৩০তম বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশানের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ তরুণদের শক্তিকে ব্যবহার করেছিলো এবং একইসাথে শিশু অধিকার নিয়ে দেশব্যাপী সংলাপের জন্য সিআরসি ৩০ ফোরাম চালু করেছিলো।   

সারা দেশের তরুণরা সিআরসি ৩০ ফোরামে অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশের শিশু অধিকারের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতে শিশু অধিকারকে আরো সুরক্ষিত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে এই ফোরামে বিশেষজ্ঞ, নীতি নির্ধারক এবং সামাজিক মতামতকে প্রভাবিত করেন এমন ব্যক্তিরা অংশ নিয়েছিলো।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাল্যবিবাহ থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ে সহিংসতা ও তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সংখ্যালঘু অধিকারসহ বাংলাদেশে শিশু অধিকারের জন্য হুমকি হতে পারে এমন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে এই ফোরামে আলোচনা করা হয়েছিলো।

এই ফোরামে অংশগ্রহণকারী তরুণরা অবশ্য এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে কথা বলার চেয়ে আরো অনেক বেশি কিছু করেছিলো। এছাড়াও তারা এসব সমস্যাগুলো সমাধানেরও চেষ্টা করেছিলো। কার্যকরভারে সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং শিশুর অধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য নীতিগত সুপারিশমালা প্রনয়নে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কাজ করেছিলো। এরপর স্থানীয় নেতৃবৃন্দের নিকট তারা সুপারিশমালা উপস্থাপন করেছিলো।

সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা

পাব©ত্য অঞ্চল বাংলাদেশের সর্বাধিক বৈচিত্র্যপূণ© হলেও এ অঞ্চল সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত। দশকের পর দশক ধরে চলা সহিংস লড়াই এই অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং এতে করে বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়ন ও বিকাশের সুযোগ থেকে অঞ্চলটি বঞ্চিত হয়েছে।

মৃদুভাষি হলেও তার সম্প্রদায় যেসব দুর্দশায় জর্জরিত সেগুলো সম্পর্কে উর্মির অনেক কিছু বলার ছিলো। উর্মি বলে, “পাবর্ত্য অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই তাদের সন্তানদের সম্পর্কে চিন্তা করে না। অন্যরাও আমাদের শিক্ষা সম্পর্কেও ভাবে না। আমাদের ভালো বিদ্যালয়ের প্রয়োজন।”

“আমাদের সাথে সমান আচরণ করা হয় না।” জাতিগত সংখ্যালঘুরা যে সব বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন সেগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে উর্মি আরো বলে, “সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোতে প্রচুর পরিমাণে মাদকের সরবরাহ আছে। নারী ও শিশুরা প্রায়শই পাচারের শিকার হচ্ছে।”

কারন, পাবর্ত্য চট্রগ্রামে অবস্থিত ১১ টি জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে মারমা একটি জাতিগত সংখ্যালঘু এবং উর্মি মারমা সম্প্রদায়ভূক্ত। উর্মি আরো জানায় যে, প্রায়শই সে তার ক্লাশের সহপাঠিদের দ্বারা গালিগালাজের শিকার হতো; এমনকি শিক্ষকরাও তাকে উপহাস করতো।

“যেমন তারা আমার নাম নিয়ে মজা করতো। কারন, আমার নামটি ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা নাম নয়। এটি ছিল একটি মারমা নাম।” সে ইসলাম ধর্মাবলম্বী না হলেও তার শিক্ষকরা কখনো কখনো তাকে হিজার পরতে বাধ্য করতো।

যদিও উর্মি বলেছিলো যে, তার সাথে এ সব আচরণ করা ছিল ‘অত্যন্ত অপমানজনক’; তবুও সে তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে ছিলো গর্বিত। নিজের সংস্কৃতি চর্চা করার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে উর্মি তার ঐতিহ্যগত গান এবং মারমা নৃত্য পরিবেশন করেছিলো।“পরবর্তী প্রজন্ম যেন আমাদের সংস্কৃতিকে কখনোই ভুলে না যায়”- এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে উর্মি টেলিভিশনে এসব পরিবেশন করার স্বপ্ন দেখে।

সংখ্যালঘু অধিকার একটি সাধারণ উদ্বেগ

উৎসাহের বিষয় হলো, কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশ না হয়েও, উর্মির কয়েকজন সহপাঠি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলো। ১৭ বছর বয়সী ওইন্দ্রিলা ফোরামে উপস্থিত কর্মকর্তাদের জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠির কেন “এখনও সঠিক সাংস্কৃতিক সুরক্ষা নেই”-এই বিষয়টি জোর দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো।

এছাড়াও ওইন্দ্রিলা পাবর্ত্য চট্রগ্রাম অঞ্চলে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের অভাবের বিষয়টিতে জোর দিয়েছিলো যা তার সাথে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের উত্তপ্ত কিন্তু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আলোচনার সূত্রপাত করেছিলো।

স্থানীয় সংবাদপত্রের একজন সম্পাদক ওইন্দ্রিলাকে সংশোধন করার চেষ্টা করে বলেছিলেন যে, পাবত্য© চট্রগ্রাম অঞ্চলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। পাবর্ত্য চট্রগ্রাম অঞ্চলে উন্নত প্রশাসনের আহ্বান জানিয়ে প্রতিত্তুরে ওইন্দ্রিলা বলেছিলো যে, “প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভালোভাবে কাজ করছে না। এমন অচল ব্যবস্থা থাকার চেযে না থাকাই ভাল।”

অন্যান্য সুপারিশমালার মধ্যে, ফোরামে অংশগ্রহণকারিগন পাবর্ত্য চট্রগ্রাম অঞ্চলে উন্নত শিক্ষা, উন্নত সাংস্কৃতিক সুরক্ষা, ভূমি বিরোধের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং আদিবাসী সম্প্রদায় ও সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে আরো সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।

শিশু অধিকার সনদের ধারা ৩০ এবং সংখ্যালঘু শিশুদের অধিকারের প্রতি অংশগ্রহণকারিদের প্রতিশ্রুতি ছিল অবিচল। এই অনুচ্ছেদে পরিস্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “সে সব রাষ্ট্রে জাতিগত, ধর্মীয় অথবা ভাষাগত সংখ্যালঘু অথবা আদিবাসী বংশোদ্ভুত ব্যক্তি রয়েছেন, এসব সংখ্য্যালঘু অথবা আদিবাসী সম্প্রদায়ের কোনো শিশুর তার বা তার দলের অন্য সদস্যদের সাথে সম্প্রদায়ের মধ্যে, নিজস্ব সংস্কৃতি পালন করা, নিজস্ব ধম© প্রচার বা পালন করা অথবা তার নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করার অধিকারকে অস্বীকার করা যাবে না।”

ইউনিসেফকে আরও জানুন