শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানষিক নির্যাতনের প্রতিকার চায় শিক্ষার্থীরা

কিশোর-কিশোরীদের কথা শোনা এবং তাদের সাথে কাজ করার মাধ্যমেই এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব

এড্রিয়েন ব্লানচার্ড
সিআরসি ফোরাম, চট্টগ্রাম
UNICEF Bangladesh/2019/Rahat

05 সেপ্টেম্বর 2019

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিপিড়ন ও নির্যাতন নিয়ে আলোচনা করা ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মনে কেবলমাত্র একটি বিষয়ই ছিল এবং সেটি হলো - নুসরাত।

মাত্র কয়েক মাস আগে নুসরাত জাহান রাফি নামে এক কিশোরীকে তার মাদ্রাসার ছাদে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষকসহ তার মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করার পরপরই ঘটনাটি ঘটেছিল।

চট্রগ্রাম থেকে আসা ১৭ বছর বয়সী তিশা বলে, “এই ঘটনাটি সারা দেশকে নাড়া দিয়েছিল।” তিশা আরো জানায় যে, এরকম ঘটনা গ্রামাঞ্চলে অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো প্রকাশিত হয় না।

সম্প্রতি চট্রগ্রামে অনুষ্ঠিত সিআরসি ফোরামের আলোচনায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা জানায়, টেবিলে উপস্থিত সকল কিশোর-কিশোরীর জন্য নুসরাতের গল্পটি ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক এবং তাদের কেউই আর কখনোই এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি সহ্য করবে না। তাদের মতে, সারাদেশে শিশু অধিকারকে আরো সুরক্ষিত করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করা এবং ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ন্যায়বিচার পাবার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শিশুদের দাবী জানানোর সুযোগ

শিশু অধিকার সনদের (সিআরসি) ৩০ তম বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশানের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ তরুণদের শক্তিকে ব্যবহার করেছিলো এবং একইসাথে শিশু অধিকার নিয়ে দেশব্যাপী সংলাপের জন্য সিআরসি ৩০ ফোরাম চালু করেছিলো।  

সারা দেশের তরুণরা সিআরসি ৩০ ফোরামে অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশের শিশু অধিকারের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতে শিশু অধিকারকে আরো সুরক্ষিত রাখার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে এই ফোরামে বিশেষজ্ঞ, নীতি নির্ধারক এবং সামাজিক পরিবর্তনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন লোকজন এতে অংশ নিয়েছিল।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাল্যবিবাহ থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ে সহিংসতা ও তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সংখ্যালঘু অধিকারসহ বাংলাদেশে শিশু অধিকারের জন্য হুমকি হতে পারে এমন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে এই ফোরামে আলোচনা করা হয়েছিলো।

এই ফোরামে অংশগ্রহণকারীরা এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে কথা বলার বাইরেও আরো অনেক কিছু করেছিলো। তারা এসব সমস্যাগুলো সমাধানেরও চেষ্টা করেছিলো। কায©করভারে সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং শিশুর অধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য নীতিগত সুপারিশমালা প্রনয়নে অংশগ্রহণকারীরা শিশু-কিশোররা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কাজ করেছিলো। এরপর তাদের উপস্থিতিতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের নিকট তারা সুপারিশমালা উপস্থাপন করেছিলো।

সিআরসি ফোরাম, চট্টগ্রাম
UNICEF Bangladesh/2019/Rahat

মানষিকভাবে ভংগুর এবং নির্যাতিত

১৬ বছর বয়সী শাহারিয়ার বলে যে, “শিক্ষার্থীরাও মানষিকভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।” আরো একটি বেদনাদায়ক ঘটনার উল্লেখ করে সে আরো জানায় যে, অরিত্রি নামে ১৬ বছরের একটি মেয়ে বিদ্যালয়ে তার শিক্ষকদের দ্বারা প্রতিনিয়ত অপমান ও নির্যাতনের শিকার হতো। বিদ্যালয়ে এমন আচরণের কারণে সে আত্মহত্যা করেছিলো। 

তোসিন নামে আরেকটি ছেলে যে তার শিক্ষক দ্বারা একই রকম আচরণের শিকার হয়েছিলো, সে বলে “আমার শিক্ষক আমার সাথে চিৎকার করতো এবং আমার পরিবারকে অপমান করতো।” তোসিন আরো জানায়, “আমি যখন আমার শিক্ষকের কাছ থেকে খুব অপমানিত হতাম, তখন আমি এতটা দুঃখ পেতাম যে, আমি আর কখনো স্কুলে যেতে চাইতাম না। আমি কথাগুলো কখনো আমার বাবা-মাকে বলতে চাইনি কারন কথাগুলো শুনলে তারা হয়তো অনেক বিব্রত হবে। আমি আমার বাবা-মাকে কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি।”

১২ বছর বয়সী তোসিন ছিল এই ফোরামের সবচেয়ে কনিষ্ঠ অংশগ্রহণকারি। কিন্তু তার এই বয়স তাকে তার এবং লক্ষ লক্ষ অন্যান্য বাংলাদেশি শিশুদের পক্ষে কথা বলতে বিরত রাখতে পারে নি। তোসিন বলে, “এখানে যদি সবাই সবার সমস্যা সম্পর্কে কথা বলে, তবেই হয়তো এটি বন্ধ করার সুযোগ ঘটবে। হয়তো অপমান ও হয়রানি বন্ধ হবে এবং আমরা নির্ভয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারবো।”

কিন্তু অন্যান্যরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হয়, তারা যেখানেই যায়, সেখানেই এগুলো তাদেরকে অনুসরণ করে।

তবে, অন্যদের মধ্যে যারা বিদ্যালয়ে নির্যাতনের শিকার হয়, তারা যেখানেই যায় সেখানেই এই নির্যাতনের বিভিষিকাময় স্মৃতি তাদের বয়ে বেড়াতে হয়।

নলাইনে হুমকির শিকার

শাহারিয়ার জানায়, “অনলাইনে সব সময়ই হুমকি চলতে থাকে। সে বলে যে, “তারা আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেছিলো এবং বলেছিল যে, তারা আমার ছবিগুলো খারাপ সাইটে ছড়িয়ে দিবে।”

তার মতে, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে সংযোগ অনেকটাই বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এটি হুমকিদাতাদেরকেও শক্তিশালী করেছে। কারন, হুমকিদাতারা এখন যেকোনো সময় এবং যেকোনো জায়গায় ক্ষতিগ্রস্থদের কাছে পৌঁছাতে পারে। সে মত প্রকাশ করে যে, “একজন হুমকিদাতা হবার জন্য প্রথমেই যে জিনিষটি দরকার সেটি হলো শক্তি।”

পরিস্কারভাবে বলা যেতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিপি[ড়ন ও নির্যাতন হলো বহুমুখি চ্যালেঞ্জ। মানষিক ও শারীরিক এসব নির্যাতন বিভিন্নভাবে হতে পারে। এটি এমন যে, আক্রমনকারি এবং হুমকিদাতারা ক্ষতি করার অভিনব উপায় সন্ধান করে।

নীতিমালার জন্য চাপ প্রয়োগ

এই সমস্যার অন্তর্নিহত জটিলতা স্বীকার করে এই সমস্যার বিভিন্ন দিকের সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীরা একাধিক নীতিমালা গ্রহণের সুপারিশ করে।

শিক্ষক এবং অধ্যক্ষদের জন্য জবাবদিহিতা-ব্যবস্থা উন্নত করা, কিশোরী ও তরুণীদের যৌন হয়রানির বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়া, মানষিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার সুযোগ আরো সহজ করার জন্য তারা সরকারের কাছে দাবি জানায়।   

পুরো ফোরাম জুড়ে, এই অংশগ্রহণকারিরা – শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্যাতনমুক্ত হবে - ভবিষ্যতের এমন কোনো সম্ভাবনা নিয়ে কখনোই সংশয় প্রকাশ করেনি। ইউনিসেফ সবসময়ই এই প্রত্যয়টি ভাগ করে নিয়েছে এবং যার ফলশ্রুতিতে ২০১৯ সালে ‘নির্যাতনবন্ধ সম্পর্কিত যুব ইশতেহার’ প্রকাশিত হয়েছিলো।

কিশোর-কিশোরীদের কাছ থেকে পাওয়া এসব উপদেশের আলোকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্যাতন বন্ধে ইউনিসেফ তাদের কায©ক্রম অব্যাহত রাখবে। কিশোর-কিশোরীদের কথা শোনা এবং তাদের সাথে কাজ করার মাধ্যমেই এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

ইউনিসেফকে আরও জানুন