মহামারীর মধ্যে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা

কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবিরে লেখাপড়া অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ

কারেন রেইডি
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু শেফুকা
BRAC/2020/Faruq
02 জুন 2020

কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে বিশ্বজুড়ে স্কুল বন্ধ থাকায় শেফুকার মতো শিক্ষার্থীরা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিদ্যুৎহীন একটি শরণার্থী শিবিরে ঘরে বসে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া অধিকাংশ জায়গার তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মা ও তিন ভাই-বোনের সঙ্গে থাকে নয় বছর বয়সী শেফুকা। তাদের বাবা নেই।

শেফুকা বলে, “আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র (লার্নিং সেন্টার) বন্ধ হওয়ায় আমার খুবই খারাপ লাগে। আমি আগের মতো লেখাপড়া করতে পারছি না। আমি আমার সহপাঠী ও শিক্ষকদের সাথে দেখা হয়না বলে মন খারাপ লাগে।

“আমি বই পড়ি, ছবি আঁকি এবং শিক্ষা কেন্দ্রে যেসব খেলা শিখেছি সেগুলো ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলি। কিন্তু সব সময় বাসায় থাকতে আমার একঘেয়ে লাগে।”

শেফুকার মা ফাতেমা শিক্ষার মূল্য বোঝেন এবং তার ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি উন্নত জীবন চান। পরিবারের প্রধান একজন নারী হিসেবে তাকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি শিক্ষার ওপর খুব গুরুত্ব দেন, বিশেষ করে তার মেয়ের জন্য। 

ফাতেমা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, শুধু ঘরের কাজ করার জন্য নারীদের জন্ম হয়নি। নারীদেরও শিক্ষিত হওয়া উচিত, তাহলে পুরো সমাজই লাভবান হবে। আমি সব সময় আমার মেয়েকে লেখাপড়ায় উৎসাহিত করি। আমার পক্ষে ছেলে-মেয়ের খাবার যোগানো ও দেখভাল করাটা খুব কঠিন। আমরা কোনো রকমে টিকে আছি, কিন্তু এটা একটা সংগ্রাম।”

আমি বই পড়ি, ছবি আঁকি এবং শিক্ষা কেন্দ্রে যেসব খেলা শিখেছি সেগুলো ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলি। কিন্তু সব সময় বাসায় থাকতে আমার একঘেয়ে লাগে।

সেবাদাতাদের নেতৃত্বে ঘরে বসে শিক্ষা

কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি প্রশমনে বাংলাদেশের অন্যান্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। এতে তিন লাখ ১৫ হাজার শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, যাদের দুই লাখ ১৬ হাজারই ইউনিসেফ পরিচালিত আড়াই হাজার শিক্ষা কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত।

কক্সবাজারে ইউনিসেফের এডুকেশন ম্যানেজার চার্লস অ্যাভেলিনো বলেন, “শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য আমরা দ্রুত বিকল্প খুঁজতে শুরু করি। কিন্তু শিবিরে শরণার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের তেমন সুযোগ না থাকায় সেবাদাতাদের  মাধ্যমে শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়া কঠিন। ঘরে বসে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা ব্যাপকভাবে আমাদের প্রচেষ্টায় লাগাম টেনে ধরে।”  

আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, বাংলাদেশি শিক্ষকরা আর শরণার্থী শিবিরে যেতে পারেন না। জনাকীর্ণ এসব শিবিরে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি প্রশমনে সেবাসমূহ বহুলাংশে কমে গেছে, যার মধ্যে মানবিক ত্রাণ সহায়তা কর্মীদের যাতায়াতও অন্তর্ভুক্ত।

ইউনিসেফ এখন শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে অভিভাবক ও সেবাদাতাদেরও সহায়তা প্রয়োজন।

“সেবাদাতাদের নেতৃত্বে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য গাইডলাইন সরবরাহ করেছি। আমরা ছবি সম্বলিত বই, অডিও বার্তা এবং শিশুদের ঘরের কাজের বইও (ওয়ার্কবুক) দিয়েছি। আমরা এখনও সব রোহিঙ্গার ঘরে পৌঁছাতে পারিনি। তবে রোহিঙ্গা শিক্ষকদের সহায়তায় প্রতিটি ঘরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।”

শেফুকা (৯) তার মা ফাতেমার সঙ্গে ঘরে থাকার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে
BRAC/2020/Faruq
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর শেফুকা (৯) তার মা ফাতেমার সঙ্গে ঘরে থাকার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

শিশুদের লেখাপড়ায় সহায়তার জন্য অভিভাবকের সংগ্রাম

শেফুকার শিক্ষক সাফুরা বেগম শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধের সময়ে কীভাবে লেখাপড়া চালিয়ে নিতে হবে তা অভিভাবক, সেবাদাতা ও শিশুদের বোঝাতে ইতোমধ্যে ৩০ জন শিক্ষার্থীর বাড়ি গিয়েছেন। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে হাত ধোয়া ও হাইজিন সম্পর্কেও তাদের বুঝিয়েছেন সাফুরা।

“অধিকাংশ অভিভাবক এসব পরামর্শ মেনে চলছেন। তবে যারা নিরক্ষর তাদের জন্য এটা বেশি চ্যালেঞ্জিং,” বলেন সাফুরা।

আমি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় সহায়তা করি। কিন্তু আমি শেখাতে না পারায় তারা নতুন কিছু শিখতে পারে না। আমি অশিক্ষিত।

সাফুরার মতো ১২০০ রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকের সহায়তায় কাঙ্ক্ষিত এক লাখ শিশুর এক-তৃতীয়াংশ সেবাদাতাদের নেতৃত্বে ঘরে বসে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এসেছে।

নিজের সীমাবদ্ধতার কারণে ছেলে-মেয়েদের একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় লেখাপড়ার জন্য সহায়তা করতে পারবেন কি না তা নিয়ে চিন্তিত শেফুকার মা।

“আমি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় সহায়তা করি। কিন্তু আমি শেখাতে না পারায় তারা নতুন কিছু শিখতে পারে না। আমি অশিক্ষিত,” বলেন ফাতেমা।

রোহিঙ্গা শিশুদের ওপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব

কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সবচেয়ে অসহায় শরণার্থী শিশুদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে, যারা সবচেয়ে অনগ্রসর পরিবার থেকে এসেছে এবং যাদের লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সীমিত।

“কেয়ারগিভার নেতৃত্বাধীন ঘরে বসে শিক্ষার ক্ষেত্রে এটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বাবা-মা অশিক্ষিত হলে তারা ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় গাইড করার মতো অবস্থায় থাকেন না। অনেক রোহিঙ্গা বাবা-মা-ই অশিক্ষিত। তাই ঘরে বসে শিক্ষার মাধ্যমে তাদের পদ্ধতিগত শিক্ষা নিশ্চিত করাটা কঠিন। পরিবার থেকে পরিবারেও এর ভিন্নতা রয়েছে,” বলেন অ্যাভেলিনো।

মা ও শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে ঘরে বসে লেখাপড়া করে শেফুকা
BRAC/2020/Faruq
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মা ও শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে ঘরে বসে লেখাপড়া করে শেফুকা (৯)।

ইউনিসেফ অন্যান্য বিকল্পও খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে শিক্ষিত তরুণ নারীদের সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা রয়েছে যেন তারা ঘরে বসে শিক্ষা এবং রেডিওর মাধ্যমে রেকর্ড করা ক্লাস শিক্ষার্থীদের শুনিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক ও অশিক্ষিত বাবা-মায়েদের সহায়তা করতে পারে।

শেফুকার শিক্ষক এই মহামারীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে চিন্তিত।

“দেশজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এটা কত দিন ধরে চলবে তা আমি ভাবতে পারছি না। লকডাউন উঠে গেলে আমার সব শিক্ষার্থীর মুখ আবার দেখতে পাব কি না তা নিয়েই আমি আতঙ্কিত,” বলেন সাফুরা বেগম।

পূর্ববর্তী জরুরি পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা বলে যে, শিশুরা যত বেশি দিন স্কুলের বাইরে থাকে তাদের আবার স্কুলে ফেরার সম্ভাবনা ততটাই কমে যায়।

অ্যাভেলিনো বলেন, “আমরা সর্বোত্তম সমাধানে এখনো পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু এখনকার মতো এটাই একমাত্র বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা। অনেক অভিভাবকের সীমিত শিক্ষাগত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা যদি সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটান, তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং যখন পারেন তাদের লেখাপড়ায় সহায়তা করেন তাহলেই সেগুলো শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়ক হবে।

“নজিরবিহীন এই পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা সর্বোত্তম উপায় বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাব।”


শিক্ষা কর্মসূচিতে (এডুকেশন প্রোগ্রামে) অবদান রাখার জন্য অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি (কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে), জাপান, কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পাশাপাশি গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন, ইউরোপিয়ান সিভিল প্রটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অপারেশনস (ইকো), এডুকেশন ক্যান নট ওয়েট, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কিং আব্দুল্লাহ ফাউন্ডেশন, ইউএন সেন্ট্রাল ইমারজেন্সি রেসপন্স ফান্ড (ইউএনসিইআরএফ), ইউনাইটেড ন্যাশনস অফিস ফর দি কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্স (ইউএনওচা) ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রতি ইউনিসেফ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।