বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ছে

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা বিস্তারে ১০,০০০ ছাত্র-ছাত্রীর জন্য বছরের প্রথমার্ধে মায়ানমারের পাঠ্যক্রম পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে চালু করবে ইউনিসেফ

ক্যারেন রেইডি
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে ইউনিসেফের একটি শিক্ষা কেন্দ্র
UNICEF/UN0284179/LeMoyne
10 ফেব্রুয়ারি 2020

অন্যান্য মানবিক সহায়তাকারীদের সাথে নিয়ে ইউনিসেফ ২০২০ সালে বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরাণার্থী শিশুদের শিক্ষার জন্য নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। বাংলাদেশ সরকারের এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে, ইউনিসেফ বছরের প্রথমার্ধে মায়ানমারের পাঠ্যক্রমটি পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে চালু করবে। এর মাধ্যমে ইউনিসেফ শিক্ষার সুযোগকে আরও সম্প্রসারিত করবে।

পরীক্ষামূলক এই কার্যক্রমে ষষ্ঠ থেকে নবম স্তরের মোট ১০,০০০ রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীকে প্রাথমিকভাবে টার্গেট করা হবে। এরপরে পর্যায়ক্রমিকভাবে অন্যান্য স্তরেও এই কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত করা হবে। কম বয়সী শিশুদের তুলনায় বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে কম সুযোগ পাচ্ছে এমন অপেক্ষাকৃত বয়স্ক শিশুদের পরীক্ষামূলক এই কার্যক্রমে টার্গেট করা হবে।

চতুর্থ স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক রোজিনা আক্তার বলেন, “শিক্ষা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসে। শেখার প্রতি শিক্ষার্থীদের আকাঙ্খাই আমাকে অনুপ্রাণিত করে।”

রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের চাওয়া এখন নতুন পাঠ্যক্রম

পরীক্ষামূলক এই কাযক্রমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চাওয়াকে প্রাধাণ্য দেয়া হয়েছে। এছাড়াও, মায়ানমারের পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এই কার্যক্রম রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।  

স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে যদি রোহিঙ্গা শিশুদের মায়ানমারে ফিরে যাবার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তবে পরীক্ষামূলক এই কার্যক্রম মায়ানমারের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের সাথে তাদের একীভূত হবার সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।

৩১৫,০০০ শিশু এবং কিশোর-কিশোরী ৩,২০০-এরও বেশি শিক্ষা কেন্দ্রে পড়াশোনা করে

শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতে তৈরি ‘শিক্ষণ দক্ষতা কাঠামো ও পদ্ধতি’ (এলসিএফএ) নামক পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী ২২০,০০০ রোহিঙ্গা শিশুকে ইউনিসেফ বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ দিচ্ছে।

যদিও শিশুদের অধিকাংশই (৯০ শতাংশের বেশি) এলসিএফএ প্রথম ও দ্বিতীয় স্তর শিখছে, আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় ব্যবস্থায়্ এটি দ্বিতীয় স্তর পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের সমতুল্য। মায়ানমারের রাখা্ইন রাজ্যে শিক্ষার নিম্ন মানের কারনে খুব কম রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীরই তৃতীয় থেকে অষ্টম স্তরের সমতুল্য উচ্চ স্তরে (এলসিএফএ তৃতীয় ও চতুর্থ স্তর) অধ্যয়ন করার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে মানবিক শিক্ষাখাতের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, শরণার্থী শিবিরের ৩২০০ শিক্ষা কেন্দ্রে  অধ্যয়নরত তিন লাখ ১৫,০০০ শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের ৭০ শতাংশেরও বেশি ইউনিসেফ-সহায়তায় পরিচালিত কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হয়েছে।

ইংরেজি, গণিত, বার্মিজ, প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের জন্য জীবন দক্ষতা, এবং তৃতীয় ও চতুথ© স্তরের জন্য বিজ্ঞানসহ শিশুরা বত©মানে মোট পাঁচটি বিষয় শিখছে।

স্থানীয় সম্প্রদায়ের একজন বাংলাদেশী শিক্ষক এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের একজন বার্মিজ ভাষা প্রশিক্ষকের মাধ্যমে ক্লাশগুলো পরিচালিত হয়।

ইউনিসেফ সহায়তায় পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্রে
UNICEF/UN0326955/Brown
ইউনিসেফ সহায়তায় পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্রে রোজিনা আক্তার তার শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের কাজে সাহায্য করছেন।

কিশোর-কিশোরীদের জন্য শিক্ষা

ইউনিসেফ ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১৮,০০০-এর অধিক রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের সাক্ষরতা, সংখ্যাগণনা, জীবন দক্ষতা এবং বৃত্তিমূলক দক্ষতা প্রশিক্ষণসহ অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের জন্য শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে।

কিন্তু এক্ষেত্রে বড় ধরনের একটি ফাঁক রয়েই গেছে। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৭৪,০০০ রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের সবার কাছে পৌঁছানোর জন্য কিশোর-কিশোরীকেন্দ্রিক কার্যক্রমগুলোর পরিধি অবশ্যই বাড়াতে হবে।

নূর নামে ষোল বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা তরুণী ইউনিসেফ সমর্থিত বহুমূখী শিশু ও কিশোর-কিশোরী কেন্দ্রে দক্ষতা বিকাশের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল। শরণার্থী শিবিরগুলোর সর্বত্র যেসব সৌর প্যানেল রয়েছে সেগুলো স্থাপন ও মেরামত করতে শিখছে নূর।

নূর বলছিল, “আমি আমার বাড়ির সৌর প্যানেল নিজে নিজেই মেরামত করতে পারি এবং এ কারনেই আমি এই কাজটি শিখেছি। ছেলেরা এখানে আসে, তবে মেয়েরা কেন নয়?”

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইউনিসেফ-সমর্থিত সহায়তা শিশু ও কিশোর-কিশোরী কেন্দ্র
UNICEF/UN0326948/Brown
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইউনিসেফ-সমর্থিত সহায়তা শিশু ও কিশোর-কিশোরী কেন্দ্রে হলুদ ওড়না (স্কাফ©) পরা নূর তার দক্ষতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণের সময় সতক©তার সাথে তাকিয়ে থেকে সৌর প্যানেল মেরামত করা শিখছে।

প্রতিটি শিশুর বিকাশে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু, মানবিক পরিপ্রেক্ষিতে এটি কখনো কখনো আরো বড় হয়ে দেখা দেয়। রোহিঙ্গা শিশুরা একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এটি তাদেরকে হতাশার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

শিক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলে, পাচার, বাল্য বিবাহ, শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ তরুণ-তরুণীদের ক্ষমতায়িত করতে, তাদের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

শিক্ষায় সঠিক বিনিয়োগের মাধ্যমে, রোহিঙ্গা শিশুরা তাদের নিজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করতে এবং নিজের কমিউনিটির জন্য বৃহত্তর অবদান রাখতে পারবে।

নতুন শিক্ষক নিয়োগ

প্রথম বছরে ১০,০০০ রোহিঙ্গা শিশুকে মায়ানমার পাঠ্যক্রমের পরীক্ষামুলক কার্যক্রমের আওতায় আনার লক্ষ্যে পৌঁছাতে, দ্বৈত-শিফট ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুদের পড়ানোর জন্য বিদ্যমান ৮,৯০০ জন শিক্ষক ছাড়াও আরও ২৫০ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।     

সময়ের সাথে সাথে শিক্ষকের সংখ্যাও বাড়বে। কারণ, পরীক্ষামূলক এই কায©ক্রমটি আরও শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য স্তরে পরজায়ক্রমে সম্প্রসারিত করা হবে। রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং শিক্ষক হিসাবে তাদেরকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

কক্সবাজারের অস্থায়ী ক্যাম্প
UNICEF/UN0326952/Brown
কক্সবাজারের অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে ইউনিসেফের শিক্ষণের জায়গায় রোহিঙ্গা শিশুরা ব্ল্যাকবোর্ডে সমস্যা সমাধান করছে।

পরীক্ষামূলক এই কার্যক্রমটি মায়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করবে। রোহিঙ্গা শিশুরা বার্মিজ, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করবে। এছাড়াও, সময়ের সাথে সাথে তাদের জন্য আরও বিষয় চালু করা হবে।

বাংলাদেশ সরকারের এই ঘোষণাকে ইউনিসেফ স্বাগত জানায় এবং রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচনা করে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি তোমো হোজুমি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায়, সকল রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে সহায়তা করতে আমরা শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত করছি। রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমকে সহযোগিতা করার জন্য যে দাতাসংস্থা ও শিক্ষাখাতের অংশীদাররা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই।”

তিনি আরো বলেন, “এই নতুন ইতিবাচক বিকাশকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদেরকে এখনও একটি চ্যালেঞ্জিং পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে আমরা সবাই যদি একসাথে কাজ করি, তাহলে সব কিছুই করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।”


শিক্ষা কর্মসূচিতে (এডুকেশন প্রোগ্রামে) অবদান রাখার জন্য অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি (কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে), জাপান, কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পাশাপাশি গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন, ইউরোপিয়ান সিভিল প্রটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অপারেশনস (ইকো), এডুকেশন ক্যান নট ওয়েট, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কিং আব্দুল্লাহ ফাউন্ডেশন, ইউএন সেন্ট্রাল ইমারজেন্সি রেসপন্স ফান্ড (ইউএনসিইআরএফ), ইউনাইটেড ন্যাশনস অফিস ফর দি কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্স (ইউএনওচা) ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রতি ইউনিসেফ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।