মহামারীর কারণে সৃষ্ট দারিদ্র্যের ফলে শিশু বিবাহের সংখ্যা বাড়ছে

শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এ প্রাপ্ত শিশু বিবাহের অভিযোগ বাড়ছে

ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী
করোনার সময়েও শিশু বিবাহের অভিশাপ মেয়েদেরকে তাড়া করে বেড়ায়।
UNICEF Bangladesh/2015/Mawa
13 সেপ্টেম্বর 2020

২০২০ সালের ৪ জুন শিশু হেল্পলাইন নম্বর ১০৯৮ বেজে উঠল। ফোনের অপর প্রান্তে কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা লাবণ্য (তার প্রকৃত নাম নয়) নামে ১৬ বছরের এক কিশোরী মরিয়া হয়ে হেল্পলাইন কর্মীদের কাছে আসন্ন শিশু বিবাহ থেকে তাকে উদ্ধার করার অনুরোধ জানাচ্ছিল।

স্থানীয় গ্রামবাসীরা তার বিয়ে বন্ধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায় সে হেল্পলাইন কর্মীদের সহযোগিতা চাইতে বাধ্য হয়েছিল বলে কাঁপা কাঁপা ও ভয়ার্ত কণ্ঠে কিশোরী বিষয়টি হেল্পলাইনে জানালো।

বৃহত্তর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারকরণ কর্মসূচির অংশ হিসাবে ইউনিসেফ ১০৯৮ হেল্পলাইনটিকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এই হেল্পলাইনটি বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা বিভাগের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

হেল্পলাইনে লাবণ্য যে তথ্য দিয়েছিল সেটা যাচাই করার পরে ১০৯৮ টিম ঘটনাটি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সমাজসেবা কর্মকর্তাকে অবহিত করেছিল। সমাজসেবা কর্মকর্তা ঘটনাটি উপজেলা  নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করবেন এবং তিনি বিবাহ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে তাদেরকে জানিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে, নির্বাহী কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং স্থানীয় চেয়ারম্যানের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শিশু বিবাহের সকল আয়োজন বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং শিশু বিবাহের খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে তারা লাবণ্যের বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ল্যাবণ্যদের পাঁচ সদস্যের পরিবারে তার বাবা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। লাবণ্যের বাবা এক মুদি দোকানে দোকানদার হিসাবে কাজ করেন। কোভিড-১৯ এর কারনে সৃষ্ট লকডাউনের সময় লাবণ্যের বাবার আয়-রোজগার কমে গিয়েছিল। পরিবারটি তাই খুব কঠিন সময় পার করছিল।

খুব ভাল নম্বর নিয়ে লাবণ্য এবছর একাদশ শ্রেণির জাতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। একটি শিশু বিবাহ কীভাবে তার মেয়ের ভবিষ্যতের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে সে বিষয়টি ১০৯৮ থেকে পরামর্শ পাবার পরে লাবণ্যের বাবা বুঝতে পেরেছিলেন। এছাড়াও, মেয়েকে বিয়ে দিয়েই তিনি যে আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারতেন না, সে বিষয়টিও তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হন। শিক্ষিত কন্যা সন্তান পরিবারের বোঝা হওয়ার পরিবর্তে ভবিষ্যতে সম্পদে পরিণত হবে সে বিষয়টিও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

পরিশেষে. লাবণ্যের বাবা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত তিনি তার মেয়েকে বিয়ে দিবেন না। তিনি লাবণ্যের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন বলেও জানিয়েছিলেন। এছাড়াও, সমাজসেবা কর্মকর্তা লাবণ্যের শিক্ষা কার্যক্রমে যে কোন ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও দেন।

ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক পরিচালিত ২০১৯ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার জরিপের ফলাফল অনুসারে, শিশু বিবাহ বাংলাদেশে এখনও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য যেখানে ২০-২৪ বয়সী নারীদের ৫১.৪ শতাংশই ১৮ বছরের এবং ১৫.৫ শতাংশের ১৫ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। শিশু বিয়ের এই উচ্চ হার বাংলাদেশের মেয়ে শিশুদের শিক্ষাগত এবং শারীরিক সুস্থতার উপর একটি নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত রেখেছে, যা তাদের ভবিষ্যতের বিকাশের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

 

১০৯৮-এ ফোনের সংখ্যা বৃদ্ধি

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮ এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মোঃ মোহামেইন বলেন, “শিশু বিবাহ বন্ধে কিশোরী ও কমিউনিটি সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফোন কলের সংখ্যা বিবেচনায় মহামারী শুরুর আগের সময়ের চেয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা শিশু বিবাহের প্রবণতা বেড়ে যাওয়া দেখতে পাই।”

শিশু হেল্পলাইনে প্রাপ্ত শিশু বিবাহের ঘটনা মহামারীর সময়কালে যথেষ্ট বেড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও যোগ করে বলেন, ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে হেল্পলাইনটি শিশু বিবাহের রোধ সম্পর্কিত ৪৫০ টি কল পেয়েছিল। যদিও, আগের মাসে এই সংখ্যাটি ছিল ৩২২। শিশু বিবাহের এই উর্ধ্বমূখি প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

“শিশু বিবাহ বন্ধে কিশোরী ও কমিউনিটি সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফোন কলের সংখ্যা বিবেচনায় মহামারী শুরুর আগের সময়ের চেয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা শিশু বিবাহের প্রবণতা বেড়ে যাওয়া দেখতে পাই।”

দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন এমন শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়াকে এই প্রবণতার প্রকৃত কারণ হিসাবে উল্লেখ করে ভৌগলিকভাবে বাস্তুচ্যুতি (শহুরে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে না পেরে ২০২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে অনেক মানুষ শহর থেকে গ্রামে চলে আসে) এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবকেও শিশু বিয়ের ঘটনা বৃদ্ধির জন্য তিনি দায়ী করেন।

 

বন্যা এবং কোভিড-১৯ মহামারী ঝুঁকি বাড়িয়েছে

সরকারী প্রশাসনের বেশিরভাগ মনোযোগ এখন যেহেতু দেশব্যাপী বন্যার আঘাত এবং অব্যাহত কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার দিকে, তবুও শিশু হেল্পলাইনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সুযোগে বেশ কিছু অভিভাবক চুপচাপ করে তাদের নাবালিকা কন্যার বিয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন।

ষোল বছর বয়সী সুরমার (তার প্রকৃত নাম নয়) বিয়ে হেল্পলাইনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে একবার বন্ধ করা হয়েছিল। তবে, তার পরিবার কোভিড-১৯ লকডাউনের সুযোগে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে যখন মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল, তখন সুরমা পুনরায় হেল্পলাইনের মাধ্যমে সাহায্য চেয়েছিল। কর্মকর্তারা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন, পরিবারটি তখন আবারও বিয়ে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে, কর্মকর্তারা রাত ১১ টার দিকে সুরমার বাসা থেকে বের হওয়ার পরে রাত ২টার দিকে তারা সুরমার বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ের জন্য ইতোমধ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করায় পরিবারটি বেশ আর্থিক চাপের মধ্যে ছিল।

আয় কমে যাওয়া শিশু বিবাহের প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না তার প্রতিক্রিয়ায় ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা বিভাগের প্রধান নাটালি ম্যাককলে বলেন, “দারিদ্র্য অবশ্যই শিশু বিবাহের অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। তবে, কোভিড-১৯ এর কারণে আয় কমে যাওয়ায় দারিদ্র্যের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আমরা এখনও বিশদ তথ্য জানতে পারিনি।”

তিনি আরও বলেন, “তবুও, মহামারীর প্রভাবের কারণে যেসব পরিবারগুলোর আয় কমে গেছে তাদের জন্য শীঘ্রই কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেওয়া উচিত।” তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ এবং ঝুঁকিতে রয়েছে এমন পরিবারগুলোর বিভিন্ন ধরনের সেবা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সামাজিক সেবা কর্মীদের শক্তিশালী করা এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হবে।”