রোহিঙ্গা নারী ও মেয়ে শিশুদের ক্ষমতায়নে একটি হাতিয়ার হলো জ্ঞান অর্জন

রেডিও লিসেনারস ক্লাব এবং ইনফরমেশন অ্যান্ড ফিডব্যাক সেন্টারগুলো মূল্যবান জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়ে শিশুদের ক্ষমতায়িত করছে।

কেটি জিন
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু
UNICEF Bangladesh/2019/Sujan
22 জুলাই 2020

১৭ বছরের সোফিরা মেধাবী ও স্পষ্টবাদী একটি মেয়ে, নিজের উপস্থিতিকে প্রাণবন্ত করে রাখে তার ব্যক্তিত্তের  চমকে। একদিন সে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের কক্সবাজারের একটি শরণার্থী শিবিরে সমবয়সী মেয়েদের সঙ্গে মিলে রেডিও লিসেনারস বা স্রোতা ক্লাবে যোগ দেয় সে। ক্লাবে সে বাল্য বিয়ে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতি, হাইজিন এবং কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে কীভাবে পরিবারকে রক্ষা করা যায় এসব অনেক বিষয় শেখে।

সোফিরা বলে, যখন সে প্রথম ভাইরাসটির বিষয়ে শুনেছিল তখন খুব ভয় পেয়েছিল। কারণ এটার সম্পর্কে বেশি কিছু জানত না।

“আগে আমি করোনাভাইরাস সম্পর্কে সামান্যই জানতাম। এখন আমি অনেক কিছু জানি এবং নিরাপদ বোধ করি। কারণ আমি জানি কী করতে হবে আর কী করা যাবে না।”

গত মে মাসে যখন তার ক্যাম্পে বিপদ সংকেতের তৃতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়, সোফিরা জানত এটা দিয়ে আসলে কী বোঝায় এবং এই সময়ে কী করতে হয়। রেডিও লিসেনারস ক্লাবে ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং কীভাবে ঝড়ের প্রস্তুতি নিতে হয় তা সে শিখেছিল। একটি পতাকা দিয়ে বোঝায় ঝড় আসছে, দ্বিতীয়টা উঠলে বোঝায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে এবং তৃতীয়টা উঠানো হয় ঝড় আঘাত হানার আনুমানিক ১০ ঘণ্টা আগে।

তৃতীয় পতাকা দেখে সোফিরা দৌড়ে ঘরে গিয়ে মাকে দিয়ে শুকনো খাবারের মজুদ নিশ্চিত করে। নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র প্লাস্টিক ব্যাগে ভরতে বলে। ঝড়ের বিষয়ে তার ছয় ভাই-বোন ও প্রতিবেশীদের অবগত করে এবং ঝড় না যাওয়া পর্যন্ত ঘরের মধ্যে থাকতে বলে। নিজেদের ঘর শক্ত করে বাঁধতে বাবাকে সাহায্য করে সে।  

রাতে ঘূর্ণিঝড় আম্পান বাংলাদেশে আঘাত হানে। সোফিরা ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের তাঁবু ও বাঁশের ঘরের মাঝখানে একসঙ্গে বসে থাকে এবং সারা রাত নির্ঘুম কাটায়। সকালে দেখা যায় তাদের মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত ভেজা।

“এ বছর অন্তত আমাদের ঘরটি বিধ্বস্ত হয়নি,” বলে সাহসী মেয়েটি। গত বছর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে তাদের ঘর বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং নতুন একটি কোয়ার্টারে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের পরিবারকে কয়েক সপ্তাহ একটি কমিউনিটি স্থাপনায় ঘুমাতে হয়।

বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু সোফিরা
UNICEF Bangladesh/2020/Kettie

আগে আমি করোনাভাইরাস সম্পর্কে সামান্যই জানতাম। এখন আমি অনেক কিছু জানি এবং নিরাপদ বোধ করি। কারণ আমি জানি কী করতে হবে আর কী করা যাবে না।

সোফিরা

সোফিরাকে এমন অনেক দুর্যোগ ও বেদনাদায়ক ঘটনা সইতে হয়েছে, যেগুলোর মুখোমুখি তার বয়সী কারও মোকাবেলা করার কথা না। মাত্র কয়েক বছর আগে ভয়ঙ্কর সহিংসতা থেকে বেঁচে যায় সে এবং নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নিজের জন্মভূমি থেকে পালিয়ে আসে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঢলের সময় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছিল যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা তাদেরই একজন সোফিরা এবং তার জায়গা হয়েছে বাংলাদেশের জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরে। 

শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাসকারী কিশোরীদের জীবন কঠিন হতে পারে। তবে প্রতিবার লিসেনারস ক্লাবে গিয়ে সোফিরা যে জ্ঞান অর্জন করছে তাতে সে ক্ষমতায়িত বোধ করছে। যখন সে নিজের কমিউনিটির লোকজনকে শেখাচ্ছে এবং তারা তার কথা শুনছে তখন তার অবস্থান উঁচুতে ওঠে। “লিসেনারস ক্লাবগুলোতে আসতে শুরু করার পর মেয়েরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে,” বলেন রুসমি, ২৩ বছরের বাংলাদেশি এই ত্রাণকর্মী যিনি ইউনিসেফের অংশীদার বিআইটিএ’র সঙ্গে তথ্য সেবা দাতা হিসেবে কাজ করছেন। রুসমি নিজেও প্রায়ই রেডিও লিসেনারস ক্লাবে যান কার্যক্রম তদারক করতে। কিশোরী মেয়েরা তাকে শ্রদ্ধা করে।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বর্তমানে ৯৩টি রেডিও লিসেনারস ক্লাবে সহযোগিতা করছে ইউনিসেফ। এর মধ্য দিয়ে ৯৩০ জন কিশোরী এবং ১৩৯৫ জন কিশোর সেবা পাচ্ছে।

লিসেনারস ক্লাবগুলোতে আসতে শুরু করার পর মেয়েরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

রুসমি
বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু রুসমি।
UNICEF Bangladesh/2020/Kettie

কমিউনিটিতে পরিবর্তনের নিয়ামক রোহিঙ্গা নারীরা

রোহিঙ্গা শিবিরে মানবপাচার, শিশু বিয়ে, কন্যা শিশুর শিক্ষা এবং কোভিড-১৯ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নারী রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের বিভিন্ন গ্রুপ ও আদর্শ মায়েদের নিয়ে কাজ করছে বিআইটিএ। তাছাড়া রোহিঙ্গা কিশোরী মেয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের দিয়ে তাদের সমবয়সীদের কাছে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা ঘটলে অভিযোগ করা বা পরামর্শের ব্যবস্থা কমিউনিটিতে নিশ্চিত করার জন্যও কাজ করছে তারা। রুসমির মতে, ঘরে ঘরে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ও মেয়ে শিশুরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

“নারী স্বেচ্ছাসেবীরা ঘরের ভেতরে যেতে পারেন এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে নারী ও মেয়ে শিশুদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে পারেন,” বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা শরণার্থী আদর্শ মা
UNICEF Bangladesh/2020/Kettie

ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত ইনফরমেশন অ্যান্ড ফিডব্যাক সেন্টার (আইএফসি), যেখানে রুসমি কাজ করেন, সেখানে তিনিই একমাত্র নারী কর্মী। তার সহকর্মীদের ভাষ্য মতে, কোনো একটি দিন রুসমি না এলে নারীরা ভেতরে গিয়ে কোনো পুরুষ স্টাফের সঙ্গে কথা বলতে চান না। এই সেন্টার থেকে কমিউনিটির সদস্যরা প্রয়োজনীয় তথ্য পান এবং সেবাসমূহ সম্পর্কে তাদের অভিমত জানান। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ১৪টি আইএফসি পরিচালনায় সহায়তা করে ইউনিসেফ।

“কমিউনিটিতে একজন আদর্শ মা হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ,”

“আমি যে কাজ করতে পারি তা একজন পুরুষ করতে পারে না এবং এটা আমার মধ্যে জোর বাড়িয়ে দেয়,” বলেন খুশিদা নামের একজন রোহিঙ্গা মা ও স্বেচ্ছাসেবী।

রুসমি বলেন, “মায়েরাই পরিবর্তনের নিয়ামক, ঘরে নৈতিকতার শিক্ষা দেন তিনিই। সবাইকে সুস্থও রাখেন তিনি। আপনি কোনো কিছু সম্পর্কে কমিউনিটিকে জানাতে চাইলে অবশ্যই তা মায়ের মধ্য দিয়ে করতে হবে।”

শরণার্থী নারী ও কন্যা শিশুদের জন্য জ্ঞানই শক্তি

শরণার্থী সংকটের শুরু থেকে কমিউনিটিকে সংগঠিত করা ও সচেতনতার বার্তা প্রদানে নারী ও কন্যা শিশুরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। শিশুদের সঠিকভাবে হাত ধোয়া শেখানো থেকে শুরু করে অপুষ্টির ঝুঁকি প্রশমন, প্রজনন স্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে নারীদের অবগত করাসহ জীবন রক্ষাকারী তথ্য প্রদান এবং সব ক্ষেত্রে আচরণগত পরিবর্তনে নারী কমিউনিটি কর্মীরা দারুন ভূমিকা পালন করছেন।

ইউনিসেফ কক্সবাজারের কমিউনিকেশন ফর ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট অরুনিমা ভাটনগর বলেন, “আমাদের অবশ্যই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত নারী ও কন্যা শিশুদের জন্য বিনিয়োগ করে যেতে হবে। তারা অনেক দিক থেকে ঝুঁকিতে থাকতে পারে, তবে তারা অসহায় নয়। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তারা তাদের কমিউনিটিতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে এবং নিজেদের ও তাদের সন্তানদের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে।”

“আমি অনেক কিছু জানি, যা অন্যরা জানে না এবং এটাই আমার শক্তি। আশা করি, এই জ্ঞান একদিন আমাকে একটি ভালো জায়গায় নিয়ে যাবে,” বলে শেষ করেন সোফিরা।


ইনফরমেশন এ্যান্ড ফিডব্যাক সেন্টারস্‌ এবং অন্যান্য কমিউনিকেশন ফর ডেভলপমেন্ট কর্মসূচিতে অবদান রাখার জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাপান, জার্মানি (কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে), দি ইউনাইটেড স্ট্যাটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট এবং দি ইউএন সেন্ট্রাল ইমারজেন্সি রেসপন্স ফান্ড (ইউএনসিইআরএফ)-এর প্রতি ইউনিসেফ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।