বাংলাদেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ শিশুর খাবার, পরিষ্কার পানি ও সুরক্ষা প্রয়োজন

বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও দুর্গত পরিবারগুলোকে সামনের দিনগুলোতেও বন্যার প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে

UNICEF
A mother pours water than has been treated with water purification for her child to drink.
UNICEF/UN0659830/Mukut
17 জুলাই 2022

বন্যার পানি যখন ধেয়ে আসছিল, ১০ বছর বয়সী বর্ষা ও তার পরিবারকে তখন সবকিছু ফেলে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর অন্যতম সিলেটের গোয়াইনঘাটের আশ্রয়কেন্দ্রটি বাড়তে থাকা পানি থেকে সাময়িক রেহাই দিয়েছিল। কিন্তু, কাছাকাছি কোনো নলকূপ বা পানির কল না থাকায় বর্ষাকে বেশ কিছুদিন পরিষ্কার খাবার পানি ছাড়াই থাকতে হয়েছিল।

সিলেটের গোয়াইনঘাটে সদ্য পাওয়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট হাতে ১০ বছর বয়সী বর্ষা। ইউনিসেফ ১০ লাখেরও বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরকারকের কাছে সরবরাহ করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণের জন্য।
UNICEF/UN0659824/Mukut
সিলেটের গোয়াইনঘাটে সদ্য পাওয়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট হাতে ১০ বছর বয়সী বর্ষা। ইউনিসেফ ১০ লাখেরও বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরকারকের কাছে সরবরাহ করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণের জন্য।

ইউনিসেফের দেওয়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাওয়ার পর সে বলে, “বন্যার পানি ধেয়ে আসা এবং আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর থেকে আমার ও আমার পরিবারের জন্য খাবার পানি যোগাড় করা সত্যিই কঠিন ছিল। অবশেষে এখন আমরা বিশুদ্ধ খাবার পানি পাবো। বিগত কয়েকদিনের মধ্যে এই প্রথম আমি পরিষ্কার পানি পাচ্ছি!”

 

পরিষ্কার পানি ও স্যানিটেশনের সংকট

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যায় যে ৩৫ লাখ শিশুর জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে বর্ষা তাদের মধ্যে একজন। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে বন্যার পানিতে প্রায় ৪৫ হাজার পানির উৎস এবং ৫০ হাজার শৌচাগার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কারণে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পরিবারগুলোকে পরিষ্কার পানি ও ল্যাট্রিনবিহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। খাদ্য ঘাটতি ছাড়াও, পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ও সহিংসতার শিকারসহ শিশুরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক শিশু রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ায় মায়েরা উদ্বিগ্ন। একজন মা ব্যাখ্যা করলেন: “আমাদের কাছে কয়েকদিন ধরে বিশুদ্ধ পানি নেই। আমার সন্তানরা নোংরা পানি পান করে আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”

A girl standing amid floodwater in front of her home that has been inundated for days
UNICEF/UN0658478/Mukut
১২ বছর বয়সী পান্নার যতবার টয়লেট ব্যবহারের করার প্রয়োজন হচ্ছে, ততবারই তাকে জৈন্তাপুরে তার বন্যায় প্লাবিত বাড়িতে ফিরে যেতে হচ্ছে।

বর্ষার মতো ১২ বছর বয়সী পান্নাকেও সিলেটের জৈন্তাপুরে তার বাড়ি ছেড়ে জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছিল।

পান্না জানায়, “আশ্রয়কেন্দ্রে একসঙ্গে এত বেশি সংখ্যক পরিবার থাকে যে আমি টয়লেট ব্যবহার করতে পারি না। এটি নোংরা এবং আশেপাশে এত মানুষ যে আমি সেখানে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনা।”

একারণে শুধু টয়লেট ব্যবহার করার জন্য সে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কয়েক মাইল দূরে তার জলমগ্ন বাড়িতে ফিরে যায়। পান্নার জন্য প্রতিদিন বন্যার দূষিত পানি পার হয়ে হেঁটে যাওয়ার অর্থ হল রোগে আক্রান্ত হওয়া, ডুবে যাওয়া এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া।

 

ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দীর্ঘ

এমন এক সময়ে এই বন্যা হানা দেয় যখন এই এলাকার মানুষ আগের মাসের বন্যা থেকে মাত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। বন্যার পানি বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কৃষি জমিকে তলিয়ে দেয় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত করে।

পরিবারগুলো তাৎক্ষণিক নোটিশে তাদের সহায়-সম্পদ ফেলে রেখে উঁচু ভূমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সেনাবাহিনীর সহায়তায় চার লাখেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। হাজার হাজার স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এখন বন্ধ রয়েছে – যার কারণে পড়াশোনা বিঘ্নিত হচ্ছে লাখ লাখ শিশুর, যারা মহামারির কারণে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে এমনিতেই ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারেনি।

People collecting water from a water truck
UNICEF Bangladesh/2022/Mukut

বন্যার শুরু থেকেই ইউনিসেফ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ১০ লাখেরও বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, হাজার হাজার পানির পাত্র, ডিগনিটি ও হাইজিন কিট এবং থেরাপিউটিক দুধ বিতরণ করেছে। নির্যাতন, সহিংসতা, ডুবে যাওয়া ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার জন্য ইউনিসেফ কমিউনিটিগুলোর মাঝে সতর্কতা বার্তা ছড়িয়ে দিতে সরকারের সাথে কাজ করছে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে আরও কিছু সময় বন্যার প্রভাব অনুভূত হবে এবং বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় পানি ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে, আর এই অবস্থায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্বেও সেবা প্রদান ও গুরুতর রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ল্যাট্রিন, বাড়িঘর, স্কুল ও হাসপাতালগুলো পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করা প্রয়োজন। এরই মধ্যে যেসব পরিবার বন্যায় সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ল্যাট্রিন ও আশ্রয় নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুরা অব্যাহতভাবে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত থাকছে এবং তাদের সহিংসতা, ডুবে যাওয়া বা রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখা নিশ্চিত করতে হবে। বর্ষা ও পান্নার মতো শিশুরা আজ যে পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে, তা কোনো শিশুর জন্যই কাম্য না।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও পরিবারগুলোর কাছে জীবনরক্ষাকারী সেবা পৌঁছে দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের জরুরি কার্যক্রমে আরও সহায়তা করতে ইউনিসেফ ৪.৫৭ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিলের জন্য আহ্বান জানিয়েছে।