বাংলাদেশে মেয়ে ফুটবল খেলোয়ারদের জন্য এক বিজয়

অল্পবয়সী মেয়েরা তাদের ফুটবল দক্ষতাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মাঠে ও মাঠের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করছে

ইউনিসেফ
Girls with football
ইউনিসেফ বাংলাদেশ/২০২১/সাতু
07 অক্টোবর 2021

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা দলের ১২ বছর বয়সী মেয়ে ফুটবলার নয়নতারা মনিকা দাবী করে, “এমন কিছু নেই যা মেয়েরা করতে পারে না। মেয়েরা শুধু বাড়িতে বসে না থেকে পড়াশোনা এবং খেলাধুলা দুটোই করতে পারে। এটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।”

দক্ষিণ -পূর্ব বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন একটি প্রত্যন্ত গ্রামে নয়নতারা মনিকা বেড়ে উঠেছে, যেখানে ফুটবল খেলার তেমন একটা সুযোগ ছিল না। তবে, দক্ষতা ও দৃঢ় প্রত্যয় তাকে ইউনিসেফ-বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের মেয়েদের জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণের চূড়ান্ত চ্যাম্পিয়নশিপ খেলায় জয়ের দিকে নিয়ে গেছে।

নয়নতারা জানায়, “‘তুমি কেন ফুটবল খেল?’- এই বিষয়টি আমার গ্রামের মানুষজন সবসময় আমাকে জিজ্ঞাসা করতো। তারা বলতো: ‘তুমি একজন মেয়ে। তুমি তোমার লেখাপড়ায় মনোযোগ দাও। মেয়ে হবার কারণে যখন ‍তুমি বড় হবে, তখন তো তুমি আর ফুটবল খেলতে পারবে না। তবে, আমার পরিবার সব সময় আমাকে সহযোগিতা করত।”

যে দেশে মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ খুবই সীমিত, সে দেশে ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বিএফএফ) যৌথভাবে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী দেশব্যাপী ফুটবল প্রতিভা অন্বেষণ অভিযান চালু করেছে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা বিভাগের প্রধান নাটালি ম্যাকাউলি বলেন, “জেন্ডার সম্পর্কিত  রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং শিশুদের ও সমাজের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকারক লিঙ্গ বৈষম্য ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যা মোকাবেলা করতে খেলাধুলায় মেয়েদেরকে উৎসাহিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”

খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণকে জোরদার করতে ইউনিসেফ এবং বিএফএফ-এর মধ্যে এক অংশীদারিত্বের ফলাফল হলো মেয়েদের ফুটবল প্রতিভা অন্বেষণ অভিযান। ২০২১ সালে নির্বাচিত মেয়েরা জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে টুর্নামেন্টে খেলেছে এবং তারপরে দেশের রাজধানী ঢাকায় একটি চূড়ান্ত চ্যাম্পিয়নশিপ খেলায় অংশ নিয়েছে।

শীর্ষ খেলোয়াড়দের আরও প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও, পর্যায়ক্রমে তাদের জাতীয় মহিলা ফুটবল দলে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে, যার ফলে তারা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েদের কাছে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।

কোভিড-১৯-এর প্রভাব

স্কুল বন্ধ থাকা এবং লকডাউন-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার কারনে শিশুরা তাদের বন্ধুদের সাথে শারীরিক অনুশীলন, খেলাধুলা এবং মজা করার সুযোগ থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হয়েছে। এটি শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ফুটবল প্রতিভা অন্বেষণ এই পরিস্থিতি দূর করার প্রত্যয় নিয়ে শিশুদেরকে খেলাধুলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে।

নয়নতারা জানায়, “আমরা সবাই স্কুলে যেতে আনন্দ পাই। কারণ স্কুলে আমাদের বন্ধু এবং শিক্ষকদের সাথে দেখা হয়। স্কুলে আমরা ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারি। কিন্তু লকডাউনের কারনে আমি স্কুলে যেতে পারতাম না বা ফুটবল অনুশীলন করতে পারতাম না, এটা সবসময় আমার খুব খারাপ লাগতো।”

সে বলে, “লকডাউনের এক পর্যায়ে, যখন আমি স্কুলে যেতে পারতাম না, তখন আমি কখনও কখনও কাঁদতাম।”

বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে নয়নতারা আরও বলে যে, সেই সময় সে অনলাইন ক্লাস করতো। তবে অনলাইন ক্লাসগুলো শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে ক্লাস করার মতো উপভোগ্য ছিল না।

Girls practicing football
ইউনিসেফ বাংলাদেশ/২০২১/সাতু
প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা একটি ফুটবল প্রশিক্ষণ সেশনে অংশগ্রহণ করছে।

মেয়েদের আলোকিত হওয়ার সময়

ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা বিভাগের প্রধান নাটালি ম্যাকাউলি বলেন, “মেয়েদের সম্ভাবনা এবং সমাজে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে খেলাধুলা সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে পারে। মেয়ে এবং ছেলে উভয়ের জন্যই খেলাধুলা সমান উপকারী। শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সুবিধা ছাড়াও খেলাধুলা শিশুদের এবং তরুণদের আত্মসম্মানবোধ তৈরি করে, তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা তৈরি করে।”

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী মো. সালাহউদ্দিন বলেন, “এই কর্মসূচির জন্য আমরা অত্যন্ত গর্বিত। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এবং দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী অনেক মেয়ে ঐতিহ্যগতভাবে খেলাধুলা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা অবগত আছি। এই উদ্যোগ কন্যা শিশুদের মা-বাবা এবং কমিউনিটিকে খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণকে অনুপ্রাণিত করতে পারে বলে আমরা আশা করি। খেলাধুলার সুবিধা বহুমুখী এবং খেলার মাঠের বাইরেও এর অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।”

নয়নতারা গর্ব করে বলে, “আমার ফুটবল খেলা নিয়ে এখন কেউ আর বিরূপ মন্তব্য করেনা। এমনকি ছেলেরাও আমাকে বিরক্ত করে না। বরং তারাও আমাকে উৎসাহ দেয় এই বলে যে, ‘চেষ্টা কর এবং আরও বেশি বেশি খেলো। তুমি আসলেই ভাল খেলো। ভবিষ্যতে তুমি অনেক দূর যেতে পারবে।’”

A girl practicing football
ইউনিসেফ বাংলাদেশ/২০২১/সাতু

খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ জোরদার, তাদের ক্ষমতায়নসহ বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রথা বন্ধ করার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সহযোগীদের প্রতি ইউনিসেফ-এর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।