বিশ্ব শিশু দিবসে বাংলাদেশের শিশুরা জলবায়ু বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের কণ্ঠ জোরদার করেছে

প্রতিটি শিশুর জন্য সবুজ বিশ্ব এবং উন্নততর ভবিষ্যৎ পুননির্মানের প্রচেষ্টা

ক্যারেন রেইডি
বাংলাদেশ। ঘূর্ণিঝড়টি লক্ষ লক্ষ শিশুকে মারাত্মক পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে ফেলেছে
UNICEF/UNI332044/Aronno
19 নভেম্বর 2020

বাংলাদেশের ঢাকা শহরের ১৮ বছর বয়সী মেহরিন মোর্শেদ বলেন, “বাংলাদেশ দিন দিন আরও দূষিত হচ্ছে। বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, বিষাক্ত রাসায়নিক এবং গ্যাসের নির্গমন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। আমাদের উন্নত নীতিমালা তৈরি করতে হবে, এসব নীতিমালাকে জাতীয়ভাবে গ্রহন এবং সঠিক উপায়ে প্রয়োগ করতে হবে।”

২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিসেফের প্রজন্ম সংসদ প্ল্যাটফর্মের প্রথম সদস্যদের মধ্যে একজন ছিলেন মেহরিন। ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিশু দিবসে শিশুদের জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের তিনি এখন একজন পরামর্শদাতা।

শিশুদের ভবিষ্যত রক্ষায় জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, নীতিমালা এবং কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করতে ইউনিসেফ কর্তৃক আয়োজিত এই শীর্ষ অনলাইন সম্মেলনে বাংলাদেশের সকল নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্বকারী ৩০০ শিশু "সংসদ সদস্য” অংশ নিচ্ছে।

ইউনিসেফের প্রজন্ম সংসদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অংশ হিসাবে শীর্ষ সম্মেলন শুরুর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ১০ লক্ষ বাংলাদেশি শিশুর সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে পরামর্শ করা হয়েছে। এর ফলে শিশুরা তাদের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিদের সাথে সংযোগ করতে পেরেছে।  

মেহরিন আরও বলেন, “প্রজন্ম সংসদ-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হ'ল এর বৈচিত্র্য। ভৌগলিক এবং সামাজিক বিভাজন দুর করে এটি তরুণ কর্মীদেরকে একে অন্যের সাথে যুক্ত করেছে। বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করলে আমি অনেকগুলো সমস্যা দেখতে পাচ্ছি। আমি যে সব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি শহর থেকে আমি সেগুলো প্রকাশ করতে পারি। তবে গ্রামীণ বা উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা ভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। আমরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত নীতিমালা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। লেখাপড়া করার সুযোগ-সুবিধা, বাল্য বিবাহ, নির্যাতন এবং শোষণ সহ বিভিন্ন বিষয় আমাদের আলোচনায় প্রাসংগিকভাবেই চলে আসে।

 

সর্বাধিক ঝুঁকির মুখে শিশুরা

নিচু দেশ এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নদীরবেষ্টিত দেশ হিসাবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরাট ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

জীবন-বিপর্যয়কারী বন্যা, নদী ও উপকূলীয় ভাঙ্গন, খরা, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এবং শহরে অভিবাসনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের আনুমানিক ১ কোটি ৯৪ লক্ষ শিশু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির সন্মুখিন হচ্ছে।

পরিবর্তিত জলবায়ু শিশুদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, শিক্ষা এবং সুস্থতা হ্রাস করা সহ শিশুদের উন্নত ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

 

জলবায়ু সংকট সমাধানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

মেহরিন বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর ঢাকায় বাস করে। বায়ু এবং পানি দূষণ এই শহরের বাসিন্দাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা।

মেহরিন জানায়, “তাদের কিশোর জীবনের স্মৃতি স্মরণ করে আমার বাবা-মা বলেন যে, তারা যখন কিশোর ছিলেন তখন ঢাকা বেশ সবুজ ছিল এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়াটাও তখন বেশ নিরাপদ ছিল। কেবল ভবন এবং কংক্রিট ছাড়া এখন আর কোনও সবুজ নেই । আমরা এখন এমন বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছি যাতে কখনোই আমাদের শ্বাস নেওয়ার কথা ছিল না।”

“জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষজন যথেষ্ট অবদান রাখে এবং শিশুদেরকে অবশ্যই এর সমাধানের অংশ হতে হবে।” - মেহরিন

এ বছরের শুরুর দিকে, কোভিড-১৯ লকডাউন ব্যবস্থার ফলে ঢাকা শহর স্থবির হয়ে পড়েছিল। কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিল, রাস্তাঘাট ছিল নিস্তব্ধ, পাখিরা গান করতো । এ সময় দূষণ এবং সংক্রমন কম ছিল।

মেহরিন আরও জানায়, “বেঁচে থাকার জন্য আমরা ভিন্ন ভিন্ন উপায় লক্ষ্য করেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষজন যথেষ্ট অবদান রাখে এবং শিশুদেরকে অবশ্যই এর সমাধানের অংশ হতে হবে। আমরা বিভিন্ন দিক থেকে সমস্যা দেখতে পাই। আমরা আমাদের কল্পনাকে ক্যানভাসে রূপান্তরিত করতে পারি। এটিকে নীতিনির্ধারকদের আরও পরিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে পারেন।”

 

শিশুদের জলবায়ু ঘোষণা

শিশুদের জলবায়ু ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে শিশুদের জলবায়ু সম্মেলনের সমাপ্তি হয়েছিল। আন্তঃপ্রজন্মের মধ্যকার সংহতির চেতনায় এই ঘোষণাপত্র জাতীয় নেতাদের কাছে উপস্থাপিত হয়েছিল।

এই ঘোষণায় শিশুরা দূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নীতিনির্ধারকদের আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়াও, ঘোষণায় তারা শিশুদের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও সবুজ-অর্থনীতি; এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব হ্রাস করে শিশুদের সুরক্ষারও আহ্বান জানিয়েছে।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টমো হোজুমি বলেন, “আমরা যেহেতু সময়ের সাথে যুদ্ধ করছি সে কারনে জলবায়ু সম্পর্কিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাহসী নেতৃত্বের প্রয়োজন। আমাদের অবশ্যই শিশু এবং তরুণদের অনুপ্রেরণা ও সাহস দিতে হবে এবং তাদের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।”

সম্মেলনে সংসদ সদস্য  এবং শিশু অধিকার সম্পর্কিত সংসদীয় ককাসের সভাপতি শামসুল হক টুকু সভাপতিত্ব করেন। এছাড়াও সরকার, সুশীল সমাজ এবং কমিউনিটি প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সম্মেলনে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে শিশু জলবায়ু কর্মী, সংসদ সদস্য এবং জলবায়ু স্টেকহোল্ডাররা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

সংসদের ডেপুটি স্পিকার জনাব ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, “আজ শিশুরা আমাদের শিখিয়েছে যে, জলবায়ু নীতিমালা গঠনে আমাদের কনিষ্ঠ নাগরিকদের মূল ভূমিকা নিতে হবে। আমি খুব আনন্দিত হবো যদি অদূর ভবিষ্যতে সংসদে শিশুদের এই জলবায়ু ঘোষণা নিয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারি।”

মেহরিন মোর্শেদ, ঢাকায় ইউনিসেফের প্রজন্ম সংসদের একজন সদস্য।
UNICEF Bangladesh/2020/Murad
মেহরিন মোর্শেদ, ঢাকায় ইউনিসেফের প্রজন্ম সংসদের একজন সদস্য।

মেয়েরাও আওয়াজ তুললো

ভার্চুয়াল এই শীর্ষ সম্মেলনটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম লিঙ্গ-সমতাভিত্তিক শিশু সংসদ, যেখানে ৫০ শতাংশ মেয়ে এবং ৫০ শতাংশ ছেলের প্রতিনিধিত্ব ছিল।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষতঃ গ্রামাঞ্চলের নারী ও মেয়েরা সে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সে বিষয়গুলো মেহরিন তুলে ধরেছে।

মেহরিন জানায়, “বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য কথা বলা অবশ্যই বেশ কঠিন। সাম্যতা বা নারীদের ক্ষমতায়নের বিষয়ে আমরা যতই কথা বলি না কেন, নারীরা সবসময় নিপীড়িত হচ্ছে এবং তাদের উপর দমন-পীড়ন চলছে।”

প্রজন্ম সংসদের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিষয়গুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে মেয়েরা তাদের কথা বলতে পারছে এবং ছেলেরাও সমান অবদান রাখার সুযোগ পাচ্ছে।

মেহরিন আরও জানায়, “আমি আমার বিতর্ক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমি যখন কথা বলি, মানুষজন সাধারণত স্তব্ধ হয়ে যায়। তখন তারা বলে ’তুমি একজন মেয়ে এবং তুমি এমন কথা বলছো! মেয়েদের সাধারণত ভদ্র এবং শান্তশিষ্ট থাকার কথা। মেয়েরা এভাবে কথা বলে না।’ এ কারনে আমি মনে করি কথা বলা ও ধারণার পরিবর্তন করা এবং বৈষম্যের অবসান হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নারীরাও কম নয়। মেয়েরাও কম নয়। ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বার্থে যা কিছু বলা ও করা দরকার, আমাদের তা করতে হবে”।।