প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ এর সময়ে সামনের সারিতে থাকা সাহসী স্বাস্থ্যকর্মীরা

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলি জোরদার করায় স্বাস্থ্যকর্মীরা অপরিহার্য প্রাথমিক সেবাসমূহ প্রদান অব্যাহত রাখছে

নাজিনা মহসিন ও ক্যারেন রেইডি
মেডিকেল সহকারী আরিফা আফসানা ও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু রুমানা
UNICEF Bangladesh/2020/Sujan
23 এপ্রিল 2020

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা যেমন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি আমাদের নিরাপদ রাখতে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের সামনের সারিতে থাকা সদস্যরাও নতুন করে প্রশংসিত হচ্ছেন।

কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন মৃত্যু ঘটাচ্ছে। এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ও আরো বেশি জীবন বাঁচাতে দেশগুলো নানা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পরিষেবাগুলো পুনরায় জোরদার করা হয়েছে। সেখানে ইউনিসেফের সহায়তায় ১৪টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে ১ লাখ ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা শিশু ও পরিবারকে অপরিহার্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত  রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে কোভিড-১৯ সংক্রমণের নিশ্চিত কোনো ঘটনা নেই। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও মানবিক সহায়তা প্রদানকারীরা উদ্বেগ ও আতঙ্ক নিয়ে বৈশ্বিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর দিকে নজর রাখছেন। কেননা জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও ঘনবসতিপূর্ণ এই শরণার্থী শিবিরগুলোতে ৮ লাখ ৫৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস, যাদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু।

পার্টনারস ইন হেলথ ডেভেলপমেন্টের (পিএইডি) ব্যবস্থাপনায় ইউনিসেফের সহায়তাপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ক্লিনিকে কর্মরত ডা. তাজরীন ইসলাম তাসিফ বলেন, “আমরা শিবিরগুলোতে কোভিড-১৯ এর সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। এই শিবিরগুলো অবিশ্বাস্য রকমের ঘনবসতিপূর্ণ। তাই এখানে কেউ সংক্রমিত হলে দ্রুতই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। যদি আমরা সংক্রমণের সন্দেজনক কোনো ঘটনা পাই, তাহলে আমরা তাৎক্ষণিক তাদের কোভিড-১৯ আক্রান্তদের জন্যে বানানো আইসোলেশন ও চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করবো।”

স্থাপিত হাত ধোয়ার কেন্দ্র
PHD Bangladesh/2020/Haque
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে ইউনিসেফের সহায়তাপ্রাপ্ত পিএইচডি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে প্রবেশের আগে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা নতুন স্থাপিত হাত ধোয়ার কেন্দ্র ব্যবহার করেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে

ইউনিসেফের সহায়তাপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রবেশপথে হাত ধোয়ার উপকরণ ও ক্লোরিন সল্যুশন রাখা হয়েছে, যাতে এই কেন্দ্রে প্রবেশের আগে প্রত্যেকে তাদের হাত ধুতে এবং স্যানিটাইজ করতে পারে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্ক রয়েছেন। পাশাপাশি যে কোনো রোগীকে সেবা দিতেও তারা প্রস্তুত আছেন। কারণ তারা জানেন, কীভাবে বিশেষ সরঞ্জাম দিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হয়।

ডা. তাসিফ বলেন, “আমাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ (পিপিই) সামগ্রী রয়েছে এবং সম্প্রতি আমরা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে মেডিকেল কর্মীদের জন্য নতুন করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। কেউ যখন ক্লিনিকে উপস্থিত হন, আমরা নিশ্চিত করি যাতে তারা তাদের হাত ধোয়। এরপর আমরা তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করি। আমরা রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করে গুরুত্ব অনুসারে পর্যায়ক্রমে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি। যখন প্রয়োজন পড়ে, নিজেদের এবং আমাদের কাছে আসা রোগীদের সুরক্ষার জন্য নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা পিপিই পরিধান করি।”

ডা. আশরাফ হোসেন সোহাগও একজন মেডিকেল অফিসার হিসেবে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ইউনিসেফ-পিএইচডি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে কর্মরত। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে কাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে বলেন তিনি।

ডা. সোহাগ বলেন, “যতবার আমরা কাজের উদ্দেশ্যে শিবিরে যাই, ততবারই তা বড় ধরনের ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভাব্য ভাইরাসের সংক্রমণ এবং পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চিকিৎসক ও কর্মীদের পালাক্রমে কাজের একটি তালিকা আমরা করেছি। শিবিরে আমাদের পদচারণা যত কমবে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিও তত কম হবে। তবে একই সাথে আমাদের রোগীদেরও অবশ্যই সেবা দিতে হবে, আর তাই চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের অবশ্যই ক্লিনিকে উপস্থিত থাকতে হবে।”

“আমরা সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে রোগীদের অপেক্ষা করার স্থানে তাদের বসার ব্যবস্থা নতুন করে সাজিয়েছি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে এখন আসনগুলোর মাঝে অন্তত ৩ ফুট করে ফাঁকা রাখা হয়েছে।”

“কোভিড-১৯ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের ক্লিনিকে রোগী আসার সংখ্যা কমে গেছে। রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বলা হয়েছে, যাতে একান্ত প্রয়োজন বা জরুরি না হলে যেন তারা তাদের আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে না যায়। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৌসুমী ফ্লু ও ডায়রিয়ার ঘটনা পাচ্ছি এবং চিকিৎসা দিচ্ছি। তবে কোভিড-১৯ আবির্ভাবের কারণে এখন সাধারণ ঠান্ডা-সর্দিও শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মাঝে আতঙ্ক তৈরি করছে,” ডা. তাসিফ যোগ করেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থী
PHD Bangladesh/2020/Sohag
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলিতে পিএইচডি দ্বারা পরিচালিত ইউনিসেফ-সমর্থিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অপেক্ষার জায়গায় দর্শনার্থীদের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিটি আসনের মাঝে তিন ফুট ফাঁকা রাখা হয়েছে।

কোভিড-১৯ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো

ইউনিসেফের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে শিশু ও পরিবারগুলোর মাঝে সচেতনতা বাড়ানো যাতে তারা কোভিড-১৯ থেকে নিজেদেকে রক্ষা করতে পারে এবং ঝুঁকি, লক্ষণ ও সংক্রমণ সম্পর্কে বুঝতে পারে। অসুস্থ বোধ করলে তাদের কী করতে হবে তাও তাদের অবশ্যই জানতে হবে।

মার্চ মাসে ইউনিসেফ ও তার বাস্তবায়নকারী অংশীদাররা স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক বার্তা দিতে ২১৫ জন কমিউনিটি স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে হাত ধোয়া ও কোভিড-১৯ সম্পর্কিত বার্তা নিয়ে ৯টি শিবিরে ২ লাখ ৯৪ হাজার মানুষের কাছে গিয়েছিল।

ডা. সোহাগ বলেন, “ইউনিসেফের মতো জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সহায়তায় সরকারি কর্তৃপক্ষের পরিচালনায় ক্যাম্পগুলোতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চলছে। তারা হাঁচি ও কাশির শিষ্টাচারের পাশাপাশি হাত ধোয়া ও সর্বোত্তম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়গুলো তুলে ধরছে।”

“কোভিড-১৯ সম্পর্কে যেকোনো ভুল ধারণা সম্পর্কে জানতে এবং এগুলো নিরসনের জন্য এই ধরনের প্রচারাভিযানগুলোতে ধর্মীয় ও কমিউনিটি নেতাদের সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য।”

কক্সবাজার জেলার ১১শ’রও বেশি ইসলামিক কেন্দ্রের মাধ্যমে কোভিড-১৯ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ইউনিসেফ বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে এবং শিশু ও পরিবারগুলো যাতে তাদের কমিউনিটিতে বিশ্বস্ত সূত্র থেকে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পায় তা নিশ্চিত করার জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বেশ কয়েকজন ধর্মীয় নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

আইসোলেশন ও চিকিৎসা সুবিধার সম্প্রসারণ

কোভিড-১৯ যেসব দেশগুলোকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে, সেসব দেশের মধ্যে এমন কিছু দেশও রয়েছে যাদের স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বের মধ্যে সেরা। ব্যাপক প্রস্তুতিমূলক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কক্সবাজারে যদি এই রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তবে এটি রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে এবং এর ফলে স্বাস্থ্যসেবাসমূহকে সম্প্রসারিত করতে হবে, যা তাদের সক্ষমতার বাইরে।

ইউনিসেফ টেকনাফে দ্রুতগতিতে ২০০ শয্যার অস্থায়ী কোভিন-১৯ আইসোলেশন ও চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন করছে এবং পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিকে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীদের সঙ্গে মিলে রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি ৫০ শয্যার কোভিড-১৯ আইসোলেশন ও চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন করছে। কক্সবাজার জেলায় কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য এক হাজার ৭০০ শয্যার চিকিৎসা ব্যবস্থা তৈরিতে বাংলাদেশ সরকার ও স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটি করা হচ্ছে।

এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে এবং এ অবস্থায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগীদের সঙ্গে মিলে ইউনিসেফ বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের যতোটা সম্ভব প্রয়োজনীয় উপকরণে সজ্জিত রাখতে এবং কক্সবাজারে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশু ও পরিবারের সদস্যদের,একবারে একজন করে রোগীকে, সুরক্ষিত রাখতে সার্বক্ষণিক কাজ করছে।


এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা কার্যক্রমে অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশেন এজেন্সির তাৎক্ষণিক ও সহৃদয় অবদানের জন্য ইউনিসেফ তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।