বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কিশোরী মায়ের জীবন অনেক ঝুঁকিতে

কিন্তু ইউনিসেফ কর্তৃক একটি নতুন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক কর্মসূচী নারী ও শিশুদের আশা জাগায়

অমিয়া হালদার
Adolescent mother
UNICEFBangladesh/2018/Mawa

21 জুন 2018

বাংলাদেশের উত্তরের জেলা জামালপুর সদর হতে ঘন্টাখানেকের ফারাকে একটি ছোট্ট গ্রামে মোছাঃ কাকলী ইয়াসমিন নামে সতের বছরের একটি মেয়ে বাস করে। কম্যুনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের নাগালের বাইরে থাকা এই মেয়েটি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং এখনো তার প্রসূতি-পূর্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি ।

লাজুক হাসিতে কাকলীর বলে, “আমরা তো গরিব, ডাক্তার দেখানোর টাকা কোথায় পাবো?” “যেহেতু এটি তো আমার প্রথম গর্ভাবস্থা; এ কারনে আমি তো কাউকে চিনিও না।”  

অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন তার স্বামী মোঃ আল-আমিনের সাথে বিয়ে হয় কাকলীর। 

জ্বলজ্বল চোখে কাকলী বলে, “স্কুলে থাকলে এখন আমি দশম শ্রেণীর পরীক্ষা দিতাম।” কাকলী মনে মনে বলে, “আমি গান, নাচ আর খেলাধুলার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম। প্রতি বছর আমি অন্তত দুই তিনটা পুরস্কার বাসায় আনতাম।”

ওর মনে কি অন্য কিছু ছিলো? হ্যাঁ। বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ও ডাক্তার হতে চেয়েছিলো।

কিন্তু আল-আমিনের সঙ্গে দেখা হওয়াতে তাকে অন্য জীবনের সূচনা করতে হলো।

গর্ভের বাচ্চা নিয়ে তার কি আশা? কাকলী বলে, ”আশার চেয়ে এখন আমার বরং ভয়ই বেশি।”

কাকলী এখন একা নয়। কিশোরী মায়েদের বাচ্চা প্রসবের ২৮ দিনের মধ্যে মারা যাবার আশঙ্কা দেড় গুণ বেশি। এছাড়াও, ১৫-১৯ বছরের মেয়েদের মারা যাবার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো গর্ভকালীন জটিলতা ও সন্তান জন্মদান।

বাংলাদেশে এখনো ৫২ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর বয়সের নিচে বিয়ে হয়। ৭০ লক্ষ কিশোরী যারা প্রসূতি অবস্থার কারণে জীবন ঝুঁকিতে থাকে, তাদের মধ্যে কাকলী একজন। 

ডাক্তারের কাছে না যাওয়ায় কারনে তার ঝুঁকির সম্ভাবনা আরো বেশি।

কাকলীর কথায় জানা যায় যে, সে জানেও না গর্ভাবস্থায় কেমন পুষ্টি প্রয়োজন বা কিশোরী মায়েদের অতিরিক্ত খাবার, যতœ বা আরামের প্রয়োজন কিনা। মাঝে মাঝেই কাকলীর শরীর খুব দুর্বল লাগে; আর মাথা ঝিমঝিম করে। এই দুইই রক্তস্বল্পতার লক্ষণ, যার কারণে এদেশে রক্ত¯্রাব এবং প্রসবকালীন সংক্রমনের ঝুঁকি বেশী। একই কারণে বাচ্চা প্রসবের সময় প্রায় ২০ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অথচ খুব সহজেই লৌহ সম্পূরক খাবার বা ঔষধ খাইয়ে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। 

কাকলীর বাসা থেকে এক ঘন্টার দূরত্বে ইউনিসেফ-এর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে যেখানে গর্ভবতী মায়েদের জন্য সম্পূর্ণ বিনাপয়সায় লৌহ, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন সম্পূরক পাওয়া যায়। 

কিন্তু কাকলীর জন্য যাওয়াটাই অসুবিধার। এছাড়া এক মাইলের মধ্যে কোনো রিক্সাও নজরে আসেনা। সন্ধ্যার খাবার রান্না শুরুর আগে কিশোরী কাকলীর বিলজ্জ বয়ান, “আমার স্বপ্ন পূরণ হয়নি বটে কিন্তু আমি চাই আমার সন্তান পড়াশুনা শিখে ভালো একটা চাকুরি করুক।” 

নারী ও শিশুদের জন্য ইউনিসেফ-এর একটি নতুন সেচ্ছাসেবক কর্মসূচি খুব শীঘ্রই এ অঞ্চলে কাজ শুরু করবে এবং আগামী জুনে সেচ্ছাসেবকদের প্রথম দলটিকে তারা এই এলাকায় পাঠাবে। কিন্তু কাকলীর হাতে সময় মাত্র চার মাস এবং এর মধ্যে তাকে শহরে গিয়ে সুপারিশকৃত চারজন ডাক্তারের সাথে দেখা করতে হবে, নইলে কাকলী আর তার সন্তানের ভাগ্য একটি  সূতার উপরে ঝুলবে।